.
মামলা জেতার আনন্দে সন্ধেবেলায় কাঁসারীপাড়ার শিবমন্দিরে আর কালীঘাটের মায়ের মন্দিরে পুজো দেওয়া হলো। পাড়ার প্রত্যেকটি বাড়িতে বড়বউ হাঁড়িভর্তি রসগোল্লা পাঠালেন। বড় দুভাই পুজোর প্রসাদ আর দুহাঁড়ি মিষ্টি দিয়ে এলেন হেমেনকাকার বাড়িতে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা মোটরগাড়ি চড়ে ইডেন গার্ডেন বেড়িয়ে এলো। একটু বেশি রাত্তিরে ভাই আর বউদের আসর বসল।
কিগো, যা চাইব, তাই দেবে তো? বড়বউ মিটমিট করে হাসতে হাসতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন।
দুর্গাপদ একটু হেসে বললেন, সবার আগে নবৌমাকে বলতে দাও। সব শেষে তোমার চান্স আসবে।
ঠিক আছে।
দুর্গাপদ বলেন, ন’বৌমা, বল তোমার কী চাই?
বড়বাবুকে এ বাড়ির সবাই ভয়ও করে, ভক্তিও করে। ওঁর কথা শুনে নবৌমা একটু হেসে লজ্জায় মুখ নিচু করেন।
কী হলো ন’বৌমা? বলল, তোমার কী চাই? দুর্গাপদ মুহূর্তের জন্য একটু থেমে বলেন, বড় দাদার কাছে কিছু চাইতে ছোট বোনেরা কী লজ্জা করে?
বড়বউ হাসতে হাসতে বলেন, ওরে বোকা মেয়ে, এমন সুযোগ আর পাবি না। বল কী চাই।
দুর্গাপদ আবার বলেন, তাছাড়া আজ আমাদের এত আনন্দের দিন। তোমাদের কিছু দিতে পারলে আমিই সব চাইতে বেশি আনন্দ পাবো।
ন’বৌমা মুখ নিচু করেই বলেন, পুরী যাবো।
নিশ্চয়ই যাবে। দুর্গাপদ সঙ্গে সঙ্গে নভাইকে বললেন, শিবু, কাল সকালেই আমি তোকে টাকা দেব। কাল-পরশুর মধ্যেই তোদের টিকিট কাটবি। টিকিট কাটা হলেই ওখানকার খরচপত্তরের টাকাও পেয়ে যাবি।
এবার উনি শিবপদর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন, শোনো বৌমা, তোমার হাতখরচের জন্য যে টাকা দেব, তার একটি পয়সাও শিবুকে দেবে না।
বড়ভাসুরের কথা শুনে নবৌমা না হেসে পারেন না।
বড়বউ বললেন, ওকে কত টাকা দেবে, তা বলে দাও।
আমি ওকে পাঁচশও দিতে পারি, পাঁচ হাজারও দিতে পারি। তোমাদের সামনে বাব কেন? বড়বাবু হাসতে হাসতে বলেন, নবৌমা, তোমাকে আমি কত দেব, তা কাউকে বলবে না।
ওঁর কথায় সবাই হাসেন।
দুর্গাপদ একে একে সবাইকে প্রশ্ন করেন। যে যা চায় তাকে, তাই দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। সব শেষে বড়বউকে জিজ্ঞেস করেন, এবার বল তোমার কী চাই?
বড়বউ চাপা হাসি হাসতে হাসতে বলেন, আমার চার বউ মিলে ঝগড়া করে ঠিক আনন্দ পাচ্ছি না। দুএক মাসের মধ্যেই এই বাড়িতে একটা টুকটুকে সুন্দরী ছোট্ট বউ আনতে হবে।
ওঁর কথা শুনে সবাই হেসে ওঠেন।
গুরুপদ লজ্জায় দ্বিধায় কোনমতে বলে, আমি ওসবের মধ্যে নেই।
তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না ছোট ঠাকুরপো। বড়বউ হাসতে হাসতে বলেন, তুমি শুধু মালাবদল করবে। ফুলশয্যা হবে তো আমার সঙ্গে।
বড়দার সামনে গুরুপদ আর একমুহূর্ত থাকতে পারে না। ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
দুর্গাপদ বললেন, তোমাদের সবার যদি মত থাকে, তাহলে আমি আপত্তি করব কেন?
