উনি একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলে যান, আমার অ্যাকাউন্টসবাবুর ছেলে আছে। বি. কম. পাশ করে রেল কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে। আমি অ্যাকাউন্টসবাবুর সঙ্গে কথাও বলে রেখেছি। আমার পছন্দমতো মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতে ওঁর কোনো আপত্তি নেই।…
মালতী দেবী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ছেলেটিকে দেখেছেন?
হাজার বার দেখেছি।
সুরেশ বলল, ছেলেটিকে আমিও খুব ভাল করে চিনি। ছেলেটি বেশ ভদ্র-সভ্য।
গুপ্তাজি বললেন, মিত্তিরবাবু, যদি দেরি না করে ঐ ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন, তাহলে আমি বিয়ের খরচের জন্য দশ-পনের হাজার টাকা ব্যয় করতে পারি।
না, এইটুকু বলেই উনি থামলেন না। প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বললেন, আর যদি আপনাদের আপত্তি থাকে, তাহলে সামনের রবিবারই আপনার বাড়ি আমি ছেড়ে দেব।
হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত এই ছেলের সঙ্গেই বীণার বিয়ে হলো। কিন্তু মজার কথা, তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে রমেশ বালিগঞ্জে তার ভাবী শ্বশুরের নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেল।
.
০৮.
ইদানীং সময় সুযোগ পেলেই বড়বউ স্বামীকে বলেন, আচ্ছা, তুমি কি শুধু ব্যবসা বাণিজ্য নিয়েই মেতে থাকবে? মেয়েটা যে ধেই ধেই করে বড় হচ্ছে, তা কি দেখতে পাও না?
নরোত্তম মলিক একটু হেসে বলেন, ওরে বাপু, এখন আর সে যুগ নেই। পনের যোল বছরে মেয়ের বিয়ে দিলেও কেউ কিছু বলবে না।
এসব বিলেতফেরত জজ-ব্যারিস্টারের ঘরে হতে পারে। আমাদের সমাজে তা হয় না।
বড়বউ মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, মেয়েটা তের বছরে পা দিল। এখনই উঠে-পড়ে লাগলেও হয়তো চোদ্দ-পনের পার হয়ে যাবে।
নরোত্তম বড়বউ-এর একটা হাত ধরে একটু হেসে বলেন, আমার উপর বিশ্বাস রাখো; আমি ঠিক সময়েই তোমার মেয়ের বিয়ে দেব।
বিশ্বাস কেন রাখব না?
বড়বউ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, একটু দেখেশুনে ভাল ঘরে মেয়েটাকে না দেওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি পাব না।
বড়বউ ভুলে যেও না, নরোত্তম মল্লিকের মেয়েকে পেয়েও অনেক পরিবার ধন্য হয়ে যাবে।
উনি একটু থেমে বলেন, তাড়াহুড়ো করে যার-তার হাতে তো মেয়েটাকে তুলে দিতে পারি না।
মাঝে মাঝেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই ধরনের কথাবার্তা হয়।
হ্যাঁগো, আর দেরি করো না। মেয়েটার বিয়ে দেবার জন্য এবার একটু উঠে-পড়ে লাগো।
বড় বউ একবার নিঃশ্বাস নিয়েই আবার বলেন, মেয়েটা এমন সোমত্ত হয়ে উঠেছে যে….
ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই নরোত্তম বলেন, বড়বউ, ইতিমধ্যেই তিন-চারটে পাত্রের খবর পেয়েছি। খোঁজ-খবর নেবার জন্য লোকজনও লাগিয়েছি। দেখি, কী হয়।
বড়বউ এক গাল হাসি হেসে, কই, আমাকে তো কিচ্ছু বলোনি।
নরোত্তম মল্লিক একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, আগে জাল গুটিয়ে নিই। তারপর ঠিকই খবর পাবে।
.
