ছোটবউও হাসতে হাসতে বলেন, মল্লিকমশায়ের সোহাগ করার ধরন বুঝি তুমি জানো না, তাই না দিদি?
সে সব অল্প বয়সের কথা। এখন কি সেসব মনে আছে!
ইস! ভুলে গেছি!
ছোটবউ একটু থেমে একটু হেসে বলে, এসব কথা কি কেউ কোনোদিন ভুলে যায়?
বড়বউ দুহাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলেন, যাই বল ছোট, মল্লিকমশাই বেশ রসিক লোক, তাই না রে?
ছোটবউ একগাল হাসি হেসে বলেন, লোকটা যেন দিন দিন আরো বেশি রসিক হচ্ছে।
কাল রাত্তিরে উনি যে একটু বেশি রসিকতা করেছেন, তা তোর চোখ-মুখ দেখেই বুঝেছি।
হাসতে হাসতে কথাটা বলেই বড়বউ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলেন, দ্যাখ ছোট, তোকে একটা কথা বলি।
ছোটবউ ওঁর দিকে তাকাতেই উনি বলে যান, মল্লিকমশাই একটু আনন্দ-ফুর্তি করতে ভালবাসেন ঠিকই কিন্তু একথা স্বীকার করতেই হবে, এই মানুষটা একা শুধু বুদ্ধির জোরে ব্যবসা বাণিজ্য এমন বাড়িয়েছেন যে বড় বড় সাহেবরা পর্যন্ত তাঁকে খাতির না করে পারে না।
সে তো ঠিকই।
তাই তো বলছি, আমরা দুজনের কেউই যেন এমন কিছু না করি, যাতে ওঁর ব্যবসা বাণিজ্য বা সম্মান নষ্ট হয়।
না, না, দিদি, আমি তা কখনই করবো না।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, আমার বৌদি আমার মন বিষিয়ে না দিলে সেদিনের মতো কেলেঙ্কারি কখনই…
সেদিনের কথা তুই ভুলে যা।
বড়বউ ওর দুটি হাত ধরে বলে যান, দ্যাখ ছোট, মল্লিকমশাই আর চারটে ছেলেমেয়ে নিয়েই তোর আর আমার সংসার। এই সংসারের ভাল-মন্দ নিয়েই তো আমাদের থাকতে হবে। আমাদের সংসারের ব্যাপারে বাইরের কাউকে নাক গলাতে দিলে কী তোর আর আমার সম্মান বাড়বে, নাকি তিনটে ছেলে সুখে থাকতে পারবে?
ছোটবউ দুহাত দিয়ে ওঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলেন, দিদি, সত্যি বলছি, এই সংসার নিয়ে তোমার মতো আমি এত কিছু কোনোদিনই ভাবিনি। তাই তো দিনের পর দিন দাদা-বৌদির কথা শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল….
কী মনে হয়েছিল, তা আর তোকে বলতে হবে না।
বড়বউ একগাল হেসে ওকে বলেন, এবার থেকে তোর সব দুঃখের কথা আমাকে বলিস। তারপর আমি যদি তোর দুঃখ দুর করতে না পারি, তাহলে যাকে ইচ্ছে বলিস।
না, না, দিদি, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমাদের সংসারের ব্যাপারে বাইরের কারোর সঙ্গে আর কোনদিন কথা বলবো না।
এবার ছোটবউ একগাল হাসি হেসে বলেন, দিদি, তুমি বড্ড ভাল। আজ সারারাত ধরে তোমার গলা জড়িয়ে শুয়ে তোমাকে প্রাণভরে আদর করবো।
দূর হতভাগী।
বড়বউও হাসতে হাসতেই বলেন, অমন রসিক স্বামীকে ফেলে কোন দুঃখে আমার গলা জড়িয়ে শুবি?
.
মল্লিকবাড়ি আবার হাসি-খুশিতে ভরে উঠলেও নরোত্তমের মন থেকে সন্দেহের মেঘ দূর হয় না। হাজার হোক টাকা দেখতে গোল, থাকলে গোল, না থাকলেও গোল। তাইতো ভবিষ্যতে যে কোনো কেলেঙ্কারি ঘটবে না বা তার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংসার টুকরো টুকরো হয়ে যাবে না, তার কি কোনো ঠিকঠিকানা আছে?
