মালতী দেবী ওকে কত বুঝিয়েছেন।
দ্যাখ মিনু, দুদিন পরই তোর বিয়ে হবে। তখন স্বামীর সঙ্গে যা খুশি আনন্দ করিস। কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু এখন তুই যেরকম বেপরোয়াভাবে ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করছিস, তার জন্য সারা পাড়ায় আমি মুখ দেখাতে পারি না।
তারপর উনি ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে কত আদর করে বলেছেন, বিশ্বাস কর মিনু, আমি দুএক বছরের মধ্যেই তোর বিয়ে দেব। এখন একটু ভালভাবে থাক। দেখবি, তুই খুব সুখী হবি।
. কিন্তু কে কার কথা শোনে?
কথায় আছে, কপাল যার নড়া দশা, কুবুদ্ধি হয় সর্বনাশা।
মিনুরও হলো তাই।
হতভাগী হাজারটা মিথ্যে কথা বলে মাকে কোনমতে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মালাদের সঙ্গে দিঘা যাচ্ছি বলে শেষ পর্যন্ত চক্ৰবেড়ের ঐ বাঁদর ছেলেটার সঙ্গে দার্জিলিং চলে গেল। তা সে শুভ সংবাদ আবার জানা গেল বিশ্বনিন্দুক বাঁড়ুজ্যেদের মেজবউয়ের কাছে।
কীরে মালতী, কেমন আছিস?
পান চিবুতে চিবুতে চাপা হাসি হেসে বাঁড়ুজ্যেদের মেজবউ বলে যায়, তুই যে আজকাল আমাদেরও ভুলে গেলি! কী ব্যাপার রে?
মালতী দেবী বলেন, কাউকেই আমি ভুলিনি। সংসারের কাজকম্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকি বলে কারোর কাছেই যেতে পারি না।
তোর কর্তার কী খবর?
কী আর খবর? যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন।
তুই নিশ্চয়ই হরদম সিনেমা দেখতে যাস?
মেজবউ মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, নিশ্চয়ই যাবি। তোর যখন টিকিট লাগে না তখন…
ওকে পুরো কথাটা বলতে না দিয়েই মালতী দেবী বলেন, সিনেমা দেখার শখও আমার নেই, সময়ও নেই।
আচ্ছা মালতী, মেয়ের বিয়ে দিলি অথচ একটা খবরও দিলি না?
কে বলল, মেয়ের বিয়ে দিয়েছি?
মেজবউ হঠাৎ একটু জোরে হেসে উঠেই বলে, তবে কি তোর মেয়ে বিয়ের আগেই চক্ৰবেড়ের ঐ চায়ের দোকানের ছেলেটার সঙ্গে হনিমুন করতে দার্জিলিং গেছে?
খবরটা শুনে চমকে উঠলেও মালতী দেবী কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, কে বলল আমার মেয়ে দার্জিলিং গিয়েছে? মিনু তো কাল আমার ছোট পিসির সঙ্গে কালনা গেল। ও দার্জিলিং যাবে কেমন করে?
তা তো জানি না বাপু। ঠাকুরপো আজ সকালে দার্জিলিং থেকে ফিরে এসে বলল, মিনু আর ঐ ছোঁড়াটা ক্যাভেন্টার্সের দোকানে বসে চা-টা খেতে খেতে খুব হাসাহাসি ঢলাঢলি করছিল।
মেজবউ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েই বলে, যাই মালতী। ঠাকুরপোকে গিয়ে বলি, আজই চোখের ডাক্তারের কাছে যাও।
রাগে দুঃখে, অপমানে মালতী দেবী সেদিন সারা রাত্তির শুধু আকাশ-পাতাল ভেবেছেন। এক মিনিটের জন্যও ঘুমুতে পারেননি। অস্বস্তিবোধ করেছেন দিনের পর দিন।
শুধু কি তাই?
