না, না মল্লিকমশাই, ও কথা বলবেন না।
নিত্যানন্দ রায় হাসতে হাসতে বলে যান, আপনি মেয়ে-জামাইকে যে দান-সামগ্রী দিয়েছে, অতিথিদের আদর-আপ্যায়নের জন্য যে সুন্দর বিধিব্যবস্থা করেছিলেন, যে ধরনের গণ্যমান্য অতিথি সমাগম হয়েছিল, সেসব দেখে আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেছে। আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাবো, তা ভেবে পাচ্ছি না।
না, না, বেয়াইমশাই, ধন্যবাদ জানাবেন কেন? আমি তো আমার কর্তব্য পালন করার চেষ্টা করেছি মাত্র।
নরোত্তম একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, আপনি বাবাজীবনের পিতৃদেব। যদি আপনি সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, তা হলেই আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।
একশবার আমি খুশি হয়েছি।
হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনেই ওঁরা দুজনে আর কোনো কথা বলেন না।
নরোত্তম পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন, মাধুরীলতা আর বড়বউ দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছে। কাঁদছে আরো অনেকে। সুবল তো কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির ভিতরেই চলে গেল।
ঐসব কান্নাকাটি দেখতে দেখতে নরোত্তম একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ মাধুরীলতাকে আবার খুব জোরে কেঁদে উঠতে শুনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন, ছোটবউ এর ছোট ছেলে সুশীলকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ও বলছে, ছোড়দা, আমি তোকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।
সুশীলও পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলছে, মাধু, তোকে ছেড়ে আমিও থাকতে পারবো না।
তবু গোধূলির আলো মিলিয়ে যেতে না যেতেই মাধুরীলতা স্বামীর সংসারে চলে যায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক বিচিত্র শূন্যতা ও নীরবতায় ডুবে যায় মল্লিকবাড়ি।
.
ক্লান্ত বিষণ্ণ নরোত্তম মল্লিক সদরের বৈঠকখানায় তাকিয়া হেলান দিয়ে চুপচাপ শুয়েছিলেন আর আকাশ-পাতাল ভাবছিলেন।
হঠাৎ বড়বউ পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, অনেক রাত হলো। ঘরে যাবে না?
ও! তুমি?
নরোত্তম ওঁকে দেখেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বড়বউ, মাধু চলে গেলেও মনটা খুশিতে ভরে গেছে।
অমন পরিবারের একটা ভাল ছেলের হাতে মেয়েকে দিতে পারলাম বলে আমিও খুব খুশি।
হ্যাঁ, বড়বউ, জগন্নারায়ণ ছেলেটি সত্যি ভাল।
সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বড়বউ একটু হেসে বলেন, ছেলেটার কথাবার্তা শুনে আমার বুক জুড়িয়ে গেছে।
উনি সঙ্গে সঙ্গেই একটু উত্তেজিত হয়ে বলেন, জামাই দেখে তো আত্মীয়-স্বজনের চক্ষুস্থির হয়ে গেছে।
কেন?
কেন আবার?
বড়বউ এক নিঃশ্বাসেই বলে যান, একে অমন বিখ্যাত বাড়ির ছেলে, তার উপর রূপে-গুণে এত ভাল জামাই যে আমাদের কপালে জুটবে, তা কেউ ভাবতেই পারেনি।
বড়বউ, তুমি বা আমিই কি ভাবতে পেরেছিলাম, মাধুকে এমন গুণী ছেলের হাতে তুলে দিতে পারব?
নরোত্তম মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সবই মা সিদ্ধেশ্বরীর কৃপা।
সে তো একশবার সত্যি। মার কৃপা না হলে কি এসব হয়?
তবে বড়বউ, আমি আরো একটা কারণে খুব খুশি।
বড়বউ একটু অবাক হয়েই বলেন, আবার কী কারণে খুশি?
নরোত্তম বেশ গম্ভীর হয়েই বলেন, মাধু চলে যাবার সময় মেজখোকা আর ছোট। খোকার কান্নাকাটি দেখে বুঝলাম, ছোটবউ চেষ্টা করলেই বোধহয় আমার সংসারটা ভাঙতে পারবে না।
বড়বউ একগাল খুশির হাসি হেসে বলেন, তুমি তো সংসারের কোনো খবরই রাখো না। তাই তো জানো না, এই এত বড় হলেও ছোটখোকাকে এখনও আমার ঘুম পাড়িয়ে দিতে হয়।
তাই নাকি?
তবে আর বলছি কি?
বড়বউ প্রায় না থেমেই বলে যান, আমি ওর গায়-মাথায় হাত না দিলে ওর ঘুমই আসে না। আর তাই নিয়ে মাধু ওকে কি ঠাট্টাই করতো!
সতের-আঠারো বছরের ছেলেরও গায়-মাথায় হাত না দিলে ঘুম আসে না?
বড়বউ চাপা হাসতে হাসতে বলেন, এই কবছর আগে পর্যন্ত তো তুমি ছোটবউকে কাছে না পেলে ঘুমুতে পারতে না। তাই তো মাধুর মতো ছোট খোকাও…
ছোটবউ কিছু বলতো না?
আবার বড়বউ চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলেন, ছোট তো তোমাকে ছাড়া ঘুমতো পারত না। তাই তো…
এবার নরোত্তম একটু হেসে বলেন, শুধু ছোটবউকে কেন দোষ দিচ্ছে কি? এর আগে তুমিও কি আমাকে ছাড়া ঘুমুতে পারতে?
স্বামীর কাছে শুতে কোন মেয়ের ইচ্ছে করে না?
বড়বউ স্বামীর একটা হাত ধরে সামান্য একটু টান দিয়ে বলেন, চল, চল, ভিতরে শোবে চল।
নরোত্তম উঠে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করেন, আজ কি তোমার কাছে পোব?
না, না, আমার কাছে শুতে হবে না।
উনি না থেমেই বলে যান, যাও, যাও, ছোটর ঘরে যাও। তুমি একটু আদর-টাদর করলেই ওর রাগ চলে যাবে।
.
পরের দিন সকালে স্বামী আর তিন ছেলেকে জলখাবার খেতে দিচ্ছিলেন বড়বউ। স্নান করে ছোটবউ সেখানে এসেই সবার সামনে বললেন, দিদি, মাধুর ফুলশয্যার তত্ত্ব আমি সাজাব। তুমি নাক গলাতে পারবে না।
বড়বউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উনি বলে যান, এমন সাজিয়ে-গুছিয়ে তত্ত্ব পাঠাব যে জাহাজবাড়ির কর্তা-গিন্নিদের মাথা ঘুরে যাবে।
বড়বউ আপনমনে একটু হেসে বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুইই ও সব সাজাবি। আমি ওসব পারি নাকি?
এবার ছোটবউ হুকুম করেন, এই বড় খোকা, তত্ত্ব সাজাবার জন্য আজ বিকেলে আমাকে কিছু জিনিস এনে দিতে হবে।
সুবল মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ছোট মা, এনে দেব।
নরোত্তম আর ছেলেরা খেয়েদেয়ে চলে যেতেই বড়বউ সতীনের গাল টিপে আদর করে একটু চাপা গলায় বলেন, কাল রাত্তিরে মলিকমশাই বোধহয় একটু বেশি আদর করেছে, বেশি আনন্দ দিয়েছেন, তাই না রে?
