না না, তা হয় না।
গুপ্তাজি মুহূর্তের জন্য থেমে একটু চাপা হাসি বলেন, বি এ-এম এ পাশ করলে যদি ভাল করে ব্যবসা করা যেতো, তাহলে তো সব ব্যবসাই আপনাদের বাঙালিদের হাতে থাকতো আর আমরা না খেয়ে মরতাম।
রাম মিত্তির সঙ্গে সঙ্গে ওকে সমর্থন করে বলেন, খুব সত্যি কথা বলেছেন।
গুপ্তাজি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মিত্তিরবাবু, আপনি শুনলে অবাক হবেন, আমার বাবা ক্যানিং স্ট্রিটের বণিকবাবুদের দোকানে আঠারো বছর কুলিগিরি করার পর পাশের চীনাবাজারে মদন দার দোকানের দরজায় একটা শো-কেস ঝুলিয়ে কালি-কলম ছোট নোট বই বিক্রি করতে শুরু করেন।
সামনে চেয়ারে বসে রাম মিত্তির আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মালতী দেবী ওঁর কথা শোনেন।
ঐ শো-কেসএর সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি কাজ করতে শুরু কবলাম বারো তেরো বছর বয়সে।
আর আপনার বাবা?
বাবা চীনাবাজার ক্যানিং স্ট্রিট থেকে সস্তায় মাল কিনে এক একবার এক এক জায়গায় বিক্রি করতেন।
এই কলকাতায় মধ্যেই?
না, না।
গুপ্তাজি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, বাবা কোনোদিন যেতেন বারাসত-বসিরহাট, কোনোদিন কালনাকাটোয়া নবদ্বীপ অথবা যশোর-খুলনা।
স্বামী টুকটাক প্রশ্ন করলেও মালতী দেবী অবাক হয়ে ওঁর কথা শোনেন।
জানেন মিত্তিরবাবু, এইভাবে আঠারো বছর ব্যবসা করার পর আমরা এক লাখ বত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে মদনবাবুর দোকান কিনে নিই।
তখন আপনারা কোথায় থাকতেন?
আমি আর বাবা পুরো আঠারো বছর ঐ ক্যানিং স্ট্রিটে বণিকবাবুদের দোকানের সামনের বারান্দায় থেকেছি।
খাওয়া-দাওয়া?
সকালে দোকান খোলার আগেই ঐ বারান্দায় বসেই আমরা চাপাটি-সবজি বনিয়ে নিতাম। আর রাত্তিরে তো ক্যানিং স্ট্রিটের রাস্তার উপরই উনুন জ্বালিয়ে আমাদের মতো অনেকেই রান্না করতো।
উনি একটু থেমে বলেন, মদনবাবুর দোকান কেনার পর আমরা ঐ দোকানের মধ্যেই শুতাম।
গুপ্তাজি একটু হেসে বলেন, আপনারা শুনলে অবাক হবেন, আমি জীবনে কখনও বায়োস্কোপ-সিনেমা দেখিনি, বিড়ি-সিগারেট-মদ খাইনি।
রাম মিত্তির একটু হেসে জিজ্ঞেস করেন, বছরের পর বছর কোনোরকম আনন্দ না করে জীবন কাটাতে ভাল লাগে?
গুপ্তাজি হাসতে হাসতেই জবাব দেন, ভালভাবে ব্যবসা করে হাজার-হাজার লাখ লাখ টাকা লাভ করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা কি সিনেমা দেখে বা মদ খেয়ে জুয়া খেলে পাওয়া যায়?
উনি প্রায় না থেমেই বলেন, তবে মনে রাখবেন, বাবা ঐরকম কষ্ট করেছিলেন বলেই আমি অনেক ভাল আছি; আবার আমি আলতু-ফালতু খরচ না করে ব্যবসা করেছি বলেই আমার ছেলেরা অনেক ভাল আছে।
.
দিনে দিনে দুটি পরিবারের হৃদ্যতা বাড়ে। প্রতি মঙ্গলবার হনুমানজির পূজা করেই গুপ্তাজির স্ত্রী সিঁড়ি মাথায় দাঁড়িয়েই বলেন, এই বীণা! এই খুকু! প্রসাদ নিয়ে যাও।
বীণা ঘর থেকে বেরিয়েই লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায়। গুপ্তাজির স্ত্রী ওর হাতে প্লেটভর্তি মিষ্টি দিতেই ও অবাক হয়ে বলে, মাসিমা, এত মিষ্টি দিচ্ছেন কেন?
