এতক্ষণ পর বড়বউ একটু হেসে বলেন, কিন্তু তার আগেই যদি তোমার মেয়ে জামাই ঐ সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়?
নরোত্তম দুহাতের দুটো বুড়ো আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, তা হবে না বড়বউ। সেসব রাস্তা বন্ধ না করে কি এই সম্পত্তি ওদের হাতে তুলে দেব? নরোত্তম। মল্লিক অত কাঁচা কাজ করার মতো পাত্র না।
সারা কলকাতায় তখন জাহাজরড়ির ছেলের সঙ্গে নরোত্তম মল্লিকের মেয়ের বিয়ের আলোচনা। এমনকি বেঙ্গল ক্লাবের আড্ডাখানায় পর্যন্ত সাহেবরা ঐ একই বিষয় নিয়ে কথাবার্তা না বলে পারেন না।
বেঙ্গল গভর্নমেন্টের হোম সেক্রেটারি মিঃ গোল্ডস্মিথকে দেখেই বেঙ্গল চেম্বারের প্রেসিডেন্ট স্যার আর্থার এগিয়ে গিয়ে একটু হেসে বললেন, হ্যালো গোল্ডস্মিথ, হঠাৎ একদিন পর ক্লাবে এলে কেন?
ইচ্ছে তো হয় রোজই ক্লাবে আসি কিন্তু রাইটার্স থেকে বেরিয়ে রোজই একবার গভর্নমেন্ট হাউসে যেতে হয়। তাই আর…
গভর্নর কী ক্যালকাটার বাইরে যে আজ ক্লাবে আসার সুযোগ পেলে?
ইতিমধ্যে ওঁদের চারপাশে আরো অনেকেই জড় হয়েছেন।
মিঃ গোল্ডস্মিথ হাসতে হাসতে বললেন, আজ ক্লাবে এসেছি ভেরি ফানি কারণে।
সবাই অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকাতেই হোম সেক্রেটারি বললেন, হিজ একসেলেনসিই আমাকে ক্লাবে পাঠালেন আপনার মতো দুএকজনের সঙ্গে কথা বলতে।
এনিথিং সিরিয়াস?
নো স্যার আর্থার, নাথিং সিরিয়াস…
তবে?
আজ গভর্নমেন্ট হাউসে যেতেই হিজ একসেলেনসি একটু হেসে বললেন, গোল্ডস্মিথ, তোমার মতো আমিও ক্যালকাটায় নতুন। তাই বেঙ্গলি অ্যারিস্টোক্র্যাট সোসাইটির সোস্যাল কাস্টমস জানি না। সো, গো টু ক্লাব, টক টু ও ক্যালকাটা হ্যাঁন্ড লাইক স্যার আর্থার। জিজ্ঞেস করবে, বেঙ্গলিদের বিয়েতে কী উপহার দেওয়া যায়।
স্যার আর্থার হুইস্কির গেলাসে একেটু চুমুক দিয়েই হাসতে হাসতে বললেন, গভর্নর কি রয়দের রিসেপসনে যাবেন? নাকি…
ইয়েস, ইয়েস, হি ইজ গোয়িং দেয়ার।
আর বেঙ্গল চেম্বারের আমরা প্রায় সবাই যাচ্ছি মিঃ মালিকের বাড়ি।
মাই গড!
মিঃ গোল্ডস্মিথ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, হু ইজ দিস মালিক?
ক্যালকাটার চার-পাঁচজন বিখ্যাত ব্যবসায়ীদের একজন।
আই সি।
গোল্ডস্মিথ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন, অ্যান্ড রয় ফ্যামিলি?
ওরা ইস্ট-ওয়েস্ট শিপিং কোম্পানীর মেজর শেয়ার হোল্ডার।
নাউ আই আন্ডারস্টান্ড হোয়াই হিজ একসেলেনসি উইল বি গোয়িং দেয়ার।
স্যার আর্থার হুইস্কির গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে বলেন, হোয়াইটওয়ে লেডলর মিঃ বল্ডউইনকে বললেই উনি গভর্নরের জন্য প্রোজেনটেশন পছন্দ করে পাঠিয়ে দেবেন। এর জন্য আপনাদের কিছু চিন্তা করতে হবে না।
মিঃ গোল্ডস্মিথ ওঁকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ভেরি গুড আইডিয়া।
সো ইউ আর নাউ ফ্রি টু এনজয় ড্রিঙ্কস?
