সকালের ডাকে বিলেত থেকে বেশ কয়েকটি চিঠি এসেছে। তার মধ্যে দুতিনটে ব্যবসা বাণিজ্যের চিঠি; বাকি সবগুলোই মেয়ের বিয়ের ব্যপারে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অনেকে। প্রায় সব চিঠির সঙ্গেই শখানেক পাউন্ডের একটা করে চেক।
নিছক সৌজন্যের খাতিরে এদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল কিন্তু তারা যে এভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে চিঠি লিখবেন ও চেক পাঠাবেন, তা নরোত্তম স্বপ্নেও ভাবেননি।
যাই হোক, এই চিঠিগুলো পড়ার সময় কখন যে ছোটবউ এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা উনি খেয়ালই করেননি।
বলি, তুমি কী ভেবেছ বলল তো?
হঠাৎ ছোটবউ-এর কথা শুনেই নরোত্তম মুখ তুলে তাকান।
দুনিয়ায় আর কি কেউ কোনোদিন মেয়ের বিয়ে দেয়নি? এভাবে হরির লুঠের মতো টাকা উড়িয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তুমি কি আমার ছেলে দুটোকে পথের ভিখিরি করে দিতে চাও?
ছোটবউ-এর কথা শুনে নরোত্তমের গা জ্বলে যায়। তাই তো উনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেন, আঃ! কি আজেবাজে বকবক করছো?
হঠাৎ ছোটবউ হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলেত থেকে আসা চিঠিপত্র চেকগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েই পাগলের মতো চিৎকার করে বললেন, এই মেয়ের বিয়েতে যত ব্যয় করছে, ঠিক তার ডবল টাকা আমার ছেলেদের বিয়ের জন্য এখনই দিতে হবে। তা না হলে….
না, নরোত্তম মল্লিক আর সহ্য করতে পারেননি। উনিও সঙ্গে সঙ্গে ছোটবউ-এর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরের দিকে পা বাড়িয়েই চিৎকার করে বললেন, হারামজাদি, বড্ড বেশি বেড়ে গেছিস। আমি কি তোর বাপের টাকা খরচ করছি যে তোকে জবাব দিতে হবে। আজ আমি তোকে দূর করে না দিয়ে জলগ্রহণ করব না।
ওঁর ঐ চিৎকার শুনে সারা বাড়ির লোকজন চমকে ওঠে। বিয়ে বাড়ির হাজার কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও সবাই কাজকর্ম থামিয়ে কর্তাবাবুর ঘরের দিকে এগিয়ে আসে।
নরোত্তম চিৎকার করে ওঠেন, এই গণেশ! এই হরিদাস! কোথায় গেলি তোরা?
হরিদাস ছুটতে ছুটতে বারান্দার কোনায় হাজির হয়ে কর্তাবাবুকে ছোট গিন্নিমার চুলের মুঠি ধরে লাথি মারতে মারতে কি যা তা গালাগালি দিতে দেখেই ভয়ে কাঁপতে থাকে।
হরিদাস হঠাৎ লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করতেই নরোত্তম গর্জে ওঠেন, এই হারামজাদা, পালাচ্ছিস কোথায়? মথুরা সিংকে এখুনি গাড়ি বের করতে বল। এই হারামজাদিকে এখুনি ওর চোদ্দ পুরুষের বাপের বাড়ি বিয়ে করতে হবে।
না, ছোটবউও চুপ করে থাকেন না। উনিও কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করেই বলেন, যেখানে খুশি পাঠাও কিন্তু আমি খালি হাতে যাবো না, যাব না, যাব না।
তুই যাবি না তোর বাপ যাবে।
নরোত্তম আবার একটা লাথি মেরে ছোট বউকে শাসান।
ছোটবউ কাঁদতে কাঁদতেই চিৎকার করেন, আমাকে মেরে ফেললেও আমি ছেলেদের পাওনা না নিয়ে যাব না যাব না…
ওরে হারামজাদি, আমি তোর চোদ্দ পুরুষের পাওনা মিটিয়ে দিচ্ছি।
দূর থেকে কর্মচারীরা এই দৃশ্য দেখলেও কেউ এগিয়ে আসতে সাহস করে না। এরই মধ্যে কে যেন খবর দেয় জগদীশ ভটচাজ আর বড় দাদাবাবু সুবলকে।
সুবল দৌড়ে এসে বাবার হাত টেনে ধরে বলে, কী করছেন আপনি? আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে যে ছোট মা-কে এভাবে…
এই ডাইনীকে আর ছোট মা বলে ডাকতে হবে না। এই হারামজাদি সব্বনাশ করার জন্যই..