যা দিচ্ছি, নিয়ে যাও। তোমরা সবাই ভাগ করে খাবে।
শুধু কি মঙ্গলবারের হনুমানজির পুজো? উনি যে আরো কত পুজো-পার্বণ ব্রত করতেন, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। এইসব উপলক্ষে দোতলা থেকে একতলায় আসতে নানা রকমের ফল আর মিষ্টি। কখনও আবার শাড়ি আর কয়েকটা টাকা।
মালতী দেবী কিছু বললেই গুপ্তাজির স্ত্রী একটু হেসে বলতেন শ্বশুরবাড়ির নিয়ম মেনে চলব না?
কিন্তু প্রত্যেকবার আমাদের…
আরে ভাই, আমি যদি আপনাদের দিয়ে মনে শান্তি পাই, তাহলে আপনাদের আপত্তির কী আছে?
মালতী দেবী মুখে না বললেও বেশ বুঝতে পারেন, নিছক সাহায্য করার জন্যই উনি এইসব দেন।
এই সংসারটা যে কীভাবে চলে, তা মালতী দেবী ছাড়া আর কেউ জানেন না।
বিখ্যাত উকিল দেবীপ্রসন্ন মিত্তিরের একমাত্র পুত্রের স্ত্রী হয়ে আসার পর উনি কত স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু এখন এই সংসারই ওঁর দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। উকিল-ব্যারিস্টার হওয়া তো দুরের কথা, স্বামী রামপ্রসন্ন কর্পোরেশনের কেরানিও হতে পারলেন না। যে ছেলে বিশ-বাইশ বছর বয়স থেকেই রেস খেলে, সে সিনেমা হলের বুকিং ক্লার্ক ছাড়া। আর কী হবে? তাছাড়া ঐ চাকরি করে যা মাইনে পান, তার অর্ধেকও তো সংসার চালাবার জন্য মালতী দেবীর হাতে আসে না।
সংসারের শত কাজকর্মের ফাঁকে সামান্য অবসর পেলেই মালতী দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কত কী ভাবেন।
কত মেয়ের কপালে তো স্বামীর সুখ জোটে না কিন্তু তাদের অনেকেই তো ভাল ছেলেমেয়ের মা হয়ে সব দুঃখ ভুলতে পারেন কিন্তু আমার কপালে সে সুখও কেন জুটল না?
সত্যি চিন্তা করতে বসলে মাথা ঘুরে যায়।
আমার বড়ছেলে মিস্ত্রী? ছি! ছি! মা হয়ে আমারই ভাবতে ঘেন্না হয়। আমার ছোটছেলে লেখাপড়া না করে দিনরাত্তির পার্টির কাজ করে, ভাবতেও অবাক হয়ে যাই। ওরে বাপু মিছিল-মিটিং-বিক্ষোভ-বক্তৃতা দিয়ে সত্যি সত্যি দেশের কল্যাণ হতো, তাহলে এই কলকাতা শহরের সব রাস্তা সোনা দিয়ে তৈরি হয়ে যেতো। যারা যত বেশি কাজ করে, তারা তত বেশি উন্নতি করে–এই সামান্য কথাটাও কি তোরা জানিস না?
মালতী দেবী নিজের মনেই নিজেকে সান্ত্বনা দেন।
ছেলে দুটো অপাদার্থ হলেও চরিত্রহীন বদমায়েশ হয়নি কিন্তু দুটো মেয়ে অত খারাপ হলো কেন? মিনু তো চোদ্দ-পনের বছর বয়স থেকেই প্রেম করতে শুরু করল। তাছাড়া কি ভীষণ সিনেমা দেখার নেশা! বাপরে বাপ! যে ছেলে সিনেমা দেখাতে চেয়েছে, দেখিয়েছে, তার সঙ্গেই ও ভিড়ে গেছে। ওরে বাপু, তুই জানিস না, যার-তার সঙ্গে এভাবে মেলামেশা করলে কী বিপদ ঘটতে পারে? আশে-পাশে তোর বয়সী মেয়ের তো অভাব নেই কিন্তু তাদের মধ্যে কে তোর মতো আলতু-ফালতু ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করছে বলতে পারিস?
