নিজের বুকের দিকে একবার তাকিয়ে বীণা বলে, এই ব্লাউজ কিনে কী অন্যায় করেছি?
অর্ধেক বুকই যদি দেখা গেল, তাহলে আর ব্লাউজ পরার দরকার কী?
তুমি কী চাও, আমি ঠাকুর-দিদিমাদের মতো সেমিজ পরে ঘুরে বেড়াই?
মালতী দেবী কিছু না বললেও বীণা বলে, আজকাল সব মেয়েই এইরকম ব্লাউজ পরে।
মালতী দেবী মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বলেন, এইজন্যেই তো ছেলেরা পথে ঘাটে তোদের সঙ্গে বাঁদরামি করে।
পরের দিন এগারটা নাগাদ বীণা বেরিয়ে যেতেই মালতী দেবীর মনের মধ্যে নানা ভাবনা-চিন্তা ভিড় করে। রমেশ যত ভদ্র-সভ্যই হোক, ও তো দেবতা না। ওর সঙ্গে সারাদিন মেয়েটাকে কাটাতে দিয়ে কি ভুল করলাম? ও কি সত্যি কাজে চন্দননগর গেল? নাকি বীণাকে নিয়ে নিছক সারাদিন কাটাবার জন্য অন্য কোথাও গেল?
আবার মনে হয়, যদি দুজনে মিলে নিছক ঘুরে-ফিরে বেড়ায়, তাহলে কিছু বলার নেই। তাছাড়া যে ছেলেটা সব সময় সব রকম সাহায্য করে, তার অনুরোধ বা ইচ্ছাকে কী উড়িয়ে দেওয়া যায়?
অসম্ভব।
কিন্তু…
মালতী দেবী ভাবতে গিয়েও যেন থমকে দাঁড়ান।
রমেশের তো পয়সার অভাব নেই। তাই ও যদি চন্দননগর না গিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে কলকাতাতেই কোনো একটা হোটেলে বা অন্য কোথাও সারাদিন কাটায়?
ভাবতে গিয়েও শিউরে ওঠেন।
দুপুরে খেতে বসে রামপ্রসন্ন বলেন, আচ্ছা মালতী, তুমি কী ভাবছ বলো তো!
আমার ভাবনা-চিন্তার কি শেষ আছে?
তা হতে পারে কিন্তু অন্য দিন তো ঠিক এত চিন্তিত মনে হয় না।
আমার চিন্তা-ভাবনার কথা ছেড়ে দাও। তুমি খাও।
দুএক মিনিট পর রামপ্রসন্ন জিজ্ঞেস করেন, আজ মেজখুকি এত সেজে-গুঁজে কোথায় গেল?
পিকনিকে।
পিকনিকে?
হ্যাঁ।
ও আবার কাঁদের সঙ্গে পিকনিকে গেল?
তুমি কি ওর সব বন্ধুদের জানো?
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ও ওর স্কুলের পুরনো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে পিকনিকে গেছে।
কোথায় পিকনিক করতে গেছে?
বারাসতের ওদিকে কি একটা গ্রামে।
ও!
খেয়ে-দেয়ে ওঠার মুখে রামপ্রসন্ন একটু জিজ্ঞেস করেন, তোমার ছোটপুত্রকে তো সকাল থেকেই দেখলাম না।
তিনি দেশ উদ্ধারের কাজে বারুইপুর গিয়েছেন।
গুড।
.
হাসিতে খুশিতে ভরপুর হয়ে বীণা নটা বাজতে না বাজতেই ফিরে আসে।
ওকে দেখেই খুকু ছুটে আসে।
হারে ছোড়দি, কেমন পিকনিক হলো রে?
ওর কথা শুনে বীণা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারে না। একবার মুহূর্তের জন্যে মালতী দেবীর দিকে তাকিয়েই বলে, দারুণ হলো।
আমার পড়া হয়ে গেলে, সব গল্প বলবি। বুঝলি তো?
আচ্ছা, সে দেখা যাবে।
খুকু ভিতরের ঘরে চলে যেতেই বীণা মাকে দুহাত জড়িয়ে ধরে বলে, থ্যাঙ্ক ইউ!
ন্যাকামি করিস না।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বেশ চাপা গলায় জিজ্ঞেস করেন, চন্দননগর কেমন লাগল?
খুব ভাল।
খেলি কোথায়?
