কেন, কী হয়েছিল?
তখন ব্রিটিশ-আমেরিকান কানাডিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান আর্মি আর অফিসারদের মনোরঞ্জনের জন্য চৌরঙ্গিপাড়ায় দশ হাত অন্তর নাচ-গান আর মদ্যপানের আসর ছিল।
সত্যি?
কণিকা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন।
হ্যাঁ, ছোটমা, সত্যি।
উনি একটু থেমে বলেন, তখন চারদিকে ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সেই যুদ্ধে প্রতিদিনই হাজার হাজার সৈন্য মারা যেত। তাই তো গভর্নমেন্ট আর্মির আনন্দের জন্য চৌরঙ্গি পাড়ায় শত শত বার-এর লাইসেন্স দেয়। এমনকি ফুটপাত ঘিরেও অনেক বার ছিল; আর এই সব বার-এ মেয়েরা নাচ দেখাত, গান গাইত।
কণিকা অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে শুনে যান।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, আর্মির সবাই জানত, যে-কোনো মুহূর্তে ওদের যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে এবং হয়তো মারা যাবে। তাইত যেমন আকণ্ঠ ড্রিঙ্ক করত, সেইরকমই ফুর্তি করত। বড়কর্তার ছোট ছেলে ওদেরই সঙ্গে সমানতালে ড্রিঙ্কও করত, ফুর্তিও করত।
সত্যিই স্তম্ভিত হবার মতো ব্যাপার।
এইটুকু শুনেই স্তম্ভিত হচ্ছ? এখন তো আসল ব্যাপারটাই বলিনি।
আবার কী আসল ব্যাপার?
বলছি, বলছি।
উনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ঐ যুদ্ধের বাজারে কন্ট্রাক্টরি করে যোগীন ঘোষ বলে এক ভদ্রলোক প্রচুর পয়সা করেন। তারই মেয়ের সঙ্গে সরকারবাড়ির বড়কর্তার ছোট ছেলের বিয়ে হয়।
ঠাকুমা বলতেন, মেয়েটি দারুণ সুন্দরী ছিল।
হ্যাঁ, সত্যি খুব সুন্দরী ছিল।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, বিয়ের পর ঐ ছোকরা প্রায়ই বউকে নিয়ে ক্লাবে গিয়ে আর্মি অফিসারদের সঙ্গে ড্রিঙ্ক করত।
তারপর?
তারপর ঐ বউটিও ড্রিঙ্ক করা শুরু করল এবং শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হলো।
কী বলছেন আপনি? হ্যাঁ, ছোটমা, ঠিকই বলছি।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলনে, স্বামী-স্ত্রী বেরুত একসঙ্গে কিন্তু ফিরত আলাদা আলাদা।
তার মানে?
শ্রীমান নিজে বেহুঁশ মাতাল হয়ে ফিরত মাঝরাত্তিরের পর কিন্তু তখন ওর সঙ্গে বউ থাকত না। দুতিনজন আর্মি অফিসার আর্মির গাড়ি করে বউটিকে পৌঁছে দিত রাত দুটো তিনটের সময়।
কণিকা মুখ বিকৃতি করে বলেন, এ রাম! রাম!
ছোটমা, এ দৃশ্য সারা পাড়ার লোক মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে দেখেছে।
পাড়ার লোক কিছু বলত না?
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, ছোটমা, তোমরা ঠিক বুঝবে না, তখন কী পরিস্থিতি ছিল।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তখন বহু জজ ব্যারিস্টার আর আই. সি. এস-এর মেয়ে বউরা পর্যন্ত আমেরিকান বা ব্রিটিশ আর্মি অফিসারদের সঙ্গে মেলোমেশা করতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করতেন। তাইত…
কী বলছেন আপনি?
হ্যাঁ, ছোটমা, ঠিকই বলছি।
দুএক মিনিট কেউই কোনো কথা বলেন না। তারপর কণিকা জিজ্ঞেস করেন, মেজকর্তার ছেলেটি কেমন ছিল?