অন্য তিন বউ প্রায় একসঙ্গে বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বড়দা, এবার ছোট ঠাকুরপোর বিয়ে দিন।
ঠিক আছে, তোমরা মেয়ে দেখতে শুরু করো। দুর্গাপদ একটু থেমে বললেন, শুধু মনে রেখো, মেয়েটি যেন তোমাদের মতোই ভাল হয়।
নবৌমা হাসতে হাসতে বলেন, যে মেয়েকে আমরা পছন্দ করেছি তাকে আপনাদের সবারই..
মেজবাবু কালীপদ বললেন, মেয়ে পছন্দ করা হয়ে গেছে?
বড়বউ বললেন, তোমাদের ভরসায় থাকলে তো ছোট ঠাকুরপোকে আইবুড়োই থাকতে হবে।
সেজবাবু শ্যামাপদ বললেন, ঠিকই বলেছ বড়বৌদি।
আনন্দের বন্যায় ভেসে যায় দত্ত পরিবার। পাড়ার সবার মুখেই এক কথা, দুর্গাপদর মতো মানুষ হয় না। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের বুদ্ধি, সেইরকম কর্তব্যপরায়ণ ও স্নেহশীল। পাড়ার বুড়িরা বলেন, সাক্ষাৎ যুধিষ্ঠির। এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রঘাত!
.
কোর্টের সমন পেয়েই দুর্গাপদ চমকে উঠলেন। জগত্তারিণী টাকা পাননি?
মেজভাই কালীপদ একটু বেশি রাত্রে বাড়ি ফিরলেও দুর্গাপদ তাকে ডেকে পাঠালেন।
বড়, আমাকে ডেকেছেন?
হ্যাঁ, বসো। দুর্গাপদ অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ব্যাঙ্কের কাগজপত্রগুলো জগত্তারিণীকে পৌঁছে দিয়েছিলে?
প্রশ্ন শুনে কালীপদ একটু যেন চমকে ওঠেন। তবে সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কেন, উনি পাননি?
তুমি পৌঁছে দিয়েছিলে কি?
কালীপদ মুখ নিচু করে বলেন, সেদিন আমি একটু ব্যক্তও ছিলাম, তাছাড়া ওখানে যেতে ইচ্ছা করছিল না বলে সরকার বাড়ির ছোটকর্তার মারফত..
দুর্গাপদ খুব জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বুঝেছি। তারপর একটু থেমে বললেন, জগত্তারিণী মামলা করেছে।
মামলা করেছে?
করবে না কেন? উনি এক নিঃশ্বাসে বলে যান, আমরা যদি তার প্রাপ্য চার লাখ টাকা না দিই, তাহলে তিনি মামলা করবেন না?
কালীপদ মুখ নিচু করেই থাকেন। কোনো কথা বলেন না।
পরের দিন সকালে দুর্গাপদ সব ভাইদের সামনে মামলার সমনটা রেখে বললেন, আমি খোলাখুলিভাবেই তোমাদের জানাতে চাই, একজন বেশ্যা মামলা করে বলছে যে, আমরা তার প্রাপ্য চার লাখ টাকা মেরে দিয়েছি, এটা অত্যন্ত জঘন্য ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মামলা লড়তে চাই না এবং জোর করে লড়লেও হেরে যেতে বাধ্য।
ন’ভাই শিবপদ বললেন, ব্যাঙ্ক বলছে, টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে অথচ জগত্তারিণী বলছে, সে টাকা পায়নি, এ তো ভারি মজার ব্যাপার।
দুর্গাপদ অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার স্থির বিশ্বাস সরকার বাড়ির ছোটকর্তা কাউকে জাল জগত্তারিণী সাজিয়ে টাকাটা তুলে নিয়েছেন। ভুলেও যেও না, সরকার বাড়ির ছোটকর্তাই সাক্ষী হিসেবে ব্যাঙ্কের কাগজপত্রে সই করেছেন।
