না, না, তুমি ওর এইসব ন্যাকামি একদম সহ্য করবে না।
সহ্য করবো না বললেই তো হলো না।
মেজবউ একটু থেমে বলেন, আমি পেটে ধরলেও বড়দিই তো ওর সবকিছু করেছেন। পাশে বড়মাকে পাচ্ছে না বলে মেয়েটা রাত্তিরে ঘুমুতে পর্যন্ত পারছে না। বিষয়-সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে বলেই তো মেয়েটা বড়মাকে শত্রুর ভাবতে পারে না।
শত্তুর না ভাবলেও মেয়েটাকে তো ওদের কাছে ফেলে রাখতে পারি না।
তুমি না পারলেও আমি পারি।
মেজবউ, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এত কাণ্ডের পর মেয়েকে ওদের কাছে। রাখবো?
উনি একটু থেমে বলেন, অসম্ভব। তা কখনই হতে পারে না।
কেন অসম্ভব?
মেয়েকে ওদের কাছে রাখলে আমার সম্মান থাকবে?
দুএক মিনিট পর মেজবাবু বললেন, যদি ইচ্ছা করো, তাহলে রাধাকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য আমার নতুন বাগানবাড়িতে গিয়ে থাকতে পারো।
আমি কি তোমার বাঈজী যে বাগানবাড়িতে গিয়ে থাকব? মেজবউ আর একমুহূর্ত দেরি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। একটু পরেই বুড়ি সারদা মেজবাবুকে বলে, মেজমা বললেন, এখন তো মেয়ের ইস্কুল বন্ধ, তাই উনি আজ বিকেলে বাপের বাড়ি যাবেন। আপনি কি পৌঁছে দিতে পারবেন?
মেজবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, বিকেলে আমার জরুরি কাজ আছে। তুমি আর মহাদেব মেজমাকে পৌঁছে দিও।
যে আজ্ঞে।
বুড়ি সারদা দুহাত জোড় করে ওঁকে নমস্কার করে চলে যায়।
.
সব শোনার পর সরকারবাড়ির ছোট ছোটকর্তা মুচকি হেসে বললেন, কালী, তুই সত্যি ভাগ্যবান।
ভাগ্যবান বলছিস কেন?
শালা বউগুলোর জন্যই তো আমরা প্রাণ খুলে কাজকর্মও করতে পারি না, আনন্দও করতে পারি না।
দুমাস ধরে টাকাগুলো নিয়ে বসে আছি কিন্তু এখনও পর্যন্ত কিছুই তো শুরু করতে পারলাম না।
ছোটকর্তা গম্ভীর হয়ে বলেন, দ্যাখ কালী, ভাল করে ভেবেচিন্তেই আমরা ব্যবসায় নামব। হঠাৎ দুম দাম করে কিছু করলে গণেশ ওল্টাতে বাধ্য।
তা ঠিক।
তাই বলছি, চল, আমরা বরানগরের বাগানবাড়িতে চলে যাই।…
ওখানে গিয়ে কী করব?
ওখানে গিয়ে আমরা দুএক হপ্তা আলাপ-আলোচনা করে একটা প্ল্যান ঠিক করব।
ওখানে তো এক বুড়ো দারোয়ান ছাড়া কোনো ঝি-চাকর নেই। আমাদের দেখাশুনো…
ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ছোটকর্তা একটু হেসে বলেন, বন্ধুবর, সেসব দায়িত্ব আমার উপরই ছেড়ে দাও। আমাকে শুধু দুটো দিন সময় দাও।
দুদিনের মধ্যেই সব লোকজনের ব্যবস্থা করতে পারবি?
আলবাত পারব।
ছোটকর্তা মুহূর্তের জন্য থেমে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, পরশু দিন সন্ধেবেলায় তুই আমার সঙ্গে বাগানবাড়ি যাবি! দুরাত্তির থাকার পর যদি তোর মনে হয়, তেমন সেবা-যত্ন হচ্ছে না, তাহলে চলে আসিস।
ঠিক তো?
