দিদি, আপনার ঋণ আমি সারাজীবনেও শোধ করতে পারব না।
গুপ্তাজির স্ত্রী একটু স্নান হাসি হেসে বললেন, হাজার হোক আমিও তো মেয়েমানুষ। তাই তো আপনার মুখখানা দেখেই আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, আপনার মনে কত দুঃখ, কত চিন্তা জমে রয়েছে। এর পরেও কি আমি চুপ করে থাকতে পারি?
গুপ্তাজির স্ত্রী পরের দিন দুপুরেই মিত্তিরবাড়ি গিয়ে মিনার গলায় হার পরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, পছন্দ হয়েছে তো?
মিনা একগাল হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ, খুব পছন্দ হয়েছে।
বীণা চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলল, দিদি, তোকে যা সুন্দর দেখাচ্ছে না…
খুকি বলল, রিয়েলি দিদি, তোকে দারুণ দেখাচ্ছে।
গুপ্তাজির স্ত্রী একটু চাপা হাসি হেসে ওদের বললেন, বিয়ের সময় তোমাদেরও খুব সুন্দর দেখাবে।
ওদের সবার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করার পর গুপ্তাজির স্ত্রী একটু লুকিয়ে চুরিয়ে মালতী দেবীর হাতে পাঁচ হাজার টাকাও দিয়ে দেন।
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত মিনার বিয়ে মোটামুটি ভালভাবেই হয়ে গেল। বিয়ের পরদিন মেয়ে-জামাই চলে যাবার পর কান্নাকাটির পর্ব থামলে মালতী দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ভগবান যে এভাবে আমাকে বিপদমুক্ত করবেন, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।
এবার উনি রমেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার মেয়ের বিয়েতে আমার অন্য ছেলেমেয়েরা খাটবে, এ তো খুবই স্বাভাবিক কিন্তু তুমি যে অমানুষিক পরিশ্রম করেছ, তা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
রাম মিত্তির সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ঠিক বলেছ মালতী।
রমেশ চাপা সলজ্জের হাসি হেসে বলল, মন্টু আর ওর বন্ধুরাও তো দারুণ খেটেছে।
মন্টু হাসতে হাসতে বলে, কিন্তু ভাইয়া, তুমি আমাদের লিডার ছিলে বলেই আমরা কাজ করতে পেরেছি।
খোকা ছোটভাইকে সমর্থন করে বলে, ঠিক বলেছিস মন্টু, রমেশ না থাকলে মিনুর বিয়ে কখনই এত ভালভাবে হতো না।
এই বিয়ের দৌলতে একদিনের মধ্যেই রমেশ এই পরিবারের সবার কাছেই আপনজন, প্রিয়জন হয়ে উঠেছে। তাই তো ও হাসতে হাসতেই বলে, এই বীণা, এই শুকনো প্রশংসা আর ভাল লাগেছে না। চটপট চা খাওয়াও।
বীণা একগাল খুশির হাসি হেসেই উঠে যায়।
চা খেতে খেতেও গল্পগুজব হয়।
খোকা বলে, মিনুর শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে বেশ ভাল লাগল কিন্তু কয়েকজন বরযাত্রী এত বদ ছিল যে…
ওর কথার মাঝখানেই মন্টু বলে, রমেশ ভাইয়ার বদলে আমি হলে তো ওদের ঠেঙিয়ে দূর করে দিতাম।
রমেশ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়েই একটু হেসে বলে, দেখো মন্টু, সব বিয়েবাড়িতেই দেখবে, বরযাত্রীদের মধ্যে দু-পাঁচজন শুধু গণ্ডগোল করার জন্যই আসে কিন্তু তাই বলে কি মেয়ের বাড়ি লোকেদের মাথা গরম করলে চলে?
মালতী দেবী বললেন, ঠিক বলেছ রমেশ।
রমেশ বলে যায়, আমরা দোকানে বসেও দেখি, অধিকাংশ খদ্দের ভাল হলেও দুচারটে খদ্দের বড্ড ঝামেলা করে কিন্তু দোকানদার মাথা গরম করলে তো ভাল খদ্দেরাও চলে যাবে।
রাম মিত্তির এতক্ষণ পর মাথা দুলিয়ে একগাল হাসি হেসে বললেন, রমেশ, তুমি তো দারুণ দামী কথা বললে।
খোকা জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা রমেশ, তুমি ঐ বদমায়েশ বরযাত্রীগুলোকে ঠাণ্ডা করলে কী করে?
রমেশ হাসতে হাসতে বলে, বিশেষ কিছুই করতে হয়নি। বীণা আর ওর দুতিনজন বন্ধুকে লাগিয়ে দিলাম ওদের দেখাশুনা করতে; তাছাড়া কয়েকটা গোন্ড ফ্লেক সিগারেটের প্যাকেট ওদের পকেটে পুরে দিলাম।
মালতী দেবী বললেন, যাই হোক বাবা, তুমি খুব সামলে দিয়েছে; তা না হলে যে। কি কেলেঙ্কারি হতো, তা ভগবানই জানেন।
যাই হোক, মিনুর বিয়ের রাতে রমেশ কত খেটেছে, কত ঝামেলা সামলেছে, তা সবাই জানলেও কেউ জানতে পারলেন না এই এক রাত্তিরের মধ্যেই বীণার সঙ্গে ওর মেলামেশা বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে।
.
বিয়ে-বৌভাতের সব ঝামেলা মিটে যাবার কদিন পর গুপ্তাজিরা মিত্তিরবাড়িতে এসে গেলেন মেজ আর ছোটছেলেকে নিয়ে। বড়ছেলে সুরেশ আর তার স্ত্রী মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বাড়িতেই থাকল। গুপ্তাজির বড় দুই ছেলে দোকানে বেরুলেও ছোটছেলে তখন ক্লাশ নাইন-এ-পড়ে।
গুপ্তাজি মাঝে মাঝেই বলেন, জানেন মিত্তিরবাবু, তিনটে ছেলে তিনটে ব্যবসায় ঠিকমতো লেগে গেলেই আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে কাশী চলে যাব।
উনি একটু থেমে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সেই বারো-তেরো বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে দোকানে যাওয়া শুরু করে এখন যেন আর ভাল লাগে না।
রাম মিত্তির একটু হেসে বলেন, আইডিয়া তো ভালই কিন্তু আপনি না থাকলে কী ছেলেরা ঠিকমতো ব্যবসা চালাতে পারবে?
গুপ্তাজি একটু হেসে বলেন, মিত্তিরবাবু, আমাদের রক্তে ব্যবসা। বড় ছেলে তো বাগড়ি মার্কেটের দোকান ভালই চালাচ্ছে। আর চীনাবাজারের দোকানে আমি থাকলেও রমেশই সবকিছু সামলায়।
উনি একটু থেমে বলেন, তবে ছোট ছেলেটা ব্যবসা-বাণিজ্য তত পছন্দ করে না।
মালতী দেবী পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। উনি বললেন, সন্তোষের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, বি এ-এম এ পাস না করে ও কিছুই করতে চায় না।
গুপ্তজি হাসতে হাসতে বলেন, বহিনজি, ওসব পাশ করে কী লাভ বলুন? যখন ব্যবসাই করতে হবে, তখন শুধু শুধু হাজার হাজার টাকা আর চার-পাঁচ বছর সময় নষ্ট করে কী লাভ বলুন?
মালতী দেবী বলেন, লেখাপড়া শিখলে তো ব্যবসা বাণিজ্য আরো ভাল করে করতে পারবে।
