উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তাছাড়া আমার সব ব্যবসা থেকেই লাখ লাখ টাকা আয় হয়। সেই সব ব্যবসা ছেলেদের হাতে পড়লে কি ওরা মাথা ঠিক রাখতে পারবে?
সাবিত্রী মনে মনে কী যেন ভাবে। তারপর জিজ্ঞেস করে, তুমি কী চাও?
যতদিন আমার শরীর ঠিক থাকবে, ততদিন আমিই সবকিছু নিজের হাতে রাখতে চাই। তারপর অবস্থা বুঝে, ছেলেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেব।
তিন ছেলেকে সমানভাবে ভাগ করে দিতে চাও না?
চাই কিন্তু…
নরোত্তম কথাটা শেষ করেন না।
সাবিত্রী বলে, থামলে কেন? কথাটা শেষ কর।
নরোত্তম অসহায়ের মতো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, বড় ছেলেটাকে নিয়েই আমার ভয় হয়।
সাবিত্রী অবাক হয়ে বলে, ভয় হয় মানে!
ও প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বলে, বড়বউ-এর ছেলেকে নিয়ে তো কোনো দুঃশ্চিন্তা হবার কথা নয়।
নরোত্তম একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, বড়বউ ভাল হলে কি হবে ও তো আমারই ঔরসে জন্মেছে।
তাতে কী হলো?
আমারই মতো ওরও মেয়েছেলের রোগে ধরেছে।
উনি প্রায় না থেমেই বলেন, তবে আমার এ রোগ ধরেছিল ব্যবসা বাণিজ্য করে টাকাকড়ি রোজগারের পর, আর ঐ হতভাগাকে….
ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সাবিত্রী জিজ্ঞেস করে, বড় খোকার কত বয়স হলো।
এইতো কুড়িতে পড়ল।
ও কি এরই মধ্যে আমাদের মতো খারাপ মেয়েদের কাছে যেতে শুরু করেছে?
না, না। নরোত্তম একটু থেমে বলেন, সে সাহসও নেই, টাকাও নেই।
তবে?
সে এক কেলেঙ্কারির ব্যাপার।
বাড়ির কোনো ঝি-এর সঙ্গে…
না, না, ঝি-টি না।
তবে?
হতচ্ছাড়া ওর এক মাসির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
মাসি? আপন মাসি?
না, না, আপন মাসি না; ছোটবউ-এর দূর সম্পর্কের এক মাসতুতো বোনের সঙ্গে…
ওদের বিয়ে দেওয়া যায় না?
মেয়েটা তো বিধবা।
নরোত্তম একটু থেমে বলেন, বিয়ের ছমাসের মধ্যেই বিধবা হয়ে মেয়েটা বাপের বাড়ি চলে আসে কিন্তু তাদের অবস্থা খারাপ বলে ছোটবউ তার এই বোনকে নিজের কাছে এনে রেখেছে।
মেয়েটার বয়স কত?
আঠারো, উনিশ বা কুড়ি হতে পারে। তবে মেয়েটা কি অসম্ভব সুন্দরী তা তুই ভাবতে পারকিনা।
একটু চুপ করে থাকার পর সাবিত্রী জিজ্ঞেস করে, তুমি ওদের ব্যাপারটা জানলে কী করে? বড়বউ বা ছোটবউ বলেছে?
না, না, ওরা দুজনের কেউই জানে না।
ওরা জানে না, অথচ তুমি জেনে গেলে?
ওদের না জানার কারণ আছে।
নরোত্তম একটু থেমে বলেন, পিছনের দিকে তিনতলার তিনখানা ঘর আমাদের তিনজনের।
মানে তোমার আর দুই বউয়ের?
হ্যাঁ।
নরোত্তম একটু থেমে বলেন, দোতলায় অনেকগুলো ঘর।…
অনেকগুলো ঘর?
হ্যাঁ; মানে বারান্দার দুপাশে তিনখানা করে ছখানা ঘর আছে।
ওগুলো কি ছেলেমেয়েদের ঘর?
