কৃষ্ণবিনোদ মুহূর্তের জন্য থামতেই গোয়েন্দা দপ্তরের দারোগাবাবু হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, থামছিস কেন হারামজাদা? চটপট বলে যা।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, স্যার, বলছি।
কৃষ্ণবিনোদ একবার নিঃশ্বাস নিয়েই আবার শুরু বরেন, স্যার, আমি জানতাম সোজাসুজি এ কাজ করা যাবে না। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা হিসেবে-নিকেশ করে ঠিক করলাম, সরকারবাড়ির ছোটকর্তাকে হাত করতে পারলেই বনবিহারী দত্তর মেজ ছেলেটাকে হাতের মুঠোর মধ্যে আনা যাবে।
সরকারবাড়ির ছোটকর্তাকে হাতে আনলি কী করে?
বলছি স্যার, সব বলছি।
কৃষ্ণবিনোদ প্রায় না থেমেই বলেন, স্যার, নরোত্তম মল্লিক আমার দূরসম্পর্কের বন্ধু।…
দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয়, দূরসম্পর্কের বন্ধু আবার হয় নাকি?
মানে স্যার, ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার বন্ধুত্ব হয়।
দারোগাবাবু অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, মাঝে মাঝে বন্ধুত্ব হয় মানে? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাচ্ছিস না?
না, স্যার, সত্যি মাঝে মাঝে বন্ধুত্ব হয়।
কৃষ্ণবিনোদ মুহূর্তের জন্য থেমেই বলেন, স্যার, আমরা দুজনেই মাঝে মাঝে হরিদাসীর ওখানে যাই। মানে স্যার, ওর দুই মেয়ের সঙ্গে আমাদের একটু ভাব আছে। কখনও কখনও আমরা দুজনেই একসঙ্গে একটু আনন্দ-ফুর্তিও করি।
থামছিস কেন? বলে যা, বলে যা।
স্যার, ঐ নরোত্তম মল্লিকের জন্যই সরকারবাড়ির ছোটকর্তার সঙ্গে আমার ভাব হয়।
উনি একটু মুখ তুলে দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে বলেন, স্যার, আমি কিছুদিন ওর সঙ্গে মেলামেশা করেই বুঝে গেলাম, মদ আর মেয়েছেলে সাপ্লাই করতে পারলে ওকে দিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নেওয়া যাবে। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান করে ফেললাম।
কী প্ল্যান ঠিক করলি?
স্যার, সরকারবাড়ির ছোটকর্তার পাল্লায় পড়েই বনবিহারীর মেজব্যাটাকে দিয়ে জগত্তারিণীর টাকায় বরানগরের বাগানবাড়ি কেনাবার ব্যবস্থা করলাম।
কেন?
স্যার, মেজবাবু যদি ভবানীপুরের বাড়িতেই থাকে, তাহলে ওকে হাত করব কী করে?
ওকে হাত করবার কী দরকার ছিল?
স্যার, সম্পত্তি ভাগাভাগি হবার সঙ্গে সঙ্গেই ওর হাতে হলাখ-সাড়ে ছলাখ টাকা এসে গেল। তাই ঠিক করলাম, ওকেও মদ-মেয়েছেলের নেশায় জমিয়ে দিতে পারলে অন্তত ওর অর্ধেক টাকা তো আমাদের হাতে আসবেই।
ঐ মাগী দুটোকে কে যোগাড় করেছিল? তুই?
স্যার, আমি আর জগত্তারিণী দুজনে মিলে।
কী করে যোগাড় করলি?
স্যার, যে ঘোষালমশাইয়ের বাগানবাড়িতে আমি আর জগত্তারিণী ফুর্তি করতে যেতাম, সেখানে সুধা বলে একটা মাগী ছিল।…
তুই কি সুধাকে নিয়েও ফুর্তি করতিস?
না, স্যার, সুধাকে নিয়েই ঘোষালমশাই বাগানবাড়িতে থাকতেন।
তাতে কী হলো?
