ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই রাম মিত্তির গলা চড়িয়ে বলেন, ওরে বাপু, বেচতে যাবো কোন দুঃখ? কাল সকালে গুপ্তাজি এলে তাকেই জিজ্ঞেস করো।
হ্যাঁ, তাই করব।
তবে দোহাই তোমার! ভদ্রলোকের সঙ্গে একটু ভাল ব্যবহার করো।
কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা মনোরঞ্জন বোসের মেয়েকে অন্তত তোমায় শেখাতে হবে না।
পরের দিন সাত-সকালেই সস্ত্রীক গুপ্তাজি এসে হাজির। ভদ্রলোকের পরনে ফিনফিনে মিলের ধুতি, গায় সিল্কের পাঞ্জাবি; মুখে পান, কপালে চন্দন ফোঁটা। বেশ নাদুসনুদুস চেহারা। তুলনায় ওঁর স্ত্রী অনেক সাদাসিধে এবং বেশ দোহারা চেহারা। কপালে বিরাট সিঁদুরের টিপ। সব মিলিয়ে বেশ স্নিগ্ধ শান্ত সুন্দর চেহারা।
দোতলার ঘরদোর দেখেই গুপ্তাজি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক এই ধরনের বাড়িই আমি চাইছিলাম।
গুপ্তাজির স্ত্রী মালতী দেবীকে বললেন, ছেলেরা যখন ছোট ছিল, তখন মুক্তারামবাবুর স্ট্রিটের দেড়খানা ঘরেই বেশ চলে যেত কিন্তু এখন তো ছেলেরা বড় হয়েছে! তাই ওখানে আর কিছুতেই কুলোচ্ছে না।
মালতী দেবী এক গাল হেসে বললেন, আপনি তো ঠিক আমাদেরই মতো বাংলা বলতে পারেন।
গুপ্তাজির স্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, আমি তো এখানেই জন্মেছি, এখানেই বড় হয়েছি। বাংলা বলতে পারব না কেন?
এবার গুপ্তাজি একটু হেসে বলেন, আমার তিনটে ছেলেই তো একেবারি বাঙালি হয়ে গেছে। বড় ছেলে মাছ-মাংস না খেলেও অন্য দুটো তো আপনাদের মতো সবই খায়।
রাম মিত্তির ছত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলেন, কিষণাদের কাছে আপনার কথা শুনেই তো আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম।
গুপ্তাজি বললেন, দেখুন মিত্তিরবাবু, আমার বাড়ি চাই আর আপনার বাড়ি আছে কিন্তু মেয়ের বিয়ের টাকা নেই। তাই তো আমরা হাত মেলালে দুজনেরই উপকার হচ্ছে।
হ্যাঁ, সে তো একশবার সত্যি।
হাতের ঘড়ি দেখেই গুপ্তাজি বললেন, আমার স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে আমাকে দোকানে যেতে হবে; তাই আর দেরি করবো না। সন্ধের পর আমার বড় ছেলে বা মেজ ছেলে এসে আপনাকে পনের হাজার টাকা দিয়ে যাবে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক আছে।
ওরা বেরুবার জন্য পা বাড়াতেই পা বাড়াতেই মালতী দেবী গুপ্তাজির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, দিদি, আপনারা কি এক তারিখেই আসবেন?
আপনার মেয়ের বিয়ে তো তিন তারিখে, তাই না?
হ্যাঁ।
বিয়ের সময় তো আপনার ঘরদোর দরকার হবে।
হ্যাঁ, তা হবে ঠিকই। তবে আশেপাশের বাড়িতে বললে তারা অনেকেই বিয়ের দু এক দিনের জন্য দুএকটা ঘর ঠিকই ছেড়ে দেবেন।
না, না, আপনার মেয়ের বিয়ে হয়ে যাক। আমরা বরং কদিন পরই আসব।
রাম মিত্তির সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তাহলে তো ওখানে আবার এক মাসের ভাড়া দিতে হবে। আপনারা এক তারিখেই…
গুপ্তাজি হাসতে হাসতে বললেন, ও বাড়ি কি আমরা ছাড়ছি নাকি? আমরা আট দশ তারিখেই আসব।
মালতী দেবী বললেন, হ্যাঁ তাই আসবেন, কিন্তু আমার মেয়ের বিয়ের বিয়েতে আপনাদের আসতেই হবে।
গুপ্তাজি হাসতে হাসতে বললেন, মিত্তিরবাবু নেমন্তন্ন করলে নিশ্চয়ই আসব।
রাম মিত্তিরও হাসতে হাসতে জবাব দেন, আপনাদের নেমন্তন্ন করবো না, তাই কখনো হয়?