মেয়ের এই কেলেঙ্কারি চাপা দেবার জন্য ওঁর মত মানুষকেও কতজনের কাছে মিথ্যে কথা বলতে হয়েছে, কিন্তু কী করবেন? না বলে তো কোনো উপায় ছিল না।
ওঁর পেটের ছেলে মেয়েরা যে কী করে এত অধঃপাতে গেল, তা নিয়েও মালতী দেবী কত কী ভাবেন!
মাঝে মাঝে মনে হয়, গ্রীষ্মের তাপ, শ্রাবণের ধারা আর মাঘের হিম না পেলে যেমন কোনো বীজ অঙ্কুরিত হয়ে সুন্দর পল্লবিত হয়ে উঠতে পারে না, সেইরকম প্রতি শিশুরও চাই স্নেহ-মমতা-ভালবাসা আর সর্বোপরি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ। আমাদের ছেলেমেয়েরা কি তা কোনোদিন পেয়েছে?
তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার আছে।
শৈশব-কৈশোর পার করে যৌবনের স্বপ্নরাজ্যে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ছেলেমেয়েরা কত নতুন স্বপ্ন দেখে! কত নতুন আশা-প্রত্যাশায় মন ভরে ওঠে। যদি সহজ স্বাভাবিকভাবে সেসব প্রশ্ন, আশা-প্রত্যাশা পূর্ণ না হয়, তাহলে ছেলেমেয়েরা আদর্শভ্রষ্ট পথভ্রষ্ট হতে বাধ্য। আমার ছেলেমেয়েরা তাই কি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না?
রাতের একেবারে শেষ প্রহরে মালতী দেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপনমনেই বলেন, শেষ পর্যন্ত যে মিনুকে একটা মোটামুটি ভাল ছেলের হাতে তুলে দিতে পেরেছি, সেই আমার পরম সৌভাগ্য।
.
গুপ্তাজিরা সবাই এই পরিবারের সবকিছু না জানলেও এই কমাসের মধ্যেই জেনে গেছে, এরা নিত্য অর্থাভাবে কষ্ট পায়। গুপ্তাজির স্ত্রী আর রমেশ খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছেন, সামান্য কিছু খাবার-দাবার বা উপহার পেলে বীণা আর খুকু বড় খুশি হয়।
গুপ্তাজি রোজ অন্ধকার থাকতেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে পাঁচটার মধ্যেই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়েন। তারপর ফিবে এসে স্নান আর পুজো করেই খেতে বসেন। ঠিক নটায় বেরিয়ে পড়েন চীনারাজারের দোকানে যাবার জন্য; ফিরে আসেন সাতটায়। নটা-সাড়ে নটার মধ্যেই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
রমেশ বেরোয় দেরি করে, ফেরেও দেরি করে। দোকানের সব ঝামেলা মিটিয়ে ওর ফিরতে ফিরতে সাড়ে আটটানটা হয়ে যায়। কোনো কোনদিন আরো দেরি হয়। তবে যখনই ফিরে আসুক, বেশ কিছুক্ষণ একতলায় আড্ডা না দিয়ে ও কখনই উপরে যায় না।
রমেশ যখন ফিরে আসে, তখন রাম মিত্তির থাকেন হল-এ আর মন্টু বাড়ি থাকে। খুকুও তখন লেখাপড়া করে। তাই রমেশ আড্ডা দেয় মালতী দেবী আর বীণার সঙ্গে।
তখন রান্নাবান্নার কাজ শেষ। হয় না বলে মালতী দেবী কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেই রান্নাঘরে চলে যান। চা খেতে খেতে রমেশ বীণার সঙ্গেই গল্পগুজব হাসি-ঠাট্টা করে। রান্নাঘরে বসেও মালতী দেবীর কানে ওদের হাসির আওয়াজ ভেসে আসে। উনি বেশ বুঝতে পারেন, এই সময় রমেশের সঙ্গে আড্ডা দেবার জন্য বীণা বেশ উদগ্রীব হয়ে থাকে।