মেজকর্তার ছেলেটির কোনো বদ নেশাও ছিল না, চরিত্রও খারাপ ছিল না; তবে যেমন আয়েসী, সেইরকমই স্ত্রৈণ ছিল।
কণিকা একটু হেসে বলেন, ওবাড়ির কেউ কি স্বাভাবিক ছিল না?
না, ছোটমা, কেউই স্বাভাবিক ছিল না।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তা না হলে কি এই বিশাল সম্পত্তি আর এত টাকা এভাবে কবছরের মধ্যে শেষ হয়?
কবছরের মধ্যে মানে?
যুদ্ধ শেষ হবার বছর পাঁচেকের মধ্যেই সরকারদের সব শেষ হয়ে যায়।
মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে?
অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন, ছোটমা, ফুটো হাঁড়িতে ক্ষীর রাখলেও তা পড়ে যায়।
তা ঠিক, কিন্তু এত টাকা, এত সম্পত্তি পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হলো কীভাবে?
একজন রেসুড়ে, একজন যেমন চালিয়াত সেইরকমই চরিত্রহীন-নেশাখোর আর একজন দিনরাত্তির বউকে নিয়েই ব্যস্ত। ওদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখার সময় কোথায়?
উনি এক নিঃশ্বাসে বলে যান, মোসাহেব, দালাল আর কর্মচারীদের উপর সবকিছু ছেড়ে দিলে কি ব্যবসা বাণিজ্য চলে?
কণিকা চুপ করে থাকেন।
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, যুদ্ধের শেষের দিকে বড়কর্তা-মেজকর্তার ছেলেরা আলাদা হয়ে যায়। বড়কর্তার বড়ছেলে বেহালায় চলে গেল; ছোট ছেলে সাদার্ন অ্যাভিনিউতে তিনতলা প্রাসাদ তৈরি শুরু করে আর শেষ করতে পারল না।
মেজকর্তার ছেলে?
ও বিডন স্ট্রিটে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যও ভাগাভাগি হয়?
সব বেহাত হয়ে যায়।
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, ওরা তিন ভাই মাত্র তিন লাখ টকা নিয়ে ব্ৰেবোর্ন রোডের বাড়িটা কিষণলাল জালান বলে এক ভদ্রলোকের কাছে বন্ধক রাখে কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যে টাকা শোধ করতে না পারার জন্য বাড়িটা চলে যায়। আর কর্মচারীরা। ভাগ-যোগ করে সব ব্যবসা-বাণিজ্যও হাতিয়ে নেয়।
হাতিয়ে নেয় মানে?
দশ-বিশ হাজার টাকা নিয়ে এক এক ভাই এক এক জনকে একএকটা ব্যবসা লিখে। দিয়েছে।
উনি একটু থেমে একটু হেসে বলেন, পঞ্চাশ-বাহান্ন সালে আমি সরকার বাড়ির ছেলেদের সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে চড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি।
বলেন কী?
হ্যাঁ, ছোটমা, ঠিকই বলছি।
উনি একটু থেমে বলেন, অধিকাংশ বাঙালি ব্যবসাদারই তো এইভাবে শেষ হয়ে গেছে।
.
একে কলকাতা শহর, তার উপর ভবানীপুরের ঐ জমজমাট বাড়ি ছেড়ে কাশী এসে প্রথম কারুরই বিশেষ ভাল লাগতো না। স্বামীকে সরাসরি কিছু না বললেও বড়বউ প্রায় প্রতিদিনই রাধাকে বলতেন, এইভাবে আনু আর টানুর সংসার করতে আমার একটুও ভাল লাগে না। ভবানীপুরের বাড়িতে কিভাবে যে সময় কেটে যেত, তা টেরই পেতাম না, আর এখানে?