ওরে শালা, আমার নাম জয়নারায়ণ সরকার। আমি শুধু জয় করবার জন্যই জন্মেছি। আমি যা চাই, তাই পাই।
উনি একটু থেমে বলেন, তোকে একটু সেবা-যত্ন করার ব্যবস্থা করতে যদি না পারি, তাহলে এতকাল করলাম কী?
.
দুদিন পর বাগানবাড়িতে পা দিয়েই মেজবাবু সত্যি অবাক হয়ে গেলেন। দূর থেকে গাড়ি দেখেই নতুন উর্দি-পরা দারোয়ান গেট খুলে দেয়। তারপর গেট দিয়ে গাড়ি থামতেই দুটি দাসী ছুটে এসে ওঁদের দুজনের হাত ধরে নামিয়ে সামনের ড্রইংরুম আর নাচঘর পার করে ভেতরের ড্রংরুমে নিয়ে গিয়ে দুটো সোফায় বসিয়ে দেয়। দুজনের পা থেকে নিউকাট পাম্পশু খুলে দিয়ে জরি-দেওয়া দুটো চটি পরিয়ে দিতে না দিতেই অন্য দুটি দাসী এসে দুগেলাস চন্দনের শরবত দুজনের হাতে তুলে দেয়।
তারপর?
গঙ্গার পাড়ে সন্ধের অন্ধকার নেমে আসতে না আসতেই এই দাসীরাই ওদের মুখে তুলে দেয় হুইস্কির গেলাস। এক গেলাস শেষ হতে না হতেই আবার গেলাস ভরে দেয়। মাঝ-মধ্যে দুএকটা কাজু আর আখরোটের টুকরোও দাসীদের অনুরোধে ওদের খেতে
তিন-চার গেলাস পেটে যাবার পর ছোটকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, হারে কালী, কোনো অসুবিধে হচ্ছে নাকি?
কী যে বলিস শালা! মাইরি বলছি, দারুণ ভাল লাগছে।
রাত একটু গম্ভীর হতেই মেজবাবু এক দাসীর গলা জড়িয়ে গালচের উপর শুয়ে পড়েন।
এখনই শুচ্ছেন কেন? নুচি-মাংস রাবড়ি না খেয়ে শুতে পারবেন না।
শালা নুচি-মাংসের নিকুচি করেছে।
ছোটকর্তা ইশারা করতেই দুটি দাসী ওকে ধরাধরি করে শোবার ঘরে নিয়ে যায়।
পরের দিন অনেক বেলায় চোখ খুলতেই মেজবাবু দেখলেন, শুধু উনি না, দুটি দাসীও ওরই পাশে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে আছে।
সন্ধেবেলার আসর জমে ওঠার পর ছোটকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে কালী, এই ছুঁড়িরা ঠিকমতো সেবা-যত্ন করছে তো?
মাইরি বলছি, জয়নারায়ণ, আমি এই দুটো মাগীকে ছেড়ে কিছুতেই ভবানীপুর ফিরে যাব না।
ওরে শালা, শরীর আর মন চাঙ্গা করে নিয়েই তো আমাদের ব্যবসা শুরু করতে হবে।
সেসব পরে ভেবে দেখব। তবে যাই করি না কেন, আমি এই গঙ্গাতীর ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।
.
যাব না, যাব না করেও মেজবাবু একদিন ভবানীপুর ফিরে আসেন। এ-ঘর ও-ঘর উপর-নিচ ঘুরেও মেজবউ আর মেয়েকে না দেখে চিৎকার করে ওঠেন, সারদা।
বুড়ি সারদা দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির হয়।
মেজবউ কোথায়?
তা তো জানি না।
বাপের বাড়ি থেকে এখনও ফেরেননি?
হ্যাঁ, ফিরেছিলেন কিন্তু দুচার দিন পরই আবার চলে গেলেন।
ও!
মেজবাবু দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর বললেন, মহাদেব কোথায়?
নিচে আছে। পাঠিয়ে দেব?