দিন পনের পরই একদিন দুপুরের দিকে হঠাৎ জগদীশ ভট্টাচার্য প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে বড়বউকে বললেন, এখুনি খবর এলো, পাইকপাড়ার রায়বাড়ির বড়কর্তা আজ বিকেলেই তোমার মেয়েকে দেখতে আসবেন।
আজই?
হ্যাঁ।
জগদীশ ভট্টচাজ একটু থেমে বলেন, পাইকপাড়ার রায়রা অনেক জমিদারদের চাইতেও বেশি টাকাকড়ি, বিষয়-সম্পত্তির মালিক।
কেন? ওরা কীসের ব্যবসা করে?
ওরা জাহাজের ব্যবসা করে?
জাহাজের?
তবে কি এমনি বললাম, ওরা অনেক জমিদারদের চাইতেও…
তা ওঁরা কজন আসবেন?
বোধহয় পাঁচ-সাতজন।
বড় বউ মুহূর্তের জন্য একটু ভেবে-চিন্তে বলেন, ঠিক আছে। আমি এদিকে সব বিধিব্যবস্থা করছি কিন্তু আপনি বাগবাজার বা রামবাগান থেকে ভাল মিষ্টি আনার ব্যবস্থা করবেন।
মিষ্টির কথা আগেই বলে দিয়েছি। ওসব বিকেলের মধ্যেই এসে যাবে।
.
সন্ধের পরপরই পাইকপাড়ার রায়বাড়ির বড়কর্তা নিত্যানন্দ রায় সদলবলে এসে হাজির হন। আদর-আপ্যায়নের পর্ব শেষ হতেই নিত্যানন্দ রায় হাসতে হাসতে বলেন, মল্লিকমশাই, আপনার কন্যা দেখতে আসার জন্য যদি এইভাবে-আপ্যায়ন করেন, তাহলে বিয়ের দিন কী করবেন?
নরোত্তেম মল্লিক সলজ্জ হাসি হেসে বলেন, আজ্ঞে, আপনার সম্মান রাখার জন্য কী আর করতে পারলাম যে এভাবে বলে লজ্জা দিচ্ছেন।
মল্লিকমশাই, আপনি তো বড় বিনয়ী।
যাই হোক, মাধুরীলতাকে দেখে সবার সামনেই নিত্যানন্দ রায় বললেন, মল্লিকশই, আপনার মেয়ে তো সাক্ষাৎ মা দুর্গা।
উনি এক নিঃশ্বাসে বলে যান, আপনি আমার ছেলেকে দেখুন। যদি পছন্দ হয়, তাহলে যেদিন বলবেন, সেইদিনই আমি আমার মা দুর্গাকে বরণ করে ঘরে তুলব।
আপনার ছেলেকে আবার কী দেখব?
না, না, মল্লিকমশাই, ও কথা বলবেন না। যার হাতে এমন মা জননীকে তুলে দেবেন, তাকে দেখবেন না, তাই কখনো হয়?
দিন দশেক পর শুধু জগদীশ ভটচাজকে সঙ্গে নিয়ে নরোত্তম মল্লিক নিত্যানন্দ রায় এর কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীমান জগনারায়ণকে দেখে এসে বড়বউকে বললেন, তোমার জামাইকে দেখতে তো সাক্ষাৎ কার্তিক ঠাকুর।
বড়বউ এক গাল হাসি হেসে বলেন, দেখতে এত ভাল?
সত্যি বলছি, বড়বউ, এমন সুপুরুষ ছেলে হঠাৎ চোখে পড়ে না।
জগদীশ ভটচাজ দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বললেন, শুধু রূপের কথা কেন বলছ? ছেলেটার গুণের কথা বলল।
নরোত্তম বললেন, আমি বললেই মনে করবে বাড়াবাড়ি করছি। যা বলার আপনিই বলুন।
ভটচাজমশাই বললেন, আশু মুখুজ্যের মতো জাঁদরেল জজ যে বিশ্ববিদ্যালয় চালায়, সেখান থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ডিগ্রি পাওয়া কি ছেলেখেলার ব্যাপার?
