হ্যাঁ, ওকে পাঠিয়ে দাও।
মহাদেব আসতেই মেজবাবু বললেন, ছোটকর্তাকে খবর দে, আমি এখনই ফিরে যাবো।
মহাদেব ওর হুকুম শুনেই সরকারবাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
আধঘণ্টার মধ্যেই দুই বন্ধু জুড়িগাড়ি চড়ে আবার বাগানবাড়ির দিকে রওনা হন।
.
এ সংসারের সব মানুষই ন্যায়-অন্যায় ভাল-মন্দ বিচার করতে পারে। চুরি করা অন্যায়, খুন করা জঘন্য অপরাধ, শুধু টাকা-পয়সার জোরে যৌনব্যভিচারে মত্ত থাকা আদৌ সম্মানীয় কাজ না–এইসব কথা গরিব বড়লোক শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই জানে।
তাই তো জুড়িগাড়ি চলে যেতে না যেতেই দত্তবাড়ির আদ্যিকালের ঝি সারদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ বিকৃতি করে আপনমনেই বলে, ছি! ছি! বাপের টাকা হাতে পেয়েছিস বলে কি দিনরাত্তির কুকুর-বেড়ালের মতো ফুত্তি করতে হয়!
মহাদেব পিছনে দাঁড়িয়ে বলে, মাসি, কুকুর-বেড়ালও হিসেব-নিকেশ করে ফুত্তি করে কিন্তু বাগানবাড়িতে যে বাঁদরামি আর অসভ্যতা হচ্ছে, তা তুমি ভাবতে পারবে না।
ও মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, বাগানবাড়ির বুড়ো দারোয়ান কী বলছিল জানো?
সারদা মুখে কিছু না বলে শুধু ওর দিকে তাকায়।
মহাদেব একটু চাপা হাসি হেসে বলে, বুড়ো বলছিল, ঐ চারটে ছুঁড়ি যত বেশি অসভ্যতা করে, তত বেশি বখশিস পায়।
বৃদ্ধা সারদা একবার বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, ওরে বাপু, বাপের পুকুর বলে কি তাতে ঝাঁপ দিয়ে মরবি।
ঠিক বলেছ মাসি।
সারদা একটু হেসে বলে, যে মরবে আপন দোষে, কী করবে তার নরহরি দাসে!
হাজার হোক বহুদিনের ঝি-চাকর। সারদা তো সেই আদ্যিকাল থেকে এই বাড়িতে কাজ করছে। ও এই বাড়িতে আসার পরের বছরই তো নবাবুর জন্ম হলো। আঁতুড় ঘর থেকে বেরিয়েই গিন্নিমা ছেলেকে ওর কোলে দিয়ে বলেছিলেন, নে সারদা, তোকে এই ছেলেটা দিলাম। এর সব দায়িত্ব তোর।
গিন্নিমা যে ছেলেটা ওর কোলে দিয়েছিলেন, তার কারণ ছিল।
মাত্র ষোল বছর বয়সে শাঁখা ভেঙে, সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলে সাদা থান পরেও সারদা শুধু ছোট্ট দুবছরের ছেলেটাকে নিয়েই কোনোমতে দিন কাটাচ্ছিল, কিন্তু পোড়া কপালে ঐ সুখটুকুও সইলো না। ছেলেটাকে হারাবার পর সারদা প্রায় পাগল হয়ে গেল।
গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মোক্ষদা দিদির মেয়ে সারদার এই দুঃখের কাহিনী শুনেই গিন্নিমা ওকে নিয়ে কলকাতা চলে এলেন।
তার ঠিক তিন মাস পরেই শিবপদর জন্ম।
বাড়ির সবাই ওকে সারদা বলে ডাকলেও শিবপদ আর গুরুপদ ওকে মাসি বলেই ডাকে।
সেজন্য সারদার গর্বের শেষ নেই।
বাড়ির অন্য ঝি-চাকররা কোনো কারণে ওকে আলতু-ফালতু কিছু বললেই ও গর্জে ওঠে–দ্যাখ, তোরা মুখ সামলে কথা বলবি। আমি তোদের মতো মাইনে করা ঝি চাকর না। আমি নবাবু-ছোটবাবুর মাসি, সে কথা ভুলে যাস না।