আঃ বাবা! চুপ করুন।
সুবলও চিৎকার করে ওঠে।
ইতিমধ্যে বুড়ো ভোলানাথের মন্দিরে পুজো দিয়ে বড়বউ এসে হাজির হতেই সুবল চিৎকার করেই বলে, মা, শিগগির ছোট মা-কে নিয়ে যাও।
বড়বউ অবাক হয়ে বলেন, কী ব্যাপার কী? তোর বাবা আর ছোট মার…
ওর কথাটা শেষ হবার আগেই নরোত্তম গর্জে ওঠেন, এই হারামজাদিকে এখনই ঝাটা মেরে দূর করে দাও।
ছোটবউও সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলেন, নিজে বেশ্যা মাগীদের জন্য দুহাতে টাকা ওড়াবেন, মেয়ের বিয়েতে লাখ লাখ খরচ করবেন আর আমার ছেলে দুটো কি রাস্তায় ভিক্ষে করে বেড়াবে?
আমি সব সম্পত্তি দেবোত্তর করে দেব কিন্তু তোকে একটা তামার পয়সাও দেব না।
এবার বড়বউ চিৎকার করে ওঠেন, তোমরা দুজনে চুপ করবে নাকি আমি গলায় দড়ি দেব?
উনি মুহূর্তের জন্য না থেমেই সুলকে বলেন, বড় খোকা, তোর বাবাকে ঘরে নিয়ে যা।
সুবল ওর বাবাকে জোর করে ঘরের মধ্যে নিয়ে যাবার পর পরই বড়বউ কোনোমতে ছোট সতীনকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন।
.
ব্যাপারটা তখনকার মতো থেমে গেলেও সমস্যাটা যে মিটল না, তা সবাই বুঝলেন। এ বাড়ির একমাত্র মেয়ে মাধুরীলতার বিয়ে নিয়ে যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তা আর রইল না। সমস্ত বাড়ির মানুষগুলোর মুখ থেকে হঠাৎ হাসি-খুশির ভাব হারিয়ে গেল।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত মাধুরীলতার বিয়ে বেশ ভালভাবেই মিটে গেল। বিয়ের পরদিন সন্ধের সময় পুত্র আর পুত্রবধুকে নিয়ে যাবার আগে পাইকপাড়া জাহাজবাড়ির বড়কর্তা স্বয়ং নিত্যানন্দ রায় নরোত্তম মল্লিকের দুহাত ধরে বললেন, মকিমশাই, কি বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো, তা ভেবে পাচ্ছি না। তবে শুধু এইটুকু বলে যাই, কাশিমবাজার বা বর্ধমানের মতো দুচারজন রাজা-মহারাজারাও বোধহয় এভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারতেন না।
নরোত্তম সকিনয়ে একটু হেসে বলেন, কি যে বলেন বেয়াইমশাই, রাজা মহারাজাদের সঙ্গে কি আমার মতো চুনো-পুঁটি ব্যবসাদারের কোনো তুলনা হয়?
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, আপনাদের সম্মান-মর্যাদা রাখার মতো তো কিছুই করতে পারলাম না।
