কিন্তু না, খুকু তা পারে না। কিশোরী হলেও সে জানে, এসব কথা বাবা-মাকে বলতে নেই।
ওরা খুকুকে দেখতে না পেলেও খুকু পর্দাটা সামান্য একটু ফাঁক করে দেখে, রমেশদা ছোড়দিকে কোলে বসিয়ে আদর করছে; আর ছোড়দিও দুহাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে আছে।
খুকু ওকে ডাকার চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুল না।
কয়েক মুহূর্ত পর একটু সাহস করে একটু জোরেই বলে, এই ছোড়দি! বাবা এসে গেছে। মা…
ও কথাটা শেষ করার আগেই ওরা চমকে ওঠে। বীণা বোধহয় কাপড়-চোপড় ঠিক করার জন্যই এক লাফে বড় আলমারির ওপাশে চলে যায়।
রমেশও এক লাফে দরজার কাছে এসে খুকুর হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়।
খুকু, প্লিজ কাউকে কিছু বলল না। তুমি যা চাইবে, আমি তাই দেব।
খুকু মুখ নিচু করে একটু হাসে। মুখে কিছু বলে না, বলতে পারে না।
রমেশ আবার বলে, কি খুকু, কাউকে কিছু বলবে না তো?
খুকু আগের মতোই মুখ নিচু করে কোনোমতে বলে, না।
রমেশ ওর দুটো হাত ধরে বলে, আমি জানতাম, তুমি আমার কথা রাখবে। আমি কালই তোমাকে একটা দারুণ প্রেজেনটেশন দেব।
খুকু ওর দিকে তাকিয়ে শুধু একটু হাসে।
সিঁড়ি দিয়ে দুএক ধাপ নামতেই বীণাও খুকুর দুহাত ধরে বলে, প্লিজ, কাউকে কিছু বলিস না। আমি সারাজীবন তোর গোলাম হয়ে থাকব।
বলেছি তো বলব না।
ওরা দুজনে রান্নাঘরে ঢুকতই মালতী দেবী বললেন, কীরে তোদের এত দেরি হলো?
খুকু সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, রমেশদার সঙ্গে একটু কথা বলছিলাম।
.
অন্যদিন বীণা যখন শুতে আসে, তখন খুকু অঘোরে ঘুমোয়। আজ দুই বোনে একই সঙ্গে শুতে যায়।
বীণা ওর গলা জড়িয়ে শুতেই খুকু একটু হেসে ফিসফিস করে বলে, আজ হঠাৎ আমার গলা জড়িয়ে ধরলি যে!
তোকে আদর করতে ইচ্ছে করছে, তাই।
অন্যদিন তো আদর করিস না।
আমি রোজই তোর গলা জড়িয়ে শুই।
ইস! রোজ গলা জড়িয়ে শোয়!
খুকু মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, কেন মিথ্যে কথা বলছিস?
সত্যি কথাটা শেষ হবার আগেই খুকু জিজ্ঞেস করে, হারে ছোড়দি, তুই রমেশদাকে ভালবাসিস?
হ্যাঁ।
রমেশদাও তোকে ভালবাসে?
হ্যাঁ।
রমেশদা তোকে রোজ আদর করে?
না, না, রোজ না।
ইস! আবার মিথ্যে কথা বলছিস?
মা কালীর নামে বলছি, রোজ আদর করে না; তবে মাঝে মাঝে করে।
তুই নিশ্চয়ই রোজ রমেশদাকে আদর করিস?
বীণা কোনো মতে হাসি চেপে বলে, করলেও এক-আধ মিনিটের জন্য।
দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর খুকু বলে, আচ্ছা ছোড়দি, রমেশদা যে তোকে ঐভাবে আদর করছিল বলে তোর লজ্জা করছিল না?
কীভাবে আদর করছিল?
ইস! আমি যেন দেখিনি।
বীণা একটু বিরক্ত হয়েই বলে, আর বকবক না করে এবার ঘুমোতে দে।
ঠিক আছে বকবক করব না কিন্তু তোরা দুজনেই বড় অসভ্য।
খুকু, পাকামি বন্ধ করবি?
