যাই মানে, শিবরাত্তির, অম্বুবাচী বা নববর্ষ-বিজয়ার সময় গিয়ে ফলমূল-মিষ্টি দিয়ে একটা প্রণাম করে আসি।
ভালই করো। ও বুড়ি সত্যি খুব ভাল মানুষ।
হ্যাঁ, কথাবার্তা শুনে তাই মনে হয়।
কণিকা একটু থেমে বলেন, উনি আমাকে খুবই স্নেহ করেন।
অঘোরনাথ একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, এই বুড়ি যেমন ভাল মানুষ, ওর স্বামী ছিল ঠিক ততটাই বদমাইশ। অমন চরিত্রহীন লোক বোধহয় ভূ-ভারতে জন্মায়নি।
উনি একটু থেমে বলেন, আর এই মহাপুরুষটির প্রাণের বন্ধু ছিলেন দত্তবাড়ির মেজবাবু।
হ্যাঁ, ঐ বুড়ির কাছেই শুনেছি, দত্তবাড়ির মেজবাবু ওঁর স্বামীর বন্ধু ছিলেন।
ওদের দুজনের কতা ভাবতে গেলেই রাগে, দুঃখে, ঘেন্নায় মাথা ঘুরে যায়।
.
দত্ত পরিবারের পরম সুহূদ ও পরম নির্ভরযোগ্য উকিল হেমেনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি, আমাকে এই কাজ করতে হবে। তবে সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলবো, মামলা-মোকদ্দমা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি হবার আগেই যে তোমরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছ, ঠিকই করেছ।
অন্য কেউ কিছু বলার আগেই মেজবাবু বললেন, কাকা, আমি কোনো ব্যবসা চাই না। আমি শুধু ভবানীপুরের বাড়ি আর নগদ টাকা চাই।
হেমেনবাবু বললেন, কালীপদর এই প্রস্তাবে কারুর কোনো আপত্তি আছে?
একে একে চার ভাই বললেন, না কোনো আপত্তি নেই।
আর কারুর কিছু বিশেষ দাবি আছে?
ছোটবাবু বললেন, কাকা, আমাকে আলাদা করে কিছু দেবেন না। আমি তো বড় দাদা বড় বৌদির সঙ্গেই থাকবো।
ওর কথা শুনেই বড়বাবু বললেন, না, না কাকা, বিষয়-সম্পত্তি যাকে যা দেবার, তা আপনি ঠিক করে দিন। তারপর যার যেখানে খুশি, সেখানে থাকুক।
হেমেনবাবু বললেন, দুর্গাপদ, তুমি ঠিকই বলেছ।
উনি একটু থেমে বললেন, বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারটা এখনই পাকাঁপাকিভাবে ঠিক হয়ে যাক।
যাই হোক, সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির কাগজপত্র আর হিসেব-নিকেশ ও তৎকালীন বাজার-দর বিচার-বিবেচনা করে হেমেনবাবু একমাস পর পাঁচ ভাইকে ভাগাভাগি করে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে চাও?
উনি একটু থেমে বলেন, তোমাদের কারুর কোনো আপত্তি থাকলে আমি আবার সবকিছু ভেবে দেখব।
না, কেউই কোনো আপত্তি করলেন না। সবাই ওঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।
এই ভাগবাটোয়ারায় মেজবাবু ভবানীপুরের বাড়ি ছাড়াও নগদ সাড়ে ছলাখ টাকা পেলেন। তবে হাতে পেলেন ছলাখ। সরকারবাড়ির ছোট কর্তার পরামর্শে জগত্তারিণীর টাকা থেকে যে পঞ্চাশ হাজার দিয়ে বরানগরে গঙ্গার ধারে এক পাটকলের সাহেবের বাগানবাড়ি কিনেছিলেন, তা ওঁকে দিতে হয় বলেই হাতে পেলেন ছলাখ।
মেজবাবু মহাখুশি। এতদিনের সংসারটা ভেঙে যাচ্ছে বলে মেজগিন্নি আগে দুঃখ করলেও শেষ পর্যন্ত ভবানীপুরের এই বিশাল বাড়ি আর নগদ ছলাখ টাকা স্বামীর হাতে আসায় খুসি না হয়ে পারলেন না। ওঁরা দুজনেই কত কি স্বপ্ন দেখেন!