স্যার, ঐ সুধাই ওদের দেশ থেকে দুটো ছুঁড়িকে এনে ঘোষালমশাইয়ের এক ছেলে আর এক জামাইয়ের সঙ্গে ভিড়িয়ে দেয়।
কৃষ্ণবিনোদ একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, তাই স্যার, জগত্তারিণীর সঙ্গেও ঐ ছুঁড়ি দুটোর বেশ ভাব ছিল। তবে মাঝখানে বহুদিন ওদের দেখাশুনা না হবার পর হঠাৎ বছর দুই আগে চড়কের মেলায় ওদের দেখা হয়।…
.
কী গো, তুমি জগত্তারিণী মাসি না?
ডাগর-ডোগর মেয়েটা পান-জর্দা চিবুতে চিবুতে মুখ টিপে হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে।
জগত্তারিণী অবাক হয়ে ওকে দেখে কিন্তু ঠিক চিনতে পারে না।
হা ভগবান! আমাকে ভুলে গেলে? আমি লতা গো লতা! সেই ঘোষালের বাগানবাড়িতে…
ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে জগত্তারিণীর সব কথা মনে পড়ে যায়। ও সঙ্গে সঙ্গে একগাল হাসি হেসে লতাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে, সব্বোনাশী, তুই কি সুন্দর হয়েছিস রে! ঘোষালমশাইয়ের জামাই তাহলে তোকে বেশ যতেই রেখেছে।
লতা একটু জোরে হেসে ওঠে। তারপর বলে, ও মিনসেকে কবে দূর করে দিয়েছি।
ও একটু থেমে বলে, দেখো মাসি, একবার যখন খাতায় নাম লিখিয়েছি, তখন একজনের দাসীবাদী হয়ে চিরকাল থাকবো কেন?
ঠিক বলেছিস।
এখন আমি দুচার মাস অন্তরই বাবু পাল্টাই।
এখন তোর বাবু কে?
এই তো কদিন আগে নগেন দা-কে ছাড়লাম।
লতা একটু মুখ টিপে হেসে বলে, দু-তিনটে রুই কাতলা পিছনে লেগেছে। দেখি, কে বেশি দেয়।
সরস্বতীর কী খবর?
ওর খবরও খুব ভাল।
ভাল মানে?
এক জমিদারের ম্যানেজারবাবু ওকে নিয়ে মধুপুর গিয়েছেন। সামনের বুধবারই ওর ফেরার কথা।
ওর সঙ্গে তোর দেখা হয়?
দেখা হবে না কেন? আমরা দুজনে মিলেই তো দর্জিপাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছি।
আরো টুকটাক কথাবার্তার পর জগত্তারিণী বলে, তোরা দুজনে একদিন আমার ওখানে আয়। খুব জরুরি কথা আছে।
ভাল মালদার পার্টি হাতে আছে নাকি?
তবে কি শুধু শুধু আসতে বলেছি?…
.
কৃষ্ণবিনোদ একটু চাপা হাসি হেসে দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যার, লতা আর সরস্বতীকে পেয়ে সরকারবাড়ির ছোটকর্তা আনন্দে প্রায় জগাই-মাধাই-এর মতো দুহাত তুলে নাচতে শুরু করলেন।
তারপর?
তারপর স্যার, ছোটকর্তার মাধ্যমেই মেজবাবুকে বরানগরের বাগানবাড়িতে নিয়ে ঐ দুই মাগীর খপ্পরে ফেলে দিলাম।
মেজবাবুকে খুন করার বুদ্ধিটা কি তোরই মাথায় আসে? নাকি জগত্তারিণীর?
স্যার, একদিন তার কাছে শুনলাম,মেজবাবুর ভবানীপুরের বাড়ির চাকর মহাদেব এসে এক বাক্সভর্তি টাকা দিয়ে গেছে।
কৃষ্ণবিনোদ একটু থেমে বলেন, এই খবরটা শুনেই মনে হলো, মেজবাবু ওর ভাগের সব টাকাই নিজের কাছে রেখেছেন। তাই স্যার, ঠিক করলাম, চটপট কিছু না করতে পারলে ঐ টাকাটা আর আমাদের ভাগ্যে জুটবে না।
