বড়দা, সম্পত্তি ভাগাভাগির পর আমার স্বামী নগদ ছয় লক্ষ টাকা পাওয়ায় আমি নিজেকে মহারানী ভাবিতে শুরু করিয়াছিলাম কিন্তু কয়েক দিন যাইতে না যাইতেই বুঝিতে পারিলাম, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জন্যই আমার স্বামী চরম ব্যভিচারী হইয়া উঠিতেছেন। কখনও কখনও ভাবিতাম, উহার মোহ শীঘ্রই কাটিয়া যাইবে এবং উনি আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করিবেন কিন্তু যত দিন গিয়াছে, উনি তত বেশি ব্যভিচারী হইয়া উঠিতেছেন। এইরূপ চরিত্রহীন, ব্যভিচারী, বিকৃত রুচিসম্পন্ন মানুষকে লইয়া আমি কখনই জীবন কাটাইতে পারিব না। তাই ঠিক করিয়াছি, আমি এই জগত হইতে বিদায় লইবো। তবে এই পৃথিবী হইতে চিরবিদায় লইবার পূর্বে আমার চরিত্রহীন স্বামীকেও অবশ্যই শেষ করিব।
আমার কন্যা রাধা রহিল কিন্তু উহার জন্য আমার বিন্দুমাত্র চিন্তা নাই। আমি উহাকে গর্ভে ধারণ করিলেও বড়দিই উহাকে মানুষ করিয়াছেন এবং রাধাও তাহার বড়মাকে সব চাইতে আপনার মনে করে। সুতরাং ও আপনাদের নিকট সর্বতোভাবে ভাল থাকিবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
আপনি ও বড়দি আমার সভক্তি প্ৰণাম গ্রহণ করিবেন এবং যদি কোনো অন্যায় করিয়া থাকি, তাহা হইলে দয়া করিয়া ক্ষমা করিবেন।
ইতি–আপনার মেহধন্যা মেজবৌমা
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, মজার কথা কি জানো ছোট মা, ঘটনাটা এখানেই শেষ হলো না। ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছিল।
কণিকা অবাক হয়ে বৃদ্ধ শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, মেজবাবু আর মেজবউ দুজনেই তো চলে গেলেন। এর পর আবার কী ঝমেলা বাধলো?
অঘোরনাথ এবার একটু জোরেই হেসে বলেন, ছোট মা, টাকাকড়ি আর সম্পত্তির লোভে মানুষ যে কত কী করতে পারে, তা তুমি-আমি ভাবতেও পারবো না।
উনি একটু থেমে বলেন, বরানগরের এক বাগানবাড়িতে তিন তিনটে মানুষের মারা যাবার খবর পেয়েই ইংরেজ এস পি একদল পুলিশ নিয়ে হাজির হয়ে সরকারবাড়ির ছোটকর্তা থেকে শুরু করে দারোয়ানকে পর্যন্ত লাঠিপেটা করতে করতে থানায় পাঠিয়ে দেবার পর খাবার-দাবার, মদের বোতল, মদের গেলাস থেকে শুরু করে সমস্ত বাক্স পেটরা পোঁটলা-পুটলি পর্যন্ত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করলেন।
কী কাণ্ড!
এখনই যদি অবাক হয়ে যাও, তাহলে সব কথা শুনলে তো তুমি মূৰ্ছা যাবে।
অঘোরনাথ একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলে যান, ওদিকে ময়না তদন্তের পর মেজভাই। আর মেজ বৌমার দেহ পেয়ে সকার পর্ব শেষ করে বাড়ি ফিরেই বড়বাবু মেজ বৌমার চিঠি পেয়ে অবাক।
সত্যি অবাক হবার মতো ব্যাপার।
যাই হোক, বাড়ির কাউকে ও চিঠির কথা না জানিয়েই উনি ছুটে চলে গেলেন হেমেন সেন-এর কাছে।
.