দূরসম্পর্কের ভাইপো ছেলেমেয়েদের বিয়ে-থা উপলক্ষে পিসিকে নিতে এলেই সারদা বলতে, ইচ্ছে তো করে নাতি-নাতনীর বিয়েতে যাই, একটু আনন্দ করি কিন্তু এই পঞ্চু পাণ্ডবের সংসার ফেলে কী করে যাই বল।
মাখন বলে, পিসি, এ বাড়িতে অনেক কাজের লোক। তুমি দু-চারদিনের জন্য গেলে ওঁরা ঠিকই সামলে নিতে পারবেন।
সারদা আত্মপ্রসাদের একটু চাপা হাসি হেসে বলে, ওরে, তুই ঠিক বুঝবি না, আমি না থাকলে বড়মা আর নবাবু-ছোটবাবুর কী অবস্থা হয়।
একটু থেমে ও বলে, বিয়ে-থা মিটে যাক। তারপর একবার ফুরসত হলেই দুএকদিনের জন্য ঘুরে আসব।
আসল কথা হচ্ছে, সারদা এই সংসারটাকেই নিজের সংসার ভাবে, এই সংসারের মানুষ-জনই ওর আপনজন, প্রিয়জন।
তার কারণও আছে।
নিঃসঙ্গ নিঃসম্বল অবস্থায় মাত্র যোল-সতের বছর বয়সে যে সংসারে এসে চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর কাটিয়ে দিল, সেই সংসার ছেড়ে সারদা স্বর্গে যাবার কথাও ভাবতে পারে না।
শুধু এই সংসার কেন, এই বাড়িটা ছেড়ে যাবার কথাও ও ভাবতে পারে না।
বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা।
সেবার পাঁচ ভাই মিলে ঠিক করলেন, প্রত্যেকবারের মতো পুজোর সময় মধুপুর না গিয়ে পুরী যাওয়া হবে।
মধুপুর-গিরিডির বাড়িতে কয়েকজন কাজের লোক আছে বলে ভবানীপুরের বাড়ি থেকে দুতিনজন ঝি-চাকর নিয়ে গেলেই আর কোনো অসুবিধে হয় না কিন্তু পুরীতে। নিজেদের বাড়ি নেই বলে বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হবে। তাই ঠিক হলো, স্ট্রান্ড রোডের গুদামের দুজন দারোয়ানকে ভবনীপুরের বাড়িতে রেখে সব কাজের লোকজনদেরও পুরী নিয়ে যাওয়া হবে।
সারদার একদম ইচ্ছে ছিল না কিন্তু শেষ পর্যন্ত না গিয়ে পারেনি। কিন্তু হা ভগবান! দুচারদিন পরই সারদা হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বড়গিন্নিকে বলল, বড়মা, এখানে। আমার কিছুতেই ঘুম আসে না। ঘুমুতে ভীষণ ভয় হয়। সত্যি বলছি বড়মা, আমি সারা রাত জেগে থাকি। তুমি বড়বাবুকে বলে আমাকে ভবানীপুর পাঠিয়ে দাও। এখানে থাকলে আমি ঠিক পাগল হয়ে যাব।
বড়গিন্নী বললেন, আমরা সবাই এখানে থাকব আর তুই একলা একলা ভবানীপুরের বাড়িতে থাকবি, তাই কখনো হয়?
তাতে কী হয়েছে?
অত বড় বাড়িতে তোর একলা একলা থাকতে ভয় করবে না?
ওখানে ভয় করবে কেন? ওটা তো আমাদেরই বাড়ি।
এই তো বিষয়-সম্পত্তি ভাগাভাগির সময়ও সারদা বড়গিন্নিকে বলেছিল, বডমা, তুমি আমাকে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে বলল না।
ও একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, আমার কাছে এই বাড়িই কাশী-বিন্দাবন। আমি এই বাড়িতেই মরতে চাই।
