চক্ৰবেড়ের ডাঃ মিত্র বললেন, বোধহয় রাত দুটো থেকে চারটের মধ্যে মারা গেছেন।
ঐ বিনু বলে যে ছেলেটা ওঁর পাশের ঘরে থাকে….
মুকুন্দ ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বলে, ওর কথা আর বলবেন না বৌদি। ঠাকুমাদের বাড়িতে থেকেও ঠাকুমাকে কি যা তা বলতো, তা ভাবতে পারবেন না।
আমি জানি।
কণিকা মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ঠাকুমা আমার কাছেও অনেক দুঃখ করেছেন কিন্তু হতভাগা তো ওঁরই পাশের ঘরে থাকে।
ও আবার কী খবর নেবে? ঘরখানা দখল নেবে বলে ও তো দিনরাত্তির ঠাকুমার মৃত্যু কামনা করতো।
এবার কণিকা বললেন, যাই হোক মুকুন্দ, ঠাকুমার শেষ কাজ খুব ভালভাবে হওয়া চাই। খাট, ফুল, সেন্ট-টেন্ট কিনতে কত দেব বল?
ওসব কিনতে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওসবের জন্য আর আপনাকে টাকা দিতে হবে না।
ওসব কেনার টাকা কে দিল?
আমি আর আমার বন্ধুবান্ধব-খদ্দেররা ও টাকা দিয়ে দিয়েছি।
কণিকা ওকে দাঁড় করিয়ে ভিতর থেকে আড়াইশ টাকা এনে ওর হাতে দিয়ে বললেন, শ্মশানঘাটের খরচের জন্য এই টাকাটা রাখো। তুমি যাও; আমি এখুনি আসছি।
হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত কামিনীবালা প্রায় রাজমহিষীর মতো সেজেগুঁজে পালঙ্কে চড়ে যাট-সত্তর জন লোকের হরির ধ্বনি শুনতে শুনতে ভবানীপুরের বিখ্যাত গোলাপী বাড়ি থেকে চিরবিদায় নিলেন। তাছাড়া স্বামীর সোহাগবঞ্চিতা নিঃসন্তান এই নিঃস্ব বৃদ্ধার জন্য চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় জানালেন পাড়ার বউ-ঝি বুড়ো বুড়ির দল। সরকারবাড়ির আর কোনো কর্তা বা গিন্নির কপালে এই সৌভাগ্য জোটেনি।
.
কণিকা ও বাড়ি থেকে ফিরে আসতেই অঘোরনাথ বললেন, বুড়িকে রওনা করে দিয়ে এলে?
হ্যাঁ, ছোটকাকা।
জানলা দিয়ে দেখলাম, বুড়ি বেশ রাজরানীর মতোই গেলেন।
হ্যাঁ, সত্যিই রাজরানীর মতোই গেলেন।
কণিকা মুহূর্তের জন্য থেমে বললেন, শুধু এপাড়ার বাসিন্দারা না, এমনকি মুকুন্দর দোকানের অতি সাধারণ খদ্দেরদেরও দেখলাম, ঠাকুমার পায় ফুলমালা দিয়ে প্রণাম করল।
জানো ছোটমা, মানুষের সুকৃতি না থাকলে এই ভালবাসা পাওয়া যায় না। সব মানুষই চায়, একটু ভালভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে কিন্তু সে সৌভাগ্য কজনের হয়?
উনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই বুড়ি ছাড়া সরকারবাড়ির আর কারুর সে সৌভাগ্য হয়নি।
ও বড়ির আর সবাই বুঝি খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন?