একবার না, দুবার চিঠিটা পড়ে হেমেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, দুর্গাপদ, এই চিঠি কি তোমাদের বাড়ির সবাই দেখেছে?
না, কাকাবাবু, এই চিঠি কাউকেই দেখাইনি।
বড়বাবু মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, মেজবৌমার চিঠিটা পেয়েই আমি আপনার কাছে এসেছি।
ভালই করেছ।
প্রবীণ উকিল হেমেনবাবু একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এই চিঠির কথা তুমি আর কাউকে বলো না। আগে দেখা যাক পুলিশ কী করে।
কাকাবাব, পুলিশের আর কী করার আছে?
উনি একটু থেমে বলেন, এটা যদি খুন-টুনের ব্যাপার হতো, তাহলে না হয়…।
ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই হেমেনবাবু একটু হেসে বলেন, দুর্গাপদ, পুলিশি তদন্তে কোথা থেকে কী বেরিয়ে পড়বে, তা কিচ্ছু বলা যায় না।
কিন্তু কাকাবাবু, মেজবৌমা তো নিজেই জানিয়েছে…
আবার ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই উকিলবাবু বলেন, মেজবৌমা তো স্বামীকে বিষ দিয়ে মারার পর তোমাকে চিঠি লেখেননি?
না, তা লেখেননি কিন্তু…।
মেজবৌমা তার সিদ্ধান্তের কথা তোমাকে জানিয়েছেন কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করার মাঝখানেও তো কিছু ঘটতে পারে?
হ্যাঁ, তা পারে কিন্তু…
হেমেন সেন একটু হেসে বলেন, তোমার এই কিন্তুর জবাব পুলিশি তদন্তে ঠিকই বেরিয়ে পড়বে।
উনি একটু থেমে বলেন, দেখো দুর্গাপদ, এ সংসারে টাকাকড়ি আর নারীঘটিত ব্যাপারে কোন মানুষ যে কী করবে, তা বলা যায় না। এমনও হতে পারে মেজবৌমা কিছু করার আগেই সরকারবাড়ির ছোটকর্তা বা ঐ দুটো মেয়েছেলের যে কোনো একজন হয়ত এই সর্বনাশ ঘটিয়েছে।
কী বলছেন কাকাবাবু?
প্রবীণ ও অভিজ্ঞ উকিল হেমেন সেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, দুর্গাপদ, বহুকাল ধরে ওকালতি করে এইটুকু জেনেছি, অনেক অভাবনীয় ঘটনা এ সংসারে ঘটে আর মানুষেই তা ঘটায়।
বড়বাবু সেদিনের মতো বিদায় নিলেও পরের দিন সকালেই আবার ছুটে যান হেমেন সেন-এর কাছে।
কী ব্যাপার দুর্গাপদ? আবার আজকে…
হেমেন সেন অবাক হয়ে প্রশ্ন করতে না করতেই বড়বাবু বেশ উত্তেজিত হয়ে বলেন, কাকাবাবু, কালরাত্তিরে পুলিশ জগত্তারিণী আর কেষ্টবিনোদবাবুকে ধরে নিয়ে গেছে।
প্রবীণ হেমেন সেন একটু হেসে বলেন, দুর্গাপদ, যা সন্দেহ করেছিলাম, বোধহয় তাই হয়েছে। দেখো, হয়তো শেষ পর্যন্ত কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে।
হ্যাঁ, সত্যি সাপ বেরিয়ে পড়ল।
ভয়-ভীতি, একটু-আধটু চড়-থাপ্পড়-লাঠিপেটা আর সর্বোপরি ঝানু গোয়েন্দাদের জেরার মুখে সব ফাঁস হয়ে গেল।…
.
সত্যি কথা বলছি স্যার, বনবিহারী দত্তর ছেলেদের সঙ্গে মামলায় শুধু জগত্তারিণী হেরে গেল না, আমিও হেরে গেলাম। তারপর থেকেই সুযোগ খুঁজছিলাম, ওদের জব্দ করার।
