বলেন কী ভটচাজমশাই?
তবে আর বলছি কী?
ভটচাজমশাই একটু থেমে বলেন, শ্রীমান আবার আইনের ডিগ্রি নেবে বলে ঠিক করেছে।
বড়বউ একটু হেসে বলেন, এত লেখাপড়া জানা জামাইয়ের সঙ্গে কীভাবে যে কথা বলব, তাই তো ভেবে পাচ্ছি না।
নরোত্তম বললেন, বুঝলে বড়বউ, একে রায় পরিবারের ছেলে, তার উপর এত পাশ করেছে কিন্তু এমন ভদ্র-সভ্য-বিনয়ী যে আমরা দুজনেই অবাক হয়ে গেছি।
.
যাই হোক, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হবার পরই নরোত্তম মল্লিক জগদীশ ভটচাজকে বললেন, হাতে মাত্র আড়াই মাস সময়। বিয়ে-টিয়ে টিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ব্যবসা বণিজ্যের কোনো ব্যাপারেই আমি সময় দিতে পারবো না। সবকিছু আপনিই সামলাবেন।
জগদীশ ভটচাজ একটু হেসে বলেন, হাজার হোক আমি তোমার কর্মচারী। আমার উপর সব ছেড়ে দিলে হয়তো তোমার পরিবারের লোকজনই অসন্তুষ্ট হবে।
দেখুন ভটচাজমশাই, কে কোথায় সন্তুষ্ট-অসন্তুষ্ট হলো, তাতে নরোত্তম মল্লিকের কিছু যায়-আসে না। আপনি ছাড়া আর কাউকেই যে বিশ্বাস করি না, তা তো আপনি খুব ভাল করেই জানেন।
নরোত্তম একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, এখন বলুন, আমি মেয়ের বিয়েতে কত খরচ করতে পারি।
দশটি নয়, পাঁচটি নয়, তোমার একটিই মেয়ে। তারপর বিয়ে দিচ্ছো অমন বিখ্যাত পরিবারের অত গুণী ছেলের সঙ্গে।
ভটচাজমশাই একটু হেসে বলেন, তাছাড়া তোমার মতো ধনী ব্যবসায়ীই বা কলকাতায় কজন আছে। তাই টাকাকড়ি নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমরা। স্বামী-স্ত্রী মিলে যা চাইবে, তা নিশ্চয়ই হবে।
তবু আপনি একটু ভেবে দেখবেন, কত টাকা পর্যন্ত খরচ করলে ব্যবসাবাণিজ্য চালাতে অসুবিধে হবে না।
হ্যাঁ, দেখব।
আর হ্যাঁ, লিভারপুলের জাহাজ কবে এসে পৌঁছবে?
সামনের রবিবার; তবে মাল ছাড়াতে হবে মঙ্গলবার।
কত টাকার মাল আসছে?
মোটামুটি তিরিশ লাখ টাকার মাল আসছে। তবে মাল ছাড়াতে মাত্র লাখ দশেক লাগবে।
তার মানে কুড়ি লাখই আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন?
এক পার্সেন্ট বেশি কমিশন পাওয়া যাবে বলে…
নরোত্তম হাসতে হাসতে বলেন, তার মানে তিন লাখের জায়গায় তিন লাখ তিরিশ হাজার আমরা পাচ্ছি?