কেউ কষ্ট পেয়ে, আবার কেউ বা এমন ভাবে মারা যান, যা বিশেষ সুখের বা, গৌরবের নয়।
ঠাকুমা একবার কথায় কথায় বলেছিলেন, কে যেন জলে ডুবে মারা যান।
অঘোরনাথ একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, হ্যাঁ, ও বাড়ির মেজকর্তা।
উনি একটু থেমে বলেন, দেখ ছোটমা, ধর্মের ঢোল আপনি বাজে। আমরা অতি বুদ্ধিমানের দল লুকিয়ে-চুরিয়ে অন্যায় বা খারাপ কাজ করে মনে ভাবি কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না কিন্তু মজার কথা, একদিন না একদিন ধরা পড়তেই হয়।
কণিকা কোন কথা না বলে ওঁর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।
অঘোরনাথ বলে যান, সরকারবাড়ির বড়কর্তার যে রক্ষিতা ছিল, এ কথা সবাই জানতো। মাতাল-চরিত্রহীন বলে ছোটকর্তার খ্যাতি সারা কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছিল। আর মেজকর্তকে সবাই জানতো, ব্যবসা বাণিজ্য টাকাকড়ি ছাড়া দুনিয়ার আর কোনো ব্যাপারে ওঁর আগ্রহ নেই।
ঠাকুমার কাছে শুনেছি, ওর জন্যই বুঝি সরকারদের এত বিষয়-সম্পত্তি হয়।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ কিন্তু দুঃখের কথা কী জানো ছোটমা, প্রায় সব সম্পত্তিই উনি লোক ঠকিয়ে নিজেদের করে নেন।
লোক ঠকিয়ে?
হ্যাঁ।
অঘোরনাথ একটু থেমে বলেন, যারা বিপদে-আপদে পড়ে বিষয়-সম্পত্তি বন্ধক রেখে টাকা নিতেন, তারা কথামতো টাকা শোধ করতে না পারলেই উনি সে-সব সম্পত্তি নিয়ে নিতেন।
তাই নাকি?
মাত্র দুপাঁচ-দশ হাজার টাকা ধার দিয়ে কত মূল্যবান সম্পত্তি যে উনি আত্মসাৎ করেছেন, তা তুমি ভাবতে পারবে না।
তা উনি জলে ডুবে মারা গেলেন কী ভাবে?
আমাদের সমাজে বিধবাদের তো দুঃখ-কষ্টের শেষ নেই। তাই মেয়েদের বিয়ে-থার ব্যাপারে বা ছেলেমেয়েদের অসুখ-বিসুখের জন্য বিধবারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপদে পড়ে সম্পত্তি বন্ধক রেখে মেজকর্তার কাছ থেকে টাকা নিতেন। ওঁদেরই মধ্যে একজন অল্পবয়সী বিধবাকে নিয়ে ফুর্তি করতে গিয়েই তো উনি নৌকো থেকে পড়ে গঙ্গায় ডুবে মারা যান।
এ রাম!
কণিকার বিস্ময় আর ঘৃণা দেখে অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন, ছোটমা, আমাদের আশু মুখুজ্যেও অনেক টাকা আয় করেন। এই ভবানীপুরে উনি কি বিশাল বাড়ি বানান, তা তো দেখেছ।…
সত্যি, ভবানীপুরে ওর চাইতে বড় বাড়ি দেখিনি।
আশুবাবু বিদ্যা-বুদ্ধি পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেন, উনি অসৎ উপায়ে একটি পয়সাও আয় করেননি। তাইতো তার প্রত্যেকটি ছেলে যেমন শিক্ষিত, সেইরকমই সম্মানিত হয়েছেন।
অঘোরনাথ মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, আর সরকারবাড়ির কর্তাদের না ছিল শিক্ষা দীক্ষা, না ছিল সততা। মানুষ ঠকিয়ে জোচ্চুরি করে টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি করেন বলেই ওঁরা যত রকমের নোংরামি করে টাকা ওড়াতে দ্বিধা করেননি।
কণিকা জিজ্ঞেস করেন, ও বাড়ির বড়কর্তা কী ভাবে মারা যান?
উনি যখন মারা যান, তখন আমি কলকাতায় ছিলাম না। তবে পুজোর সময় কলকাতায় এসে বন্ধু বান্ধবদের কাছে শুনি, উনি কোন খারাপ অসুখে মারা যান।
