সব দেখে শুনে তাই তো মনে হচ্ছে। সেজভাই শ্যামাপদ বললেন।
এবার দুর্গাপদ মেজভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন, কালী, ছোটকর্তা তোমাকে কত দিয়েছেন?
মেজবাবু মুখ নিচু করে বললেন, আমার শেয়ার থেকে চার লাখ জগত্তারিণীকে দিয়ে দেবেন।
এটা যৌথ পরিবার। লাভ-ক্ষতি যাই হোক, আমরা সবাই তা ভাগ করে নেব কিন্তু আমি সঙ্গে সঙ্গে এ কথা বলতে বাধ্য, তোমার জন্যই এই সংসারটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
মেজবাবু আর বসতে পারলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বললেন, কালই হেমেনকাকাকে খবর দেবেন। তিনি আমাদের বিষয়-সম্পত্তি ভাগ করে দিলেই আমি চলে যাবে। আর ঐ চার লাখ টাকার জন্য আপনাদের ভাবতে হবে না। আমি জগত্তারিণীর কাছে গিয়ে মিটমাট করে নেব।
মিটমাট মানে?
উনি যাতে মামলা তুলে নেন, তার ব্যবস্থা করবো।
মামলা তুলে নিলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্গাপদ সোজাসুজি বলেন, দুজন বিশিষ্ট সাক্ষীর সামনে ওকে লিখে দিতে হবে, উনি টাকাটা ও জমির দলিলপত্র ঠিক মতো পেয়েছেন।
ঠিক আছে; তাই হবে। কালীপদ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
দুর্গাপদ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, গিরীশবাবুর মতো আমিও বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।
.
০৬.
খবরের কাগজ হাতে নিয়ে অঘোরনাথকে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই কণিকা জিজ্ঞেস করেন, কী হলো ছোট কাকা, জানলার সামনে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন?
বৃদ্ধ ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু ম্লান হাসি হেসে বলেন, দুঃখের কথা কি জানো ছোট মা, মিষ্টি আমেই বেশি পোকা লাগে; টক আমে কখনই পোকা পাবে না।
কণিকা চুপ করে এর দিকে তাকিয়ে থাকেন।
অঘোরনাথ একটু চুপ করে থাকার পর বলেন, সত্যি বলছি ছোট মা, দত্তবাড়ি ভাঙছে। দেখে আমার চোখে জল এসে যাচ্ছে।
এ পাড়ার প্রত্যেকটা পুরনো বাড়ি আর বাসিন্দাদের প্রতি আপনার খুব দুর্বলতা, তাই ছোটকাকা?
উনি একটু এগিয়ে ইজিচেয়ারে বসতে বসতে বলেন, হ্যাঁ, ছোট মা, তুমি ঠিকই ধরেছ।
অঘোরনাথ একটু থামেন। আপন মনে কী যেন ভাবেন। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, হাজার হোক বিরাশি বছর আগে এই পাড়াতেই জন্মেছি, এখানেই বড় হয়েছি। এ পাড়ার প্রত্যেকটা পরিবার তো দূরের কথা, প্রত্যেকটা বাড়ির ইট-কাঠের সঙ্গেও আমার একটা সম্পর্ক আছে।
উনি মুহূর্তের জন্য থেমে কণিকার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেন, আমার জীবনের সব চাইতে আনন্দের স্মৃতিগুলো তো এখানেই ছড়িয়ে আছে।
একটা মোড়া টেনে নিয়ে ওঁর সামনে বসে কণিকাও একটু হাসেন। তারপর বলেন, সারাজীবন বাইরে বাইরে চাকরি করলেন কিন্তু সব আনন্দের স্মৃতিগুলো শুধু এখানেই ছড়িয়ে আছে?
হ্যাঁ, ছোট মা, সত্যিকার আনন্দের স্মৃতিগুলো শুধু এখানেই ছড়িয়ে আছে।
অঘোরনাথ একবার নিঃশ্বাস নিয়েই আবার বলেন, চাকরির জন্য পেশোয়ার আম্বালা-দিল্লি-মীরাট বা এলাহাবোদে থাকলেও ছুটিতে সব সময় ছুটে এসেছি এই ভবানীপুরে। ছুটিতে অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবতেই পারতাম না।
কণিকা বলেন, কিন্তু ছোট কাকা, অপনি এখন ভবানীপুরে থেকেও তো সব সময় মনমরা হয়ে তাকে।
না, ছোট মা, সব সময় আমার মন খারাপ হয় না।
অঘোরনাথ একটু হেসে বলে, তুমি আর নীতু আমাকে যে আদর-যত্ন-সম্মানের সঙ্গে রেখেছ, তার জন্য আমি যে কী আনন্দে থাকি, তা আমি মুখে বলে বোঝাতে পারব না।
এটা তো আমাদের কর্তব্য ছোটকাকা।
না, ছোট মা, তোমরা শুধু কর্তব্য পালন করো না।
উনি একটু থেমে বলেন, একটু আশ্রয় আর দুবেলা দুমুঠো খেতে দিয়েই তোমরা কর্তব্য শেষ করতে পারতে কিন্তু তাহলে আমি আনন্দে খুশিতে থাকতাম না।
অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন,আদর-যত্ন-সম্মান অনেক মিষ্টি, অনেক লোভনীয়।
মুহূর্তের মধ্যে ওঁর মুখ থেকে হাসি উবে যায়। বেদনার্ত হয়ে ওঠে চোখ-মুখের চেহারা। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আশেপাশের বাড়িগুলোর দিকে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যায়।
ছোটকাকা, একটা কথা বলব?
হ্যাঁ, ছোট মা, বলো।
আমাদের পাড়ার কিছু কিছু লোকের প্রতি আপনার অহেতুক দুর্বলতা আছে।
অঘোরনাথ একটু হেসে বলেন, আমি জানি, মিত্তিরবাড়ির রামপ্রসন্নকে টাকাকড়ি দিয়ে সাহায্য করলে তুমি রাগ করো কিন্তু…
ওঁর কথার মাঝখানেই কণিকা বলেন, উনি যে টাকাকড়ি পেলেই রেসের মাঠে চলে যান। তাই..
আমি জানি ছোট মা, তোমার রাগের কারণ আছে কিন্তু তবু পুরনো দিনের কথা মনে করে আমি কিছুতেই ওকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারি না। রামপ্রসন্নর ঠাকুমাই যে আমার নাড়ি কেটেছিলেন, সে কথা ভুলি কী করে?
মুহূর্তের জন্য একটু থেমে একবার নিঃশ্বাস নিয়েই উনি বলেন, সত্যি বলছি ছোট মা, এই পাড়াটাকেই মনে হতো নিজের সংসার, নিজের পরিবার।
কণিকা চুপ করে শুনে যান।
অঘোরনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই যে চোখের সামনে দত্তবাড়ি ভেঙে ফেলছে, তা আমি সহ্য করতে পারছি না।
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর কণিকা বলেন, কিন্তু ছোট কাকা, শুনেছি, দত্তবাড়ির কোনো এক মেজবাবুর জন্যই এই পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেল।
দত্তবাড়ির এই মেজবাবু একটি কুলাঙ্গার ছিলেন।..
কণিকা ওঁর মুখে ঐটুকু শুনেই একটু হেসে বলেন, সরকারবাড়ির বুড়ির কাছে সেইরকমই শুনেছি।
তুমি সরকারবাড়ির ছোটগিন্নীর কাছে যাও?