যে ভদ্রলোকের কাছে রমেশদা গিয়েছিল, তাঁর বাড়িতেই খেলাম।
বীণা একটু থেমে বলে, ওঁরা দারুণ খাইয়েছেন।
ওখানে কী কী দেখলি?
ফরাসিদের তৈরি সুন্দর সুন্দর ঘরবাড়ি-পার্ক আর গঙ্গার ধারের…
ও কথাটা শেষ করার আগেই মালতী দেবী জিজ্ঞেস করেন, রমেশ কোথায়?
দোকানে গেল।
আরো অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন মনে এলেও মালতী দেবী আর কোন কথা না বলে রান্নাঘরে চলে যান।
.
এর ঠিক মাসখানেক পরের কথা।
দশটা বাজতে না বাজতেই রামপ্রসন্ন বাড়ি ফিরে আসতেই মালতী দেবী একটু চাপা হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে?
রামপ্রসন্নও চাপা হাসি হেসে জবাব দিলেন, তোমাকে একটু কাছে পাবার জন্য মনটা ছটফট করছিল বলে…
ঢং দেখে মরে যাই।
মালতী দেবী একটু কৌতুক মেশানো হাসি হেসে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি গঙ্গায় দাঁড়িয়ে শালগ্রাম শিলা মাথায় করেও যদি বল, আমার জন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলে, তাও আমি বিশ্বাস করতে পারব না।
একটা সিঁড়ি টেনে নিয়ে রান্নাঘরের মধ্যেই স্ত্রীর সামনে বসেই রামপ্রসন্ন বলেন, আমাকে নিয়ে তোমার দুঃখের শেষ নেই, তা আমি জানি কিন্তু একটা কথা তোমাকে স্বীকার করতেই হবে।
কী স্বীকার করতে হবে?
আমি লেখাপড়া শিখিনি, একটা থার্ড ক্লাশ চাকরি করি, রেস খেলে টাকা ওড়াই কিন্তু আমি চরিত্রহীন না।
আমি কি তাই বলেছি?
তোমার জন্য কি এনেছি, দেখেছ?
কী এনেছ?
ডান দিকে তাকিয়ে দেখো।
মালতী দেবী ঘাড় ঘুরিয়ে ডান দিকে তাকিয়েই এক গাল হাসি হেসে বললেন, কী ব্যাপার? হঠাৎ দই নিয়ে এলে?
তুমি গাঙ্গুরামের দই ভালবাস না?
সে কথা তোমার মনে আছে?
মনে না থাকলে কি নিয়ে আসতাম?
হঠাৎ একটা খুশির ঝলকে মালতী দেবীর মন ভরে যায়।
দুএর মিনিট চুপ করে থাকার পর উনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি এখনই খাবে?
খুকুর খাওয়া হয়ে গেছে?
না; এখনও পড়ছে।
মেজখুকি কোথায়?
উপরে গেছে।
ও এলে সবাইকেই এক সঙ্গে খেতে দাও।
রামপ্রসন্ন রান্নাঘর থেকে বেরুতে না বেরুতেই খুকু রান্নাঘরে আসে।
মালতী দেবী জিজ্ঞেস করেন, পড়া হয়েছে?
হ্যাঁ।
তাহলে উপর থেকে ছোড়দিকে ডেকে আনতে।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, বলবি, বাবা এসে গেছে। আমরা সবাই এক সঙ্গে খেতে বসব।
বইপত্তর গুছিয়ে রেখে যাচ্ছি।
যাই হোক, খুকু উপরে উঠে দেখে, গুপ্তাজি আর সন্তোষের ঘরের দরজা বন্ধ। বারান্দাতে টিম টিম করে একটা আলো জ্বলছে। ডান দিকে ঘুরে দেখে, রমেশের ঘরের দরজায় মোটা পর্দা ঝুলছে। ও ঘরে টিউব ল্যাম্প জ্বলছে না। পর্দার তলা দিয়ে যেটুকু আলো আসছে, তা দেখে মনে হলো, শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। খুকুর মনে হয়, রমেশদা বোধ হয় কোনো লেখাপড়ার কাজ করছে কিন্তু পর্দা সরিয়েই ও চমক ওঠে। লজ্জায় তাড়াতাড়ি একটু পিছিয়ে আসে। একবার মনে হয়, ছুটে নিচে চলে যায়। মাকে বলে, শিগগির দেখবে এসো, রমেশদা আর ছোড়দি কী কাণ্ড করছে।