তোরা অসভ্যতা করবি আর বললেই পাকামি হয়ে গেল, তাই না?
এবার বীণা রেগেই বলে, বেশ করেছি অসভ্যতা করেছি।
ও এক নিঃশ্বাসেই বলে যায়, যাকে বিয়ে করব, তার সঙ্গেই অসভ্যতা করেছি; কোনো রাস্তার ছেলের সঙ্গে তো…।
খুকু অবাক হয়ে বলে, তুই রমেশদাকে বিয়ে করবি?
হ্যাঁ, করব।
মাকে বলেছিস?
কখন কাকে বলব, তা নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না।
খুকু মাথা না ঘামালেও কিছুদিনের মধ্যে ওদের ব্যাপার নিয়ে সবাইকেই মাথা ঘামাতে হলো।
.
হঠাৎ গুপ্তাজির বড়ছেলে সুরেশ সস্ত্রীক এসে রামপ্রসন্ন আর মালতী দেবীকে নেমন্তন্ন করায় ওঁরা একটু অবাকই হলেন কিন্তু নেমন্তন্ন গ্রহণ না করে পারলেন না।
পরের রবিবার দুপুরে মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বাসায় রামপ্রসন্ন স্ত্রীকে নিয়ে হাজির হতেই শুধু সুরেশ না, ওর বাবা-মাও ওঁদের অভ্যর্থনা করলেন।
গল্পগুজব খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ হবার পর স্বয়ং গুপ্তাজিই রামপ্রসন্ন আর মালতী দেবীকে বললেন, আপনাদের দুজনের সঙ্গেই জরুরি কথা বলার জন্য এখানে টেনে এনেছি।
ওঁর কথা শুনে রামপ্রসন্ন ঘাবড়ে গেলেও মুখে বলেন, হ্যাঁ, বলুন।
দেখুন মিত্তিরবাবু, আপনাদের বাঙ্গালি সমাজের মতো আমাদের সমাজ ঢিলেঢালা না। সমাজের নিয়ম মেনে না চললে আমাদের অনেক খেসারত দিতে হয়। তাই তো বীণার সঙ্গে রমেশের শাদি হলে আমার ভাতিজিদের বিয়ে-শাদি দিতে বহুত ঝামেলা হবে।
ঘরের পরিবেশ বেশ থমথমে হলেও রামপ্রসন্ন একটু হেসে বলেন, হাজার হোক আজকালকার ছেলেমেয়ে। যদি ওরা নিজেরাই বিয়ে করে, তাহলে…
গুপ্তাজি একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, তা করতে পারে কিন্তু তাহলে রমেশ আমার ব্যবসা বাণিজ্য টাকাকড়ির ফুটো পয়সাও পাবে না।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, এই আমার বড়ছেলের সামনেই বলছি, ওরা দুভাই যতই ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশুনা করুক, ওরা কেউই মালিক না। যোল আনা মালিক আমি।
গুপ্তাজি একবার সুরেশের দিকে তাকিয়ে বলেন, তবে হ্যাঁ, ওরা সবাই ঠিকঠাকমতো চললে আমি ঠিক সময় তিন ছেলের মধ্যে সবকিছু বাঁটোয়ারা করে দেব।
রামপ্রসন্ন আর মালতী দেবী মুখ নিচু ওঁর কথা শোনেন। একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না।
শুনুন মিত্তিরবাবু, এবার আসল কথা বলি।
গুপ্তাজি অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলে যান, চটপট আপনাকে বীণার শাদি দিতে হবে। আর সেজন্য আমি সব রকম সাহায্য করতে রাজি।
এতক্ষণ পর মালতী দেবী বললেন, দাদা, বললেই কি মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায়?
গুপ্তাজি একটু হেসে বললেন, বহিনজি, মেয়ের বিয়ে দিতে হলে ছেলে দেখতে হবে, টাকাকড়ির ব্যবস্থা করতে হবে, তা কি আমি জানি না?