নরোত্তম আপনমনেই বলেন, এত বছর ধরে পাগলের মতো পরিশ্রম করে যে বিষয় সম্পত্তি-টাকাকড়ি করেছি, তা নিয়ে ছেলেরা ছিনিমিনি খেলবে, সে আমি কখনই হতে দেব না।
কিন্তু ঠিক কী করা উচিত, তা ঠিক ভেবে পান না। তাছাড়া ভালভাবে ভাবনা-চিন্তা করার মতো অবকাশও ওঁর হয় না। তাইতো উনি মনে মনে ঠিক করেন, ব্যবসা বাণিজ্যের শত কাজ থাকলেও কয়েক দিনের জন্য বাইরে কোথাও যেতে হবে।
কয়েক দিন পর উনি জগদীশ ভটচাজমশাইকেই প্রথম বলেন, ভটচাজ মশায়, একটা বিশেষ জরুরি কাজে আমাকে কয়েক দিনের জন্য বাইরে যেতে হবে। তাছাড়া শরীরটাও বিশেষ সুবিধার নেই। তাই ভাবছি, বাইরে যখন যেতেই হবে, তখন দুচারদিন বিশ্রাম নিয়েই ফিরব।
তোমাকে তো কতদিন ধরেই বলছি, দিন কয়েক পুরী বা কাশী ঘুরে এসো, কিন্তু…
হ্যাঁ, আপনি অনেকবারই বলেছেন কিন্তু যখনই যাবো ভাবি, তখনই এমন সব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে কলকাতার বাইরে পা বাড়াতেই পারি না।
তুমি কতদিনের জন্য বাইরে যাবে?
স্যার আর্থারের অনুরোধে যাচ্ছি, তাই ঠিক বলতে পারছি না, কদিনের মধ্যে ফিরব।
নরোত্তম একটু থেমে বলেন, তবে দিন দশেকের বেশি লাগবে বলে মনে হয় না।
দিন দশেকের মধ্যে ফিরে এলে ঠিকই আছে কিন্তু তার বেশি হলে হয়তো এম্পায়ার টেক্সটাইলের কাপড়-চোপড়ের জাহাজটা এসে হাজির হবে। তখন তো তোমাকে…
ও জাহাজ কি রওনা হয়েছে?
দুএকদিন আগে হয়তো রওনা হয়েছে অথবা দুএকদিনের মধ্যেই রওনা হবে বলেই তো ওরা জানিয়েছিল। আশা করছি আজকালের মধ্যেই টেলিগ্রাফ এসে যাবে।
ও জাহাজ পৌঁছবার আগে আমি নিশ্চয়ই ফিরে আসব।
তাহলে তুমি নিশ্চিন্ত মনে যেতে পার।
পরের দিন সকালে জলখাবার খেতে খেতে নরোত্তম বড়বউ-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, জরুরি কাজে আমাকে কয়েক দিনের জন্য বাইরে যেতে হবে।
কয়েক দিন মানে?
ঠিক জানি না; তবে বোধহয় সাত-দশ দিন লেগে যাবে।
বড়বউ মুহূর্তের জন্য চাপা হাসি হেসে সতীনের দিকে তাকিয়েই বলেন, যাবে যাও কিন্তু ছোটকে সঙ্গে নিয়ে যাও। ও না থাকলে কে তোমার দেখাশুনা করবে?
আমি কি বেড়াতে যাচ্ছি যে ওকে সঙ্গে নিয়ে যাবো?
নরোত্তম না থেমেই বলে যান, আমি দুজন সাহেবের সঙ্গে জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছি।
বড়বউ এবার অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলেন, তা তো তুমি আগে বলেনি; তাই…
সেদিনই সন্ধে ঘুরতে না ঘুরতেই নরোত্তম সাবিত্রীর কাছে হাজির।
