উনি প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বলেন, ভটচাজমশাই, এখনই থানায় খবর দিন।
হঠাৎ বড়বউ এগিয়ে এসে বললেন, আজ মেজখোকার জন্মদিন। আজ আর থানা পুলিশ করো না।
উনি একটু থেমে বলেন, এই মাখন, কর্তার পা ধরে ক্ষমা চা।
মাখন বার বার ক্ষমা চাইবার পর নরোত্তম বললেন, ঠিক আছে তোকে পুলিশে দেব না কিন্তু তুই তিন মাস মাইনে পাবি না।
.
যাই হোক নরোত্তম মল্লিক তার এক স্ত্রীকে নিয়ে দার্জিলিং-এ বিশ্রাম নিতে যাবেন বলে অনেক সাহেবই হাসিমুখে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন। ইন্টার ক্লাস–সেকেন্ড ক্লাস না, একেবারে ফার্স্ট ক্লাসে ওদের যাবার ব্যবস্থা হলো। রেল কোম্পানির চিফ এঞ্জিনিয়ার মিঃ হাওয়ার্ড স্বয়ং হুকুম দিলেন, মিঃ ও মিসেস মালিকের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দৃষ্টি রাখতে। বেঙ্গল চেম্বারের সাহায্যে দার্জিলিং-এ সরকারি ইন্সপেকশন বাংলোয় থাকারও বিধিব্যবস্থা হবার পর নরোত্তম মুখ টিপে হাসতে হাসতে সাবিত্রীকে বললেন, তুই বোধহয় দার্জিলিং থেকে আর ফিরে আসবি না।
ফিরে আসব না কেন?
ওরে মাগী, এত আরামে থাকবি যে আর এই বউবাজারে ফিরে আসতে মন চাইবে না।
সাবিত্রী চোখ দুটো বড় বড় করে বলে, দার্জিলিং-এ গিয়ে কি আমি মহারানী হয়ে যাব, যে ঐ রাজত্ব ছেড়ে আর আসতে চাইব না?
আগে চল; তারপর বলিস।
.
হ্যাঁ, দার্জিলিং-এ পৌঁছে সাবিত্রী এক গাল হাসি হেসে বলেছিল, সত্যিকারের মহারানীরাও বোধহয় এত সুখে, এত আরামে থাকে না। মাত্র দুটো লোকের জন্য এতগুলো চাকর-বাকর! সত্যি ভাবা যায় না।
নরোত্তম চাপা হাসি হেসে বললেন, ওরে মাগী, তোর ভাল লাগছে কিনা, তাই বল।
সাবিত্রী দুপা এগিয়ে এসে দুহাত দিয়ে ওঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, দারুণ ভাল লাগছে। কলকাতায় আর কোনো মিনসে নেই, যে আমাকে এত সুখে রাখতে পারে।
প্রথম দুটো দিন শুধু খাওয়া-দাওয়ার সময় ছাড়া নরোত্তম সাবিত্রীর সঙ্গে শুধু রঙ্গরস আমোদ-ফুর্তি করেই কাটিয়ে দিলেন। পরের দিন থেকে একটু-আধটু ম্যালের দিকে বেড়াতে যাওয়া ছাড়া নরোত্তম বাংলো ছেড়ে বেরুতেন না। সাবিত্রীকে নিয়ে প্রাণভরে আনন্দ করার মাঝে মাঝেই নরোত্তম অপলক দৃষ্টিতে দূরের হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দুএকদিন পরই সাবিত্রী জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁগো, তুমি যখন তখন কি এত ভাব বল তো?
না, না, তেমন কিছু না।
না বললেই আমি মেনে নেব? আমি কি তোমায় নতুন দেখছি?
সাবিত্রী প্রায় না থেমেই বলে যায়, তোমাকে এভাবে ভাবনা-চিন্তা করতে দেখলে কি আমার ভাল লাগে? তুমি ভাল না থাকলে যে আমিও ভাল থাকতে পারব না, তা কি বুঝতে পার না?
নরোত্তম এবার মুখ তুলে ওর দিকে তাকালেও মুখে কিছু বলেন না।
সাবিত্রী ওঁকে কোলের উপর শুইয়ে মাথায়-মুখে হাত দিতে দিতে বলে, আমি তোমার বিয়ে করা বউ না হলেও আমি যে তোমাকে ভালবাসি, তা কি তুমি বুঝতে পারো না, নাকি বিশ্বাস কর না?
আমি কি তাই বলেছি?
সাবিত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বেশ গম্ভীর হয়েই বলে, দ্যাখো মল্লিকমশাই, আমি সতী-সাবিত্রীনা। মুখের মিষ্টি বুলি আর এই শরীরটাকে খেলিয়েই তোমাদের মতো কামুক মানুষকে খুশি করে খেয়ে-পরে টিকে আছি। কিন্তু তাই বলে কি আমার মন বলে কিছু নেই?
হাজার হোক সাবিত্নী একজন বারবণিতা। ছলে-বলে কৌশলে পুরুষের দুর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই ওদের মতো মেয়েরা জীবন কাটায়। আবেগ-ভালবাসায় ওরা কখনই নিজেদের জড়ায় না। কিন্তু আজ সাবিত্রীর কথা শুনে নরোত্তমের হঠাৎ মনে হয়, এই পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের মতো সাবিত্রীও তো রক্ত-মাংসের মানুষ! তারও সুখ দুঃখ স্নেহ-প্রীতি-ভালবাসা থাকাই তো স্বাভাবিক। ভাগ্যের বিড়ম্বনায়, পেটের দায়ে বারবণিতা হয়েছে বলে কি সে কোনো না কোনো পুরুষকে ভালবাসতে পারে না?
নরোত্তম মুখে কিছু বললেন না। শুধু মুগ্ধ অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সাবিত্রী ওঁকে আদর করতে করতেই বলে, বল, তোমার কী হয়েছে! আমি তোমাকে সাহায্য করব।
ও একটু হেসে বলে, আমি তোমাদের মতো সংসারী না হলেও আমারও সাংসারিক বুদ্ধি আছে। ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা না থাকলে কি আজ তুমি আমার কোলে এভাবে শুয়ে থাকতে? নাকি মহারানীর মতো এত আরামে থাকতে পারতাম?
এবার আর নরোত্তম চুপ করে থাকেন না। মাধুরীলতার বিয়ের তিন দিন আগে ছোটবউ কি কেলেঙ্কারি করেছিল তা গড়গড় করে বলার পর একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সেদিন থেকেই মনের মধ্যে একটা ভয় ঢুকে গেছে।
কীসের ভয়?
এত বছর ধরে এত কষ্ট করে যে ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তি করেছি, তা রেখে যেতে পারব তো?
সাবিত্রী একটু হেসে বলে, কদাচিৎ কখনও সব সংসারেই এই ধরনের অশান্তি হয়, কিন্তু তাই বলে কি সব সংসারই ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে যায়?
কিন্তু টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি বড় খারাপ জিনিস। সামান্য বিবাদ-বিসম্বাদ বা সন্দেহের জন্য চোখের সামনে কত বড় বড় পরিবারের সর্বনাশ দেখেছি বলেই ভয় হয়।
তা ঠিক।
একটু চুপ করে থাকার পর সাবিত্রী বলে, তিন ছেলেকে বিষয়-সম্পত্তি ভাগ করে দেবার কথা ভেবেছ কি?
না।
কেন?
বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য ভাগাভাগি করে দিলেই সাহেবরা ভাববে, আমরা ডুবতে বসেছি। তাই ওরা আর আমাদের বিশেষ পছন্দও করবে না, সাহায্যও করবে না।
