অবশ্য না হবারও কোনো কারণ নেই। হাজার হোক রমেশ সুদর্শন সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান যুবক। দুহাতে টাকা রোজগার করে। তার চাইতেও বড় কথা, ছেলেটা যেমন মিশুকে, তেমনই প্রাণবন্ত। এদিকে বীণাকে দেখতে তো বেশ ভাল। তাছাড়া যৌবন!
আরো কারণ আছে।
রমেশ প্রায়ই কিছু না কিছু হাতে নিয়ে আসে।
এই বীণা, এই নাও।
প্যাকেটটা হাতে নিয়েই বীণা জিজ্ঞেস করে, প্যাকেটে কী আছে?
কেক। রমেশ একটু হেসে বলে, আমার এক বন্ধু একটা বড় কাগজের কোম্পানির এজেন্সি পেয়েছে বলে…
তা আমাকে দিচ্ছেন কেন? উপরে নিয়ে যান।
বাড়ির প্যাকেটা বাবার সঙ্গেই পাঠিয়ে দিয়েছি।
ও!
.
এইভাবেই চলতে চলতে হঠাৎ একদিন মালতী দেবী বীণাকে বললেন, একটা কাজ করতে পারবি?
কী কাজ? মালতী দেবী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস পেলে বলেন, হাতে কিছু নেই। গোটা পঞ্চাশেক টাকা না হলে তো এ কটা দিন কিছুতেই চালাতে পারব না।
বীণা সঙ্গে সঙ্গে বলে, রমেশদার কাছে চাইব?
খুব গোপনে চাইতে পারবি?
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ওর বাবা-মা যেন জানতে না পারেন।
বীণা একটু হেসে বলল, না না, কেউ জানবে না।
ও আধঘণ্টা পরে উপর থেকে ঘুরে এসে হাসতে হাসতে হাসতে মালতী দেবীর হাত একটা একশ টাকার নোট দিয়ে বলল, ওর কাছে খুচরো নেই বলেই এই একশ টাকার নোটটা দিল।
টাকাটা ভাঙিয়ে এখনই কি বাকি পঞ্চাশ টাকা ওকে দিয়ে আসবি?
না, না, এখন দিতে হবে না।
রাম মিত্তিরের সংসার চালাবার জন্য শুধু ঐ একবার না, প্রায় প্রত্যেক মাসেই দুএকবার রমেশের কাছে হাত পাততে হয়।
মালতী দেবী নিজেই ওকে টাকাটা ফেরত দিতে গেলে রমেশ হাসতে হাসতে বলে, কাকিমা, ব্যবসা করি চীনাবাজারে, এখানে না। না, না, এই সামান্য কয়েকটা টাকা আপনাকে ফেরত দিতে হবে না।
মালতী দেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ভগবান তোমার মঙ্গল করুন বাবা।
.
কথায় আছে–মানুষের কুটুম দিলে থুলে, গরুর কুটুম চাটলে চুটলে।
প্রত্যেক মাসেই যদি মেয়েকে পাঠিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে রমেশের কাছ থেকে টাকা আনতে হয় আর সে টাকা যদি কখনই ফেরত দিতে না হয়, তাহলে ছেলেটাকে কুটুমের মতো আপনজন না ভেবে কি পারা যায়?
অন্তত মালতী দেবী পারেন না।
রমেশ দোতলায় উঠতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে বলে, এই বীণা, চন্দননগর দেখেছিস?
বীণা একটু হেসে বলে, চন্দননগর তো দূরের কথা, আমি শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনও দেখিনি।
ও মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, আমার দৌড় দক্ষিণেশ্বর আর বেলুড় মঠ। আর কিছু দেখিনি।
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মালতী দেবী একটু ম্লান হেসে বলেন, ওদের বাবা কি কোনো জন্মে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথাও গেছে?
উনি একটু থেমে বলেন, আচ্ছা রমেশ, চন্দননগরের গঙ্গার ধার খুব সুন্দর, তাই না?
