অন্য দুই ছেলে?
ওরা দুটোই লেখাপড়ায় বেশ ভাল।
নরোত্তম একটু হেসে বলেন, মেজখোকা বুঝি মাঝে মাঝেই ওর মা আর বড় মাকে। বলে, বি.এ. পাশ করার পরই ও ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত চলে যাবে।
সাবিত্রী একটু হেসে বলে, ছেলেরা যখন এত ভাল, তখন তোমার ভাবনা কী?
তাছাড়া ছোটবউকে নিয়েও মাঝে মাঝে ভয় হয়।
ওকে নিয়ে আবার কী ভয়?
হয়তো আবার কোনোদিন বলবে, সম্পত্তি ভাগাভাগি করে দাও।
ও বললেই তুমি করবে কেন?
সাবিত্রী একটু থেমে বলে, আগে ছেলেরা উপযুক্ত হোক, তারপর যাকে যা দেবার নিশ্চয়ই দেবে। এখন ওদের হাতে বিষয়-সম্পত্তি টাকাকড়ি এলে কার কী মতিগতি হয়, তার কি ঠিকঠিকানা আছে!
ও প্রায় না থেমেই বলে, তবে মল্লিকমশাই, একটা কথা বলে দিই। বউবা ছেলেরা যেন তোমার বিষয়-সম্পত্তি বা টাকাকড়ির খুব বেশি খবর জানতে না পারে। ওদের মাথায় যদি ঢুকে যায়, তোমার অনেক টাকা আছে, তাহলে..
ঠিক বলেছিস। আমি সবকিছু বলে ফেলেই ভুল করি।
উনি একটু থেমে বললেন, তুই আজ যা বললি, সে কথা ভটচাজমশাই অনেক আগেই বলছিলেন, কিন্তু আমি শুনিনি। সত্যি, এখন থেকে একটু সাবধান হতে হবে।
তবে একটা কথা মনে রেখো, ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ বাড়ি থেকে করলে বউ বা ছেলেরা সব জেনে যাবেই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি দুএক মাসের মধ্যেই লালবাজারে অফিস খুলব। বাড়ি থেকে এত বড় ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ চালানো সত্যি খুব অসুবিধে।
সাবিত্রী একটু হেসে বলে, দেখ মল্লিকমশাই, আমি এই সাতাশ বছরের জীবনে যে পাঁচজন বাবুকে নিয়ে ঘর করলাম, তারা প্রত্যেকেই ব্যবসাদার, প্রত্যেকেই…।
নরোত্তম হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, আমি বুঝি তোর পাঁচ নম্বর বাবু?
হ্যাঁ।
আমার আগে তো সরকারবাড়ির বড়কর্তা তোর বাবু ছিলেন।…
হ্যাঁ।
তার আগে?
সে এক পাটের দালাল।
তার আগে?
সে এক জমিদারের ব্যাটা।
তোর প্রথম বাবু কে ছিলেন?
আমার জামাইবাবু।
নরোত্তম অবাক হয়ে বলেন, তোর জামাইবাবু?
হ্যাঁ। তোর নিজের জামাইবাবু?
হ্যাঁ নিজেরই মতন আর কি!
নিজেরই মতন মানে?
ও শালা আমার বড়জ্যাঠার ছোটজামাই ছিল।
সাবিত্রী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ঐ হারামজাদা আমাকে নিয়ে বছর খানেক ফুর্তি করার পর হাজার টাকা নিয়ে আমাকে ঐ জমিদারের ব্যাটার কাছে বিক্রি করে।
নরোত্তম চুপ করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন না।
সাবিত্রী বলে, আমার মতো হতভাগীর কথা শুনে কী হবে? যা বলতে চাইছিলাম, তাই শোন।
হ্যাঁ বল।
সাধারণ লোকের ধারণা, মদ আর মেয়েছেলের খপ্পরে পড়েই সবার সর্বনাশ হয়, কিন্তু তা কখনই হয় না। যারা লাখ লাখ টাকা রোজগার করে, তারা আমার মতো খারাপ মেয়েছেলের হাতে কখনই সব টাকা তুলে দেয় না বা লাখ টাকারই মদ খায় না, খেতে পারে না।
নরোত্তম মাথা নেড়ে বলেন, সে তো একশবার সত্যি!
মদ-মেয়েছেলের পিছনে তোমরা কত ব্যয় কর? বড় জোর দুপাঁচশ বা দুপাঁচ হাজার। তার বেশি কখনই নয়।
নরোত্তম মাথা নেড়ে সম্মতি জানান।
. খেয়াল-খুশির জন্য এই টাকা ব্যয় করে তোমাদের মতো লক্ষপতিরা কখনই পথের ভিখারি হয় না।
সাবিত্রী একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তি নষ্ট হয় তোমাদেরই পারবারিক গণ্ডগোলে, আমাদের মতো মেয়েদের জন্য না।
খুব দামী কথা বলেছিস।
তাইতো বলছি, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো নিজের সংসারের দিকেও নজর দাও। বউ ছেলেমেয়েকে খুশি না রেখে কি ভালভাবে ব্যবসা করা যায়?
নরোত্তম অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলেন, তুহি বলছিস, বউ-ছেলেমেয়েকে খুশি রাখতে?
হ্যাঁ বলছি।
সাবিত্রী একটু থেমে একটু হেসে বলে, মল্লিকমশাই, তোমার মনে শান্তি না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে মন দেবে কী করে? আবার ব্যবসা-বাণিজ্য ভালভাবে না চললে আমাকে পুষবে কী করে?
নরোত্তম ওকে বুকের কাছে টেনে বলেন, মাগী, তুই তো দারুণ বুদ্ধিমতী মেয়ে।
সাবিত্রী উদাস দৃষ্টিতে দূরে হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে-স্থিরভাবে বলে, মল্লিকমশাই, আগেকার বাবুদের শুধু শরীরটা দিয়েছি কিন্তু তোমাকেই প্রথম শরীর আর মন দুই-ই দিয়ে দিলাম। তাই তো তোমার কোনো ক্ষতি হলে আমি সইতে পারব না বলেই আজ তোমাকে এত কথা বললাম।
নরোত্তম মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন কিন্তু ঠিক যেন চিনতে পারেন না। না না, এ তো কামনা-লালসার প্রতিমূর্তি না; এ সাবিত্রী যেন দূরের চিরতুষারাবৃত হিমালয়ের মতোই স্নিগ্ধ, শান্ত, পবিত্র।
৯-১০. খবরটা
০৯.
খবরটা মুকুন্দই পাড়ার পুরনো বাসিন্দাদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিল।
নিতান্ত অপ্রত্যাশিত না হলেও খবরটা শুনে কণিকা চমকে উঠলেন। বললেন, এইতো পরশু দিনই আমার সঙ্গে গল্প করলেন। একদিনের মধ্যে হঠাৎ কী হলো?
মুকুন্দ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কাল সন্ধের পর আমি যখন ওঁর দুধ আর দুটো কলা দিতে গেলাম, তখন আমাকে শুধু বললেন, বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, তুই কলা দুটো তোর মেয়েকে দিস।
তাই নাকি? হ্যাঁ, বৌদি।
উনি দুধ খেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, আমারই সামনে উনি দুধ খেয়ে শুয়ে পড়লেন।
তারপর?
আজ সকালে সাড়ে নটা-দশটা পর্যন্ত ঠাকুমাকে বাইরে বেরুতে না দেখে ভিতরে গিয়ে দেখি, ওঁর শরীর লোহার মতো শক্ত!
তার মানে, ঘুমের মধ্যেই মাঝ রাত্তিরে মারা গেছে।
