উনি সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে গিয়ে বড় মেয়েকে ডেকে আনেন।
মালতী দেবী বলেন, রমেশ, এই মিনুরই বিয়ে।
মিনা মুহূর্তের জন্য রমেশের দিকে তাকিয়েই দৃষ্টি গুটিয়ে নেয়।
রমেশ হাসতে হাসতে বলে, আরে দিদি, আমার কাছে লজ্জা করার কী আছে? এখন থেকে আমরা তো একই ফ্যামিলির লোক হয়ে গেলাম।
রাম মিত্তির বললেন, নিশ্চয়ই এক ফ্যামিলির লোক হয়ে গেলে।
রমেশ হাসতে হাসতেই বলে যায়, দিদি, জামাইবাবুকে আমাদের সঙ্গেই আড্ডা দিতে হবে, সিনেমায় যেতে হবে।
ওর কথা শুনে সবাই একটু হাসেন।
এবার রমেশ মালতী দেবীব দিকে তাকিয়ে বলে, কাকিমা, আপনার অন্য ছেলেমেয়েরা বাড়ি নেই?
আমার বড়ছেলে তো দুর্গাপুরে থাকে আর ছোট ছেলে এখন বাড়ি নেই।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, অন্য দুই মেয়ে অবশ্য বাড়িতেই আছে।
রমেশ কিছু বলার আগেই রাম মিত্তির স্ত্রীকে বললেন, ওদের ডাক দাও না।
হ্যাঁ, ডাকছি।
মালতী দেবী ভিতরে গিয়ে দুই মেয়েকে ডেকে এনে রমেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, এই হচ্ছে বীণা, আর এই হচ্ছে খুকু।
রমেশ ওদের দুজনকে একবার দেখে নিয়েই বলে, কাকিমা, বীণাকেও কি দিদি ডাকতে হবে?
না, না, ওকে আবার দিদি বলবে কেন? ও তো তোমার চাইতে অনেক ছোট।
রাম মিত্তির বললেন, ও তোমার চাইতে চার-পাঁচ বছরের ছোট তো হবেই। তুমি ওকে একশবার নাম ধরে ডাকবে।
রমেশ বলে, আমার বয়স ঠিক তেইশ বছর। বীণা নিশ্চয়ই আঠারো-উনিশের বেশি হবে না?
মালতী দেবী একটু হেসে বললেন, তার মানে তুমি ঠিক মিনুর বয়সী।
তাহলে তো ওকে দিদি বলে ডেকে ভুল করলাম।
বীণা একটু চাপা হাসি হেসে বলে, একবার যখন ওকে দিদি বলে ডেকেছে, তখন তো আর নাম ধরে ডাকতে পারবেন না।
রমেশ ওর চোখের উপর চোখ রেখে একটু হেসে বলে, ওকে দিদি বললেও তোমাকে মেজদি বলব না।
মালতী দেবী বললেন, বীণা তোমার চাইতে ঠিক তিন বছরের ছোট। ওকে নিশ্চয়ই তুমি নাম ধরে ডাকবে।
রাম মিত্তির রমেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, মিনুর বিয়ের দিন সকাল থেকেই তোমাদের থাকতে হবে।
কাকু, সেদিন তো দোকান বাজার খোলা থাকবে, তাই সবাই সকাল থেকে না থাকতে পারলেও আমি নিশ্চয়ই আসবো।
আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে রমেশ চলে যাবার পরই রাম মিত্তির স্ত্রীকে বললেন, ছেলেটা বেশ মিশুকে আছে, তাই না মালতী?
হ্যাঁ, তাই তো মনে হলো।
খুকু বলল, মা, রমেশদাকে দেখতেও বেশ সুন্দর, তাই না?
হ্যাঁ।
নেমন্তন্নর কার্ড ছাপিয়ে আসতেই রাম মিত্তির স্ত্রীকে বললেন, মালতী, কাল সকালেই তুমি আর আমি গুপ্তাজিদের নেমন্তন্ন করতে যাবো।
সকালে মানে?