হ্যাঁ, কাকিমা, খুব সুন্দর।
রমেশ একটু হেসে বলে, হাজার হোক, ও শহরটা তো ফরাসিরা তৈরি করেছে। তাই অনেক কিছুই খুব সুন্দর।
বীণা রমেশের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কি চন্দননগর যাচ্ছো?
হ্যাঁ।
কবে?
কাল।
রমেশ প্রায় না থেমেই বলে, দুপুরে গিয়ে রাত্তিরেই ফিরব। তুই যাবি?
বীণা ওর কথায় জবাব না দিয়ে মালতী দেবীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, মা, যাব?
মালতী দেবীর রমেশকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ফিরতে কি বেশি রাত হবে?
না, না বেশি রাত হবে না; বড়জোর সাড়ে আটটানটা হবে।
তুমি নিশ্চয়ই কাজে যাচ্ছো?
হা, কাকিমা, কাজেই যাচ্ছি।
বীণার তোমার সঙ্গে গেলে তোমার কাজের ক্ষতি হবে না?
না, না।
রমেশ একটু থেমে বলে, ও গেলে বরং ট্রেনে গল্পগুজব করে সময়টা বেশ কেটে যাবে।
মালতী দেবী বলেন, তাহলে আর আপত্তির কী আছে?
রমেশ দোকান থেকে ফিরতে না ফিরতেই গুপ্তজিদের খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটে যায়। ছেলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুএকটা কথা বলেই ওরা স্বামী-স্ত্রী শুয়ে পড়েন। দশটা বাজতে না বাজতেই সন্তোষও শুয়ে পড়ে। হাজার হোক ওকে ভোরে উঠে ছটার সময় মাস্টারজির কাছে পড়তে যেতে হয়। তাই ও আর বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকে না।
রমেশ দোকান থেকে ফিরে বাবার সঙ্গে কিছু জরুরি কথাবার্তা বলেই স্নান করতে যায়। ইতিমধ্যে গুপ্তাজির স্ত্রী ওর খাবার-দাবার ওর ঘরের কোণের টেবিলে ঢেকে রেখে শুতে যান। রমেশ কোনোদিন বাথরুম থেকে বেরিয়েই খেতে বসে, কোনোদিন আবার পরে খায়।
তারপর পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই গল্পগুজব করার জন্য বীণা এসে হাজির হয়। বাবা ফিরে আসার আগেই চলে আসে। ততক্ষণে খুকুর মাঝরাত্তির। বীণা রোজই বাবা-মার সঙ্গে খেতে বসে।
সেদিন বীণা যেন একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এলো।
মা, রমেশদা তোমাকে একটা কথা বলতে বলল।
কী?
বলল, আমি যে ওর সঙ্গে চন্দননগর যাচ্ছি, তা যেন আর কেউ জানতে না জানে।
আমি আবার কাকে জানাতে যাচ্ছি?
বীণা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, বাবা বা খুকু কিছু জিজ্ঞেস করলে কী বলবে?
মালতী দেবী একটু বিরক্ত হয়েই বলেন, যা বলার তা বলব; তোকে ভাবতে হবে না।
মুখে যাই বলুন না কেন, উনি মনে মনে কত কী ভাবেন। না ভেবে পারেন না। হাজার হোক, বীণা আর কচি খুকি নেই; পুরো একুশ বছর বয়স হলো। তাছাড়া যা বাড়বাড়ন্ত শরীর! মাঝে মাঝে হঠাৎ ওর শরীরে দিকে তাকিয়ে মালতী দেবী চমকে ওঠেন। সারা শরীরে যেন যৌবনের ঢল নেমেছে। এর উপর যা কাপড়-চোপড় পরার ছিরি! উনি কতবার বলেছেন, হারে বাজারে কি এর চাইতে ভদ্র-সভ্য ব্লাউজ পাওয়া যায় না?
