যা তা জায়গায় গেলে এইসব অসুখ তো হবেই।
শুধু তাই না ছোটমা। হাসপাতালে ওঁকে কেউ দেখতেও যেত না।
নিজের বউ-ছেলেও না?
না।
কেন? ওঁর চরিত্র ভাল ছিল না বলে?
শুধু তাই না; উনি ওঁর রক্ষিতাকে কালীঘাটের বাড়িটা লিখে দেন বলে…
কণিকা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, উনি ওঁর রক্ষিতাকে বাড়িও দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ।
একটু চুপ করে থাকার পর কণিকা জিজ্ঞেস করেন, আর ছোটকর্তা কীভাবে মারা যান?
উনি মদ খেয়েই মারা গেলেন।
উনি প্রায় না থেমেই বলেন, তবে ছোটমা, দত্তবাড়ির মেজবাবুর মৃত্যু আর ঐ মামলা মোকদ্দমার পর ছোটকর্তা বাড়িতে বসে দিনরাত্তির শুধু মদ খেতেন কিন্তু বাইরে কোথাও যেতেন না।
কণিকা একটু হেসে বলেন, বোধহয় ভয়েই কোথাও যেতেন না।
ভয় নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু মেজবাবু আর বড়বাবুর ঐভাবে মৃত্যু হওয়ায় উনি খুবই আঘাত পেয়েছিলেন।
অঘোরনাথ একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, তবে ছোটমা, একটা কথা জেনে রেখো। সরকারবাড়ির এই চরিত্রহীন মাতাল ছোটবাবু কোনোদিন কারুর ক্ষতি করেননি, বরং বহু মানুষকে সাহায্য করেছেন।
ঠাকুমা তো কোনোদিন কিছু বলেননি।
তোমার শাশুড়ীর কাছে শুনেছি, উনি বাইরের লোকজনের কাছে শ্বশুরবাড়ির আলোচনা করা বিশেষ পছন্দ করতেন না।
হ্যাঁ, সত্যিই তাই।
কণিকা একটু থেমে জিজ্ঞেস করেন, সরকারবাড়ির এই দুরবস্থা হলো কেমন করে?
অঘোরনাথ একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, তুমি তো ইকনমিক্স নিয়ে পড়েছিলে। ল অফ ডিমিনিসিং রিটার্নের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে?
হ্যাঁ।
সরকারদের ঠিক তাই হয়েছিল।
উনি একটু থেমে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাগজের কালোবাজারি আর চুরি করে ওঁরা যে কত লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা আয় করেছিলেন, তা তুমি কল্পনা করতে পারবে না।
কালোবাজারি করে আয় করতেন, তা বুঝলাম কিন্তু চুরি করতেন কী করে?
তখন কলকাতা ছাড়া আসাম ও বাংলাদেশের নানা জেলায় লাখ লাখ বৃটিশ আমেরিকান-কানাডিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান সৈন্য ছড়িয়ে ছিল। ওদের হাজার হাজার অফিসে কোটি কোটি টাকার কাগজ সাপ্লাই দিতেন আমাদের এই সরকাররা।
অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন, প্রতেক প্যাকেটে পাঁচ শর জায়গায় চারশ শিট কাগজ সাপ্লাই দিয়ে কত টাকার কাগজ ওঁরা চুরি করতেন, তা ভাবতে পারো?
ধরা পড়তেন না?
কে ধরবে?
অঘোরনাথ ওঁর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলেন, বিশ্বযুদ্ধ যে কী ভয়ানক ব্যাপার, তা তোমরা ঠিক বুঝবে না। যখনকার কথা বলছি, তখন হিটলারের জার্মানি প্রত্যেকদিন এক একটা দেশ দখল করে চলেছে; আর এদিকে জাপানিরা সিঙ্গাপুর-মালয় ইত্যাদি জয় করে ঝড়ের বেগে ভারতের দিকে এগিয়ে আসছে। সেই ভয়ঙ্কর সময়ে কি আর্মি অফিসারদের কোনো জিনিসপত্রের হিসেব-নিকেশ নেবার সময় ছিল!