হ্যাঁ।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, আত্মীয়-স্বজনরা এলে ঐ দোতলার দুটো-একটা ঘরে থাকে।
যাই হোক এবার আসল কথা বল।
নরোত্তম বলেন, রাত্তির বেলায় শোবার সময় মাধু আর ছোটখোকা বরাবরই বড়বউ এর কাছে শোয়। তাই দোতালায় বড়খোকা-মেজখোকা ওদের ঘরে থাকতো।
সাবিত্রী মুখ টিপে হেসে বলে, আর তুমি বুঝি ছোটবউকে নিয়ে রাত কাটাও?
একজন কাছে না থাকলে যে ঘুম আসে না। বড়বউ আজকাল আসতে চায় না বলে বাধ্য হয়েই ছোটবউকে নিয়ে…
ন্যাকামি করো না।
নরোত্তম একটু হেসে বলেন, আমার কথা বাদ দাও; এখন আসল কথা শোন।
হ্যাঁ বল।
ছোটবউ-এর ঐ বিধবা বোন দোতালার কোনার দিকের একটা ঘরে থাকে। একটু বেশি রাত হলেই বড়খোকা ওর ঘরে যায়।
তোমাকে কে বলল, বড়বউ? নাকি ছোটবউ?
না না; বললাম তো ওরা এসব কিছুই জানে না।
তাহলে কে তোমাকে এ খবর দিল?
আমাদের এক বুড়ি ঝি।
সাবিত্রী একটু ভেবে বলে, সে তোমার বউদের কাউকে না বলে হঠাৎ তোমাকে বলল কেন?
হয়তো বউরা জানলে ঝগড়া-ঝাটি হই-হুঁল্লোড় শুরু হয়ে যাবে ভেবেই…
ঐ ঝি-টা কী খুবই বিশ্বাসী?
হ্যাঁ, খুবই বিশ্বাসী। তাছাড়া ও অনেক বছর ধরে আমাদের সংসারে আছে বলে সব ছেলেমেয়েই ওকে বড়মাসি বলে ডাকে।
তা অত রাত্তিরে ঐ বুড়ি জেগে ছিল কেন?
অত-শত জানি না।
নরোত্তম একটু থেমে বলেন, একদিন চুপি চুপি ও আমাকে শুধু বলল, বড়খোকা একটু বেশি রাত্তিরে ছোটবউ-এর বোনের ঘরে যাতায়াত শুরু করেছে; তবে এ খবর আর কেউ জানে না।
বড়খোকা আর ঐ মেয়েটার হাবভাব-চালচলন দেখে কী মনে হচ্ছে?
আমি যতটুকু দেখি, তাতে তো ওদের মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখতে পাই না।
আগে থেকেই এত ভাবছ কেন? বুড়ি ঘুমের ঘোরে কী দেখতে কী দেখেছে, তা কে জানে!
দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর নরোত্তম বলেন, কিন্তু বড়খোকা সম্পর্কে ও আজেবাজে কথা বলার লোক না। ঐ বুড়িই তো বড়খোকাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে।
অত যদি ভাবনা-চিন্তার কারণ হয়, তাহলে ঐ মেয়েটাকে সরিয়ে দাও।
না, না, সে অসম্ভব?
কেন?
একে মেয়েটি অসহায়, তার উপর ছোটবউ নিজে ওকে এনেছে।
উনি একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, তাছাড়া বড়বউ মেয়েটিকে নিজের মেয়ের মতোই ভালবাসে। ওকে চলে যেতে বলা অসম্ভব।
একটু চুপ করে থাকার পর সাবিত্রী জিজ্ঞেস করে মেয়েটির নাম কী?
করুণা।
স্বভাব-চরিত্র?
বড়বউ তো ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
তুমি তো বল, তোমার ছেলেরাও খুব ভাল।
এখনো পর্যন্ত তো ওদের কারুর মধ্যে খারাপ কিছু দেখিনি।
নরোত্তম একটু থেমে বলে যান, বড়থোকা এনট্রান্স পাশ করার পর আর পড়াশুনো না করলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের যে কোনো কাজই করুক না কেন, তা বেশ ভালভাবেই করে। তাছাড়া ছেলেটা এত সাদাসিধে থাকে যে অপরিচিত লোকজনরা তো ওকে অনেক সময় আমার কর্মচারী মনে করে।