সাতটার মধ্যেই বেরুতে হবে।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বললেন, বেশি দেরি করলে তো গুপ্তাজি দোকানে চলে যাবেন।
মালতী দেবী বললেন, হ্যাঁ, ঠিক আছে।
পরের দিন সকালে ওঁরা যেতেই গুপ্তাজি ও তার স্ত্রী বেশ আন্তরিকতা ও সমাদরের সঙ্গেই ওঁদের অভ্যর্থনা করলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন বড় ছেলে সুরেশ ও তার স্ত্রীর সঙ্গে।
রামবাবু জিজ্ঞেস করলেন, রমেশ নেই?
গুপ্তাজি বললেন, ও একটু জরুরি কাজে বর্ধমান গেছে।
. মালতী দেবী গুপ্তাজির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ছোটছেলেও কি বাড়ি নেই?
ও মাস্টারজির কাছে পড়তে গেছে।
রাম মিত্তির নেমন্তন্নর চিঠিটা গুপ্তাজির হাতে দিতেই উনি বললেন, আরে মিত্তিরবাবু, কার্ড দিয়ে কী হবে? আমরা ঠিকই যাবো।
মালতী দেবী বললেন, শুধু আপনারা দুজনে গেলে হবে না। সবাইকে নিয়ে যেতে হবে।
মিত্তিরবাবু, আমরা ব্যবসাদার লোক। ব্যবসা-বাণিজ্যের ঝামেলা সামলে সবাই মিলে কোনো বিয়েবাড়িতেই যেতে পারি না।
কিন্তু রমেশকে তো সকাল থেকেই থাকতে হবে।
হ্যাঁ, তা থাকতে পারে কিন্তু আমরা দুজনে সন্ধের পরই যাবো।
মালতী দেবী বললেন, অন্তত ছোটছেলে আর বড়ছেলের বউকে তো নিয়ে যাবেন।
গুপ্তাজির স্ত্রী বললেন, ছোটছেলেকে নিয়ে যেতে পারি কিন্তু আমাদের বউ সেদিন অন্য একটা বিয়েবাড়ি যাবে।
ওঁদের মধ্যে টুকটাক আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা হবার পরই গুপ্তজির স্ত্রী মালতী দেবীকে নিয়ে অন্য ঘরে গেলেন।
কোনো ভূমিকা না করেই গুপ্তাজির স্ত্রী ওঁকে জিজ্ঞেস করলেন, বিয়ের সব বন্দোবস্ত মানে টাকাকড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেছে?
মালতী দেবী সলজ্জ দৃষ্টিতে ওঁর দিকে একবার তাকিয়েই দৃষ্টি গুটিয়ে নিয়ে বলেন, না, দিদি, সব হয়নি; তবে চেষ্টা করছি।
শুনুন ভাই, মেয়ের বিয়ের কি ঝামেলা, তা আমি খুব ভাল করেই জানি।
উনি মালতী দেবীর একটা হাত ধরে হেসে বললেন, আপনার স্বামীর হাতে বেশি টাকা দিতে গুপ্তাজি চাননি। তাই উনি বলেছেন, আপনার স্বামীকে না জানিয়ে আপনার হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিতে।
মালতী দেবী বিস্ময়-মুগ্ধ, ওঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, দিদি, টাকাটা পেলে সত্যি খুব উপকার হবে।
গুপ্তাজির স্ত্রী বললেন, আর আমি আপনার মেয়ের গলার হার দেব কিন্তু তা যেন গুপ্তাজি বা আমার ছেলেরা না জানতে পারে।
মালতী দেবী দুহাতে দিয়ে ওঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, দিদি, আপনি যে কী উপকার করলেন, তা আমি বলে বোঝাতে পারব না।
গুপ্তাজির স্ত্রী একটু হেসে বললেন, আমার নিজের কোনো মেয়ে না থাকলেও আমরা পাঁচ বোন। আমি তো জানি, আমাদের বিয়ের সময় বাবাকে কত ঝামেলা আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে।
উনি একটু থেমে বলেন আপনাদের সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে আর আপনার মেয়ের বিয়েতে আমরা কিছুই করব না, তাই কি কখনও হতে পারে?
