সাবিত্রী তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ওঁর একটা হাত ধরে বলল, এসো, এসো। দুতিন দিন ধরে শুধু তোমার কথাই ভাবছিলাম।
ঘরের মধ্যে পা দিয়েই নরোত্তম জিজ্ঞেস করেন, আমার কথা কেন ভাবছিলি? কোনো দরকার….
না গো না।
নরোত্তম ফরাসের উপর বসে তাকিয়ে হেলান দিতে না দিতেই সাবিত্রী ওঁর বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে বলে যায়, ভাবছিলাম, মেয়ের বিয়ের ঝক্কি সামলাতে গিয়ে আবার শরীরটা খারাপ হলো না তো!
সত্যি কি ঝক্কি যে গেল, তা আর তোকে কি বলব! শরীরটা বড় কাহিল হয়ে গেছে।
নরোত্তমের মাথায় মুখে হাত দিতে দিতে সাবিত্রী বলে, সাধারণ মানুষই মেয়ের বিয়ে দিতে হিমশিম খেয়ে যায় আর তোমার মেয়ের বিয়েতে তো সারা কলকাতা শহর তোলপাড় হয়ে গেছে।
নরোত্তম একটু আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বলেন, তুই ঠিকই বলেছিস। সত্যি মাধুর বিয়েতে সারা কলকাতা শহর তোলপাড় করে দিয়েছি।
সব সাহেবরা এসেছিল?
সব্বাই।
নরোত্তম একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, এমনকি বিলেত থেকে কত সাহেব চিঠি আর টাকা পাঠিয়েছে, তা তুই ভাবতে পারবি না।
সাবিত্রী দুহাত দিয়ে ওঁর গলা জড়িয়ে ধরে গদগদ হয়ে বলে, শালা সাহেবরা বেনের জাত। ওরা খুব ভাল করেই জানে, এখানে তোমার মতো মালদার পার্টি বিশেষ নেই। তাই….
তা ঠিক। তবে এবার কাজের কথা শোন।
না না, আজ কোনো কাজের কথা শুনতে চাই না। আজ শুধু প্রাণভরে তোমাকে আদর করবো।
এবার নরোত্তম ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলেন, ওরে মাগী, তুই আর আমি প্রাণভরে ফুর্তি করব বলেই একটা প্ল্যান করেছি।
শুনি কী প্ল্যান করেছ।
চল, আমরা কোথাও বেড়াতে যাই।
কথাটা শুনেই সাবিত্রী আনন্দে খুশিতে ভরে ওঠে। বলে, সত্যি আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে?
নরোত্তম অত্যন্ত বিষাদের সুরে বলেন, মাঝে-মাঝে দুএক ঘণ্টার জন্য তোকে কাছে পেয়ে কি মন ভরে? তাইতো ভাবছি, দিন কয়েকের জন্য তোকে নিয়ে বাইরে চলে যাই।
কোথায় যাবে? কাশী?
না না, কাশী বা পুরী যাব না। ও দুটো জায়গায় কলকাতার লোকজন যখন-তখন গিয়ে হাজির হয়।
তাহলে কোথায় যাবে?
তুই বল।
আম কী বলব? আমি কি কোথাও গেছি?
তুই কোথায় যেতে চাস? পাহাড়ে? জঙ্গলে? নাকি সমুদ্রের ধারে?
সাবিত্রী মুহূর্তের জন্য একটু ভেবে-চিন্তেই একগাল হাসি হেসে বলে, চল, চল, পাহাড়ে যাই। আমি কোনোদিন পাহাড় দেখিনি।
ঠিক আছে, তোকে পাহাড়েই নিয়ে যাব।
কবে আমরা যাব?
বেশি দেরি করব না। একটু বিধিব্যবস্থা করেই রওনা দেব।
নরোত্তম একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় স্বগতোক্তি করেন, আমার আর এখানে ভাল লাগছে না।
হ্যাঁ হ্যাঁ, চল। কদিন প্রাণভরে তোমাকে আদর-যত্ন সেবা করি।
চা-জলখাবারের বিধিব্যবস্থা করার জন্য উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সাবিত্রী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শুধু টাকা রোজগার আর পরিবার প্রতিপালন ছাড়া কোনদিন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে তো নজর দিলে না।
হ্যাঁ, সত্যিই তাই।
নরোত্তম মুহূর্তের জন্য একটু থেমে বলেন, প্রায় নেশার ঘোরে বছরের পর বছর পাগলের মতো কাজ করে গেছি কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, মাঝে মাঝে একটু বিশ্রাম নেবার দরকার।
যাই হোক, সেদিন বিদায় নেবার আগে নরোত্তম বলেন, তুই বাক্স-টাক্স গোছাতে শুরু কর।
বিছানাপত্র কি তুমি নেবে?
নরোত্তম একটু হেসে বলেন, ওরে মাগী, বিছানাপত্র নিতে হবে না। জামাকাপড় ছাড়া সঙ্গে কিছু নিতে হবে না।
সিঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েক ধাপ নেমে যাবার পর উনি আবার উঠে এসে একটু চাপা গলায় বলেন, আমার কোথায় যাচ্ছি, তা যেন তোর কাজের লোকজনও না জানে।
না না, কেউ জানবে না।
.
নরোত্তম মল্লিক অসম্ভব হিসেবী কিন্তু কৃপণ না। বউ-ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে কর্মচারীরা পর্যন্ত বলতে পারবে না, উনি তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখেন না বা তাদের প্রতি কর্তব্য করেন না। জগদীশ ভট্টচাজকে বলা আছে, যে কোনো কর্মচারীর ছেলেমেয়ের বিয়েতে আড়াই শ টাকা আশীর্বাদী পাঠাবেন। পুজোর সময় বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক কর্মচারীকেও একখানি করে ধুতি দেওয়ার রীতি ছিল। তবে হ্যাঁ, কাজকর্মের ব্যপারে পানের থেকে চুন খসলেই সর্বনাশ!
এইতো বছর তিনেক আগেকার কথা। প্রতি বছরের মতো সেবারও উনি দুই বউ আর চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মধুপুর গিয়েছেন। সঙ্গে জনা পাঁচেক কাজের লোক। ওদের মধ্যে মাখনের কাজ বাজার-হাট করা আর ফাঁইফরমায়েশ খাটা।
সকালবেলায় দুই বউয়ের সঙ্গে কথা বলে ভটচাজমশাই ফর্দ করে টাকাকড়ি দিয়ে মাখনকে বাজার পাঠাতেন। সকালে গোয়ালা বাড়ির সামনে গরু এনে দুধ দুইয়ে দিত কিন্তু বিকেলে মাখনই দুধ আনতে গোয়ালার ওখানে যেত।
সেদিন মাখন বাজার থেকে ফিরতেই নরোত্তম ওকে জিজ্ঞেস করলেন, ফর্দ মতো সব এনেছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
দেখি ফর্দটা।
মাখন ওঁর হাতে ফর্দ দিতেই মল্লিকমশাই চিৎকার করে বললেন, এই মদন দাঁড়িপাল্লাটা নিয়ে আয়।
মদন দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আসতেই মাখন হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নরোত্তমের দুটি পা জড়িয়ে ধরে বলে, কর্তাবাবু, জীবনে আর কখনো চুরি করব না। দয়া করে এবারের মতো ক্ষমা করে দেন; তা না হলে….
নরোত্তম মল্লিক এক লাথি মেরেই চিৎকার করে উঠলেন, হারামজাদা, আমি দুধ কলা দিয়ে এতকাল সাপ পুষেছি! তোকে আমি জেল খাঁটিয়ে তবে ছাড়ব।