গুপ্তাজিরা চলে যেতেই রাম মিত্তির ওর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ওঁদের কেমন লাগল?
ভালই।
মালতী দেবী মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তবে ছেলেগুলো যদি বাপ-মায়ের মতো না হয়, তাহলেই…..
উনি কথাটা শেষ না করলেও ওর স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, গুপ্তাজিরা হাতে থাকলে ছেলেদের নিয়ে কোন চিন্তা নেই।
না থাকলেই ভাল।
উনি একটু থেমে বললেন, তোমার মেজমেয়েও তো কচি বাচ্চা নেই। তাই চিন্তা
রাম মিত্তির একটু হেসে বলেন, মিনুর মতো রানুকে নিয়ে তোমার ভুগতে হবে না। ও অতি হুঁশিয়ার মেয়ে।
ভগবান জানেন, আমার কপালে কী আছে।
যাই হোক সন্ধের পর পরই গুপ্তাজির মেজছেলে রমেশ এসে হাজিব।
ও দুহাত জোড় করে নমস্কার করে বাম মিত্তিরকে বলে, কাকু, আমি রমেশ গুপ্ত। বাবা আমাকে পাঠিয়েছেন।
এসো, এসো, ভিতরে এসো।
রাম মিত্তির মুখ ঘুবিয়ে একটু গলা চড়িয়েই বলেন, মালতী, মালতী, এদিকে এসো। গুপ্তাজির ছেলে এসেছে।
মালতী দেবী ঘরে ঢুকতেই রমেশ হাত জোড় করে নমস্কার করার পরই ব্রিফকেস খুলে নোট ভর্তি একটা মোটা খাম বাম মিত্তিবের হাতে দিয়ে বলে, কাকু, প্লিজ দেখে নিন।
কী আর দেখব? তোমার বাবা কি কম পাঠাবেন?
রমেশ একটু হেসে বলে, না, না, কাকু, প্লিজ দেখে নিন। আমাদেরও তো ভুল হতে পারে।
রাম মিত্তির একটু হেসে বলেন, কোনো ব্যবসাদারই টাকা কম দেয়ও না, নেয়ও না।
তা ঠিক; তবু দেখে নেওয়াই উচিত।
রাম মিত্তির শেষ পর্যন্ত টাকা গুনতে শুরু করতেই মালতী দেবী বললেন, রমেশ, বাবা তুমি চা খাও তো?
হ্যাঁ, কাকিমা, খুব চা খাই।
টাকা গোনা শেষ হতে না হতেই মালতী দেবী চা আর একটা প্লেটে দুটো সিঙাড়া, দুটো রসগোঙ্গা এনে রমেশের সামনে রেখে বলেন, নাও বাবা, খেয়ে নাও।
আবার সিঙাড়া-মিষ্টি দিলেন কেন?
সারাদিন কাজকর্ম করে এলে; শুধু চা খাবে কেন?
রমেশ সিঙ্গাড়া-মিষ্টির প্লেট হাতে তুলে নিয়েই বলে, কাকিমা, কাকু চা খাবেন না?
হা হা, ওঁর চা আনছি।
দুএক মিনিটের মধ্যেই মালতী দেবী স্বামীকে চা এনে দেন।
রমেশ জিজ্ঞেস করে, কাকিমা, কোন দিদির বিয়ে?
মালতী দেবী একটু হেসে বলেন, হ্যাঁ ওকে ডাকছি।