হ্যাঁ।
উনি একটু থেমে একটু হেসে বলেন, তোমার মেয়ের বিয়ের আগে যে আরো তিনটে জাহাজে আমাদের যা মাল আসবে, তার থেকে মোটামুটি লাখখানেক অতিরিক্ত কমিশন পেয়ে যাবে।
বাঃ! দারুণ খবর শোনালেন।
তাই তো বলছিলাম, নিজের সম্মান প্রতিপত্তি অনুযায়ী বিয়ের ব্যবস্থা করো। টাকাকড়ির জন্য ভাবতে হবে না।
সেদিন রাত্রেই নরোত্তম বড়বউকে জিজ্ঞেস করলেন, বলল, মেয়ের বিয়েতে কী দিতে চাও, কী করতে চাও।
আমি আবার কী বলব? তুমি যা ভাল মনে করো, তাই করবে।
হাজার হোক আমাদের একটাই মেয়ে। তার বিয়েতে তোমার কী দিতে ইচ্ছে করছে। বা কি করতে চাও, তা তো বলবে।
আমি মেয়েটাকে গহনা দিয়ে ভরিয়ে দিতে চাই।
বোধহয় পরশু দিন বিকেলেই নাদুবাবু ডিজাইনের বই নিয়ে আসবেন। তোমার পছন্দমতো সব গহনাই উনি গড়িয়ে দেবেন।
হীরের গহনাগুলোর কথাও কি ওঁকে বলব? নাকি তোমাদের…
সব গহনার দায়িত্ব নাদুবাবুর। তবে উনি বলেছেন, হীরের গহনাগুলো বোম্বাই থেকে তৈরি করিয়ে আনবেন।
হ্যাঁ, আমিও তাই চাইছিলাম।
নরোত্তম একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, বড় বউ, আমি কি জানি না, এখানকার তৈরি হীরের গহনা তোমার ভাল লাগে না?
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তবে কাপড়-চোপড়ের জন্য তিন-চারজনকে বলে দেব। একজনের কাছে সব পছন্দমতো শাড়ি নাও পেতে পারো।
তবে কাঞ্জিলালবাবুকে আগে আসতে বলল।
হ্যাঁ, বলব।
বড়বউ একটু হেসে জিজ্ঞেস করেন তুমি জামাইকে কী দিচ্ছো?
নরোত্তম একটু গম্ভীর হয়েই বললেন, বিয়ের দানসামগ্রী হিসেবে যা দেওয়া উচিত তা নিশ্চয়ই দেব। তাছাড়া আর কী দেওয়া যায়, তাই ভাবছি।
আর কী দেওয়া যায় মানে?
এবার উনি মুখ তুলে বড়বউয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, হাজার হোক অত বড় বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি। ওরা যেন না ভাবে, আমার মেয়েটা কোনো আলতু-ফালতু পরিবার থেকে এসেছে।
বড়বউ চুপ করে থাকলেও নরোত্তম একটু পরে আবার বলেন, পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই ঠিক করব, কী দিলে ও বাড়িতে আমার মেয়েটার সম্মান থাকে।
পাঁচ-সাত দিন না, দিন পনের পর জগদীশ ভটচাজের সঙ্গে পরামর্শ করে নরোত্তম ঠিক করলেন, বেশ কয়েক বছর আগে মিসেস শিলটনের কাছ থেকে কেনা ধর্মতলার একটা বাড়ি মেয়ে-জামাইয়ের নামে দানপত্র লিখে দেবেন।
খবরটা বড়বউকে জানিয়ে নরোত্তম মুচকি হেসে বললেন, সম্প্রদান হয়ে যাবার পর মেয়ে-জামাই-এর হাতে এই দানপত্র তুলে দিলে ঐ জাহাজের কারবারি নিত্যানন্দ রায় পর্যন্ত হাঁ হয়ে যাবে।
কেন? বাড়িটা কি খুব বড়?
ধর্মতলার সাহেবপাড়ায় দেড় বিঘে জমির উপর তিনতলা বাড়ি। ওখানে এখন বোধহয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় জমির দাম বাড়ছে।
তাই নাকি?
তবে কী?
নরোত্তম আবার একটু হেসে বলেন, বড়বউ, একদিন হয়তো কালীঘট-ভবানীপুরও আমাদের বাগবাজার-আহিরীটোলার মতো জমজমাট হবে। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর বছর পরে হয়তো বেহালা বা টালিগঞ্জের মতো গ্রাম-গঞ্জগুলোতেও হাজার হাজার পাকা বাড়ি উঠে। শহর হয়ে যাবে কিন্তু ধম্মতলা চিরকালই ধম্মতলা থাকবে।
বড়বউ চুপ করে ওঁর কথা শোনেন।
বুঝলে বড়বউ, তুমি বা আমি অনন্তকাল বেঁচে থাকব না। তবে আমি বলে দিচ্ছি, এই একটা সম্পত্তির জন্যই তোমার নাতিরা বা তার ছেলেরা তোমাকে আর আমাকে পুজো করবে।