কণিকা অবাক হয়ে ওঁর কথা শোনেন।
এদিকে যুদ্ধের জন্য চাল-গম-চিনি থেকে শুরু করে কাপড়-চোপড় লেখাপড়ার কাগজ সবই কন্ট্রোল কিন্তু কোনো ব্যসাদারই কন্ট্রোলের দামে কোনো জিনিস বিক্রি করে না। এই সরকাররা আট-দশ গুণ বেশি দামে কাগজ বিক্রি করে কত আয় করলেন, তা ভগবানই জানেন।
এত টাকা গেল কোথায়?
বৃদ্ধ অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি-হেসে বলেন, ছোটমা, তখন বাড়ির বড়কর্তা আর মেজকর্তা এমন বেহিসেবী ফুর্তি করা শুরু করলেন, যা আমি তোমাকে বলতে পারব না। সেই সঙ্গে সমান তালে বিলাসিতা আর অপব্যয়। তখন ওঁদের কতগুলো মোটরগাড়ি ছিল জান?
কণিকা চাপা কৌতুকের হাসি হেসে জিজ্ঞেস করেন, কত?
সাতখানা।
সাতখানা গাড়ি ছিল?
হ্যাঁ ছোটমা, সাতখানা।
উনি মুহূর্তের জন্যে থেমে বলেন, তার মধ্যে তিনখানা ছিল প্যাকার্ড আর ক্রাইসলার।
দু-এক মিনিট চুপ করে থাকার পর কণিকা প্রশ্ন করেন, তখনও ওঁরা ব্যবসা-বাণিজের কাজকর্ম করতেন তো?
না, না; তখন ওঁদের ব্যবসা বাণিজ্য করার সময়ও ছিল না, মনও ছিল না।
তাহলে…
তত দিনে তো ওঁদের তিন ছেলেই বড়ো হয়ে গেছে। ওরাই তখন সবকিছু দেখাশুনা করত।
অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন, ছেলেগুলোও তো এক একটা অবতার ছিল।
কেন? ওরাও কি বড়কর্তা-মেজকর্তার মতো চরিত্রহীন ছিল?
বড়কর্তার বড় ছেলেটির কোনো মেয়েছেলের রোগ ছিল বলে কোনদিন শুনিনি কিন্তু বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে খিদিরপুর আর টালিগঞ্জে নিয়মিত রেস খেলত।
উনি না থেমেই একটু হেসে বলেন, শ্রীমান যথারীতি প্রত্যেকদিন রেসের মাঠে হাজার হাজার টাকা হেরে বন্ধুদের সঙ্গে বোতল নিয়ে বসত। রাত দেড়টা-দুটোর আগে কোনোদিন বাড়ি আসত না।
বাঃ! চমৎকার!
দাঁড়াও, দাঁড়াও, ছোটমা, এখনই কোনো মন্তব্য করো না। আরো আছে।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, রেসের মাঠে লাখ লাখ টাকা হারাবার পর শ্রীমান ঠিক করল, রেস জিততে হলে রেসের ঘোড়া কিনতে হবে।
তাতেও নিশ্চয় লাখ লাখ টাকা নষ্ট হলো?
সে আর বলতে!
আর বড়কর্তার ছোটছেলেটা কেমন ছিল?
উঃ! ও হতচ্ছাড়ার কথা মনে হলে এখনও আমার গা জ্বলে যায়।
কণিকা একটু হেসে বলেন, কেন?
অঘোরনাথ বলেন, এই হতচ্ছাড়া ধর্মতলা পাড়ার ফিরিঙ্গিদের একটা স্কুলে ক্লাস এইট-নাইন অবধি পড়েই নিজেকে সাহেব মনে করত। আর্মি অফিসে সাপ্লাই দেবার কাজে যাতায়াত করতে করতে অনেক আর্মি অফিসারের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হলো। সেই বন্ধুত্বের পরিণাম যে কী হয়েছিল, তা শুনলে তুমি স্তম্ভিত হয়ে যাবে।
