.
কিন্তু মেজবাবুর কীর্তিকলাপের জন্য এই কাশী-বৃন্দাবনও সারদার কাছে নরক হয়ে উঠল।
এই মহাদেব, আমার একটা কথা রাখবি?
কী কথা, মাসি?
আগে বল, রাখবি কি না।
মহাদেব একটু হেসে বলে, তোমার কোন কথা শুনি না বলতে পারো?
আমাকে একটু মেজ মার কাছে নিয়ে যাবি? খুব জরুরি দরকার। মেজবাবু জানলে তো আমাকে খুন করে ফেলবে।
মহাদেব একটু থেমে বলে, মেজবাবুকে বলেছি, মেজ মার সঙ্গে দেখাশুনাই হয় না আর তোমাকে যদি সেখানে নিয়ে যাই, তাহলে…
ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সারদা বলে, মেজবাবু জানবে কী করে? তিনি কী আজকাল এখানে থাকেন?
কিন্তু যখন-তখন তো এসে হাজির হতে পারেন।
সারদা সঙ্গে সঙ্গে বলে, তুই আমাকে সন্ধের পর নিয়ে যাবি। তখন তো মেজবাবু কখনই ঐ দুটো রাক্ষসীকে ছেড়ে আসবে না।
মহাদেব একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তা তুমি ঠিকই বলেছ।
পরের দিন সন্ধের পর মহাদেব সারদাকে নিয়ে মেজবাবুর শ্বশুরবাড়ি হাজির হয়।
সারদাকে দেখে মেজবউ একটু হেসে জিজ্ঞেস করলেন কী গো মাসি, হঠাৎ তুমি এখানে এলে?
সারদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কী করব বল মেজ মা, না এসে পারলাম না।
ও একটু থেমে বলে, ভগবান তো নিজের সংসার করার সুযোগ দিলেন না বলে তোমাদের সংসারটাকেই চিরকাল নিজের সংসার ভেবে এসেছি।
মেজবউ চুপ করে ওর কথা শোনেন।
দেখো মেজ মা, আমি মুখে কিছু না বললেও সবই জানি, সবই বুঝি। কর্তাবাবুও শখ-আহ্লাদ যথেষ্ট করেছেন কিন্তু তাই বলে তিনি সংসার-ধর্ম নষ্ট করেননি বা ছেলেমেয়ে বউকে ভাসিয়ে দেননি।
সারদা একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, পুরুষমানুষ একটু এদিক-ওদিক গিয়ে শখ-আহ্লাদ করবে, তাতে আর বলার কী আছে কিন্তু মেজবাবু যা শুরু করেছেন, তা তো আর সহ্য হচ্ছে না।
মেজবাবু আবার নতুন কী করলেন?
পরশু দিন কী হয়েছে জানো?
কী হয়েছে?
হঠাৎ মাঝরাত্তিরে জুড়িগাড়ি এসে থামতেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় বেরুতেই দেখি, মহাদেব আর রাখাল লাফাতে লাফাতে নিচে নামছে।
সারদা দুহাত ঘুরিয়ে বলে, ব্যস! এরই মধ্যে মেজবাবু গাড়িতে বসে বসেই ওদের চোদ্দপুরুষ তুলে গালাগাল দিতে শুরু করেছেন।
মেজবউ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মেজবাবু নিশ্চয়ই খুব নেশা করে এসেছিলেন?
সারদা চোখ দুটো বড় বড় করে বলে, শুধু কি মেজবাবু? সঙ্গে একটা রাক্ষসীকেও এনেছিলেন।
তারপর?
মেজবাবু গাড়ির মধ্যেই প্রায় শুয়ে রইলেন আর ঐ হতচ্ছাড়ি মাগী তোমাদের ঘরে এসে মেজবাবুর আলমারি খুলে জামা-কাপড় ও আরো কত কী নিয়ে চলে গেল।
বলিস কী রে?
তবে আর বলছি কী মেজ মা! সাধে কি আর তোমার কাছে ছুটে এলাম?
সারদা মুখ বিকৃত করে বলে, ঐ মাগীর কাণ্ডকারখানা আর কথাবার্তা শুনে আমরা অবাক হয়ে গেছি। ঐ মাগী সেদিন আমাকে যা অপমান করেছে, তা তুমি ভাবতে পারবে না।
কেন? তুমি কী করেছিলে?
আলনা থেকে তোমার কয়েকটা ভাল ভাল শাড়ি নিচ্ছিল বলে আমি বলেছিলাম, ও গুলোয় হাত দিও না। ওসব মেজ মা’র।
আমার শাড়ি নিয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
সারদা মেজবউয়ের দুটো হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, জানো মেজ মা, আমি আপত্তি করেছিলাম বলে রাক্ষসী ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মেরে বলল, তোর চৌদ্দপুরুষের মেজমাকে বলিস, এ বাড়ির সবকিছু আমার।
কী বলছো মাসি?
মেজবউ প্রায় চিৎকার করেই বলেন।
কেউই বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলে না।
আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সারদা বলে, দেখো মেজ মা, আমি তোমাদের বাড়ির ঝি হলেও তো নবাবু-ছোটবাবুকে মানুষ করেছি। শুধু ওরা না, তোমরাও তো আমাকে মাসি বলেই ডাকো। তাই তো হতচ্ছাড়ির কথায় বড় খারাপ লেগেছে।
খারাপ লাগারই তো কথা।
যা হোক মেজ মা, তুমি একটা কিছু বিহিত করো। তা না হলে বোধহয় মেজবাবুকে। আর পাবে না।
মেজবউ উদাস দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মাসি, তোমার মেজবাবু যেখানে নেমেছে সেখান থেকে আর কোনদিন ফিরতে পারবে না। আর ফিরে এলেও তাকে নিয়ে ঘর করে কী শান্তি পাব?
উনি একটু থেমে বলেন, তবে মাসি, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, এর একটা বিহিত আমি করবই। এইরকম চরিত্রহীন বদমাইশ স্বামীকে নিয়ে ঘর করার মতো মেয়ে আমি না।
.
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপনমনেই একটু হেসে বললেন, ছোট মা, এই মেজবউ কী করে মেজবাবুকে জব্দ করেছিলেন তা শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।
কণিকা অপলক দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন।
নিজের মেয়েকে বড়বাবু বড়বউ-এর কাছে রেখে দেবার দুচারদিন পর মেজ বউ নিজেই একদিন একটু রাত্তিরে বরানগরের ঐ বাড়িতে হাজির হয়ে সবার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা তামাশা করতে করতে মেজবাবুর মদে বিষ মিশিয়ে দেন।…
বলেন কী?
কণিকা একটু জোরেই বলে ওঠেন।
অঘোরনাথ মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, ছোট মা, সত্যি উনি স্বামীর মদে বিষ মিশিয়ে ছিলেন।
তারপর?
যে দুটো খারাপ মেয়েকে নিয়ে মেজবাবু ফুর্তি করতেন, তাদের একজন আবার ঐ গেলাসের অনেকটা মদ খেয়েছিল…
ওরা দুজনেই মারা গেল?
হ্যাঁ, ওরা দুজনেই মারা যায়।
মেজবউ-এর কী হলো?
উনি নিজেও সেই রাত্রে মারা যান।
ইস! কী কেলেঙ্কারি!
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই ঘটনার ঠিক দুদিন পর বড়বাবুর কাছে মেজবউ-এর একটা চিঠি এসে হাজির।…
শ্রীচরণকমলেষু,