অব কোর্স!
কৌন হ্যায়? জলডি হুইস্কি লে আও!
.
এধরনের বিয়ে বা উৎসব কলকাতায় বছর বছর হয় না। একমাত্র গভর্নরের পার্টি ছাড়া এ ধরনের ব্যবসার সুযোগও গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল বিশেষ পায় না। তাই তো গ্রেট ইস্টার্নের ম্যানেজার মিঃ ব্রেইলি দুতিনজন ভারতীয় সহকারীকে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন নরোত্তম মল্লিকের বাড়ি।
ঘণ্টা দুয়েক ধরে আলাপ-আলোচনার পর নরোত্তম বললেন, মিঃ ব্রেইলি, আপনি বুঝতে পারছেন, কী ধরনের অতিথিরা আমার মেয়ের বিয়েতে আসছে?
স্যার, গভর্নরের পার্টিতে যাঁরা আমন্ত্রিত হন, তারা সবাইই আপনার মেয়ের বিয়েতে আসছেন।
তাই আমি আশা করি, আপনি বেস্ট ড্রিঙ্ক, বেস্ট ফুড, বেস্ট সার্ভিস দিয়ে ওঁদের যোল আনা খুশি করবেন।
স্যার, আমি কথা দিচ্ছি, গ্রেট ইস্টার্ন তার ঐতিহ্য ও আপনার মর্যাদা রক্ষা করতে ত্রুটি করবে না।
আর হ্যাঁ, আই আমার অফিস থেকে পঁচিশ হাজার টাকর একটা চেক নেবার ব্যবস্থা করবেন।
সরি স্যার! আপনার মতো বিখ্যাত ও সম্মানিত মানুষের কাছ থেকে এক পয়সাও অ্যাডভান্স নিতে পারব না। আমাকে মার্জনা করবেন।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
মেয়ের বিয়ে তো নয়, এ যেন অশ্বমেধ যজ্ঞ। নরোত্তম মল্লিকের প্রায় নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ নেই। শুধু উনি কেন, জগদীশ ভটচাজ থেকে শুরু করে ষাট-সত্তরজন কর্মচারীরও একমুহূর্ত ফুরসত নেই। থাকবে কী করে? একে জাহাজবাড়ির লোকজন। আত্মীয় বন্ধুদের কাছে পরিবারিক সম্মান, তার উপর গণ্যমান্য-বরেণ্য ইংরেজ অতিথিদের খুশি করে ভবিষ্যত ব্যবসা বাণিজ্যের পথ সুগম করা।
নরোত্তম কোনো দিক দিয়েই কোনো ত্রুটি রাখছে না। বিয়ের দান-সামগ্রী দেখে শুধু বড় বউ-এর না, সবারই চক্ষুস্থির হয়ে গেছে। আশেপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, কোনো বিয়ে বাড়িতে এত বড় ম্যারাপ বাঁধা হয়নি কোনোদিন। বিয়ের আসরে সানাই বাজাতে আসছেন কাশীর বিখ্যাত ওস্তাদ নাসিরুদ্দীন খাঁ সাহেব। বৌভাতের দিন লাটসাহেব জাহাজবাড়ি যাবেন বলে নিত্যানন্দ রায় কলকাতা পুলিশের ব্যান্ড পার্টির ব্যবস্থা করেছেন শুনেই নরোত্তম বেঙ্গল চেম্বারের প্রেসিডেন্ট স্যার আর্থারকে ধরে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে মিলিটারি ব্যান্ড পার্টি আনার ব্যবস্থা পাকা করেছেন। তবে হ্যাঁ, তার জন্য উনি হাসিমুখে সৈনিক কল্যাণ ফান্ডে দশ হাজার টাকা দান করেছেন।
কিন্তু বিয়ের মাত্র তিন দিন আগে যে ছোটবউ এমন অশান্তি করবেন, নরোত্তম তা স্বপ্নেও ভাবেননি।
