তারপরই বুঝি বিষ কিনে মদের বোতলে মিশিয়ে দিলি?
হ্যাঁ, স্যার।
তুই আর জগত্তারিণী দুজনে মিলেই কি বিষ মিশিয়েছিলি?
হ্যাঁ স্যার।
তারপর লতা না সরস্বতীকে দিয়ে মেজবাবুকে ঐ মদ খাওয়াবার ব্যবস্থা করলি?
কোন বোতলের মদ কাকে খাওয়াতে হবে, তা জগত্তারিণী ওদের দুজনকেই ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছিল।
মেজবাবুর বউ সেদিন যাবেন, সে খবর পেলি কী করে?
কৃষ্ণবিনোদ হঠাৎ একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, স্যার, মা কালীর নামে দিব্যি করে বলছি, মেজবৌ যে ঠিক ঐদিনই ওখানে হাজির হবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।
সরস্বতী ঐ বোতলের মদ খেলে কেন?
তা বলতে পারবো না স্যার।
উনি একটু থেমে বলেন, বোধহয় নেশার ঘোরে ভুল করে খেয়েছিল।
নাকি লতা ইচ্ছে করেই…
না, স্যার, লতা তা করতে পারে না।
মেজবাবুর মদে বিষ মেশাবার পর আবার ওর পানে বিষ মিশিয়েছিলি কেন?
স্যার, সত্যি বলছি, পানে আমরা বিষ দিইনি।
তাহলে কে দিয়েছিল? ছোটকর্তা?
স্যার, ছোটকর্তার মদ-মেয়েছেলের রোগ থাকলেও এ ধরনের কাজ উনি কখনই করবেন না।
তবে কি লতা বা সরস্বতী?
স্যার, ওরা বেশ্যা হতে পারে কিন্তু খুনী না।
.
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, জানো ছোট মা, ষড়যন্ত্র করে মেজবাবুকে খুন করার জন্য কৃষ্ণবিনোদ আর জগত্তারিণী দুদনেরই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। অন্যান্য সবাইকে জজসাহেব ছেড়ে দিলেন।
কণিকা অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, তার মানে মেজবউ বিষ দিয়ে স্বামীকে মারে নি?
না।
উনি একটু থেমে বললেন, মামলায় প্রমাণ হয়েছিল, মেজবউও একই বিষে মারা যান।
মেজবউও কি ঐ বিষ-মোশানো মদ খেয়েছিলেন?
ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, নিশ্চয়ই ঐ মদ খেয়েছিলেন বা ওঁর স্বামী খাইয়েছিলেন।
ইস! কী ট্র্যাজেডি।
হ্যাঁ, ছোট মা, সত্যিই খুব দুঃখের ব্যাপার।
অঘোরনাথ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই সমস্ত ব্যাপারে বড়বাবু এত দুঃখ, এত আঘাত পেয়েছিলেন যে ওঁরা স্বামী-স্ত্রী তো ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়-সম্পত্তি ছেড়েছুড়ে কাশী চলে গেলেন।
মেজবাবুর মেয়ে রাধার কী হলো?
হ্যাঁ, রাধাকেও ওঁরা সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
৭-৮. রসগোল্লার হাঁড়ি
০৭.
এই খুকি, এটা ধর।
সন্তোষ রসগোল্লার হাঁড়িটা ওর হাতে দিতেই খুকি জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার সন্তোষদা?
সন্তোষ ওর কথার জবাব না দিয়েই জিজ্ঞেস করে, কাকিমা কোথায়?
খুকি জবাব দেবার আগেই মালতী দেবী রান্নাঘরের ভিতর থেকে দরজার সামনে এসে বলেন, এই তো আমি। কিছু বলবে?
সন্তোষ ওঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেই একটু হেসে বলে, কাকিমা, আমি পাশ করেছি।
মালতী দেবী ওর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেন, খুব ভাল খবর বাবা। আমি জানতাম, তুমি ঠিকই পাশ করবে।
জানেন কাকিমা, আমাদের ফ্যামিলিতে আমিই প্রথম গ্র্যাজুয়েট হলাম।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, কাকিমা।
সন্তোষ মুহূর্তের জন্য থেমে একটু হেসে বলে, আমার বড় চাচার ছেলে ক্লাশ নাইনে এ ওঠার পর স্কুল ছাড়তে চায়নি বলে তো তাকে মারতে মারতে বাড়ি থেকেই বের করে দেওয়া হয়।
খুকি অবাক হয়ে বলে, সত্যি বলছ সন্তোষদা?
মালতী দেবী ওকে একটু বকুনি দিয়ে বলেন, ও কি মিথ্যে বলছে?
সন্তোষ বলে, আমার বাবার একদম মত ছিল না আমি কলেজে ভর্তি হই।
আমি জানি।
মালতী দেবী একটু থেমে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ সোল আনা সামলেই যে তোমাকে পড়াশোনা করতে হয়েছে, তা আমি খুব ভালভাবেই জানি।
সন্তোষ একটু হেসে বলে, সত্যি কথা বলতে কি, আপনি ছাড়া কেউই আমাকে পড়াশোনার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়নি।
আমি তোমাকে কি আর উৎসাহ দিয়েছি।
উনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমি যদি সত্যি উৎসাহ দিতে পারতাম, তাহলে আমার ছেলেমেয়েরা কি এমন অপদার্থ হতো?
পরিস্থিতিটা একটু সামাল দেবার জন্যই সন্তোষ সঙ্গে সঙ্গে বলে, দুঃখ করছেন কেন কাকিমা? আমি কি আপনার ছেলে না?
মালতী দেবী ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেন, হ্যাঁ, বাবা, তুমি নিশ্চয়ই আমার ছেলে।
সত্যি বলছি কাকিমা, আপনি ছাড়া কেউ আমাকে পড়াশোনা করতে বলেনি।
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুকি এক গাল হেসে বলে, জানো সন্তোষদা, মার ধারণা তোমার মতো ছেলে নাকি লাখে একটা হয় না।
মালতী দেবী সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ঠিকই তো বলি।
সন্তোষ হাসতে হাসতে উপরে চলে যায়।
.
বছর পাঁচেক আগেকার কথা।
রাম মিত্তির সেদিন রাত্তিরে বাড়িতে পা দিতে না দিতেই বেশ উল্লসিত হয়ে স্ত্রীকে বললেন, বুঝলে মালতী, তোমার মেয়ের বিয়ের টাকার ব্যবস্থা করে এলাম।
ব্যবস্থা করে এলাম মানে?
মালতী দেবী অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন।
রাম মিত্তির তির্যক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, শেষ পর্যন্ত রেসের মাঠের এক বন্ধুই এই ব্যবস্থা করে দিল।
মালতী দেবী একটু বিরক্ত হয়েই বলেন, অত হেঁয়ালি না করে বলতে পারছে না। কী করে এলে?
দোতলাটা আমার এক বন্ধুর বন্ধুকে ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি।
মিনিট খানেক চুপ করে থাকার পর রাম মিত্তির সিগারেট ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, ঐ গুপ্তাজিই পনের হাজার অ্যাডভান্স দেবেন।
পনের হাজার?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কত টাকায় ভাড়া দিলে যে পনের হাজার অ্যাডভান্স দিচ্ছেন?
মালতী দেবী প্রায় না থেমেই বলেন, নাকি বাড়ির অর্ধেক অংশ বেচে দিতে..