বুঝলে মেজবউ, ঠিক করেছি, সবার আগে মেয়ের বিয়ের জন্য পুরো এক লাখ আলাদা করে রেখে দেব।
হ্যাঁ, তা তো রাখতেই হবে।
মেজগিন্নি একটু থেমে বলেন, রাধার বিয়ের সময় তো বড়বাবু বা বড়গিন্নি নিশ্চয়ই কিছু করবেন না; আর আমরাও কখনই ওঁদের কাছে হাত পাতবো না।
সে তো একশবার।
মেজবাবু একটু থেমে একগাল হাসি হেসে বলেন, আমি আর সরকারবাড়ির ছোটকর্তা এমন ব্যবসা করবো যে সবাই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
মেজগিন্নি একটু হেসে বলেন, ও বাড়ির ছোটর্কতা তো আমোদ-আহ্লাদ করেই দিন কাটান। ওর দ্বারা কি ব্যবসা হবে?
ওরে বাপু, আমি তো আছি।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, ও আমার ছোটবেলার বন্ধু। ওকে দিয়ে কী করে কাজ করিয়ে নিতে হয়, তা কি আমি জানি না?
সবই ঠিক কিন্তু তুমিও তো এতকাল বড়বাবুর কথায় উঠেছ-বসেছ। নিজের বুদ্ধিতে তো কিছু করোনি।
স্ত্রীর কথা শুনে মেজবাবু একটু রেগে যান।
তোমার কি ধারণা, এত বছর আমরা তিন ভাই ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতাম আর বড়বাবু একাই এতগুলো ব্যবসা সামলাতেন?
এত কাল যা শুনে এসেছি, তাই বললাম।
ভুল শুনেছ।
মেজবাবু একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, ব্যবসা করে লাখ লাখ টাকা আয় করে বড়বাবুর মাথা ঘুরিয়ে দেব। জগত্তারিণীও বলেছে, কালীপদ, আমি তোমার পিছনে আছি। কোনো চিন্তা কোরো না।
মেজগিন্নি অবাক হয়ে বলেন, তুমি ঐ নোংরা চরিত্রহীন মেয়েলোকটার সঙ্গে হাত মেলাবে?
কে কী খায় বা কে কার সঙ্গে রাত কাটায়, সেসব চিন্তাভাবনা করলে কি ব্যবসা বাণিজ্য করা যায়?
সবই বুঝলাম কিন্তু ঐ মহিলা যে অত্যন্ত অসৎ আর বদমাইশ, সে বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। উনি যদি শেষ পর্যন্ত তোমাকে কোনো বিপদে ফেলেন?
আমি কি এতই কাঁচা ছেলে যে ঐ মাগী যেভাবে নাচাবে, আমি সেইভাবে নাচব?
ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা ফুটিয়ে মেজবাবু বলেন, মেজবউ, ভুলে যেও না, আমি রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্তর ছেলে। তুমি দেখে নিও, ঐ মাগী আমার কথায় উঠবে আর বসবে।
মেজবউ আর তর্ক না করলেও স্বামীর কথায় বিশেষ আশ্বস্ত হতে পারেন না।
দুএক মিনিট চুপ করে থাকার পর মেজবউ বললেন, এদিকে তোমার মেয়েকে নিয়ে তো আমি মহা সমস্যায় পড়েছি।
মেজবাবু অবাক হয়ে বলেন, কেন? রাধা আবার কী করল? বড়মা আর ভাইবোনের জন্য দিনরাত কান্নাকাটি করছে।
