বাবা, আমার নাম মোক্ষদা দাসী।
আপনি কবে বিধবা হয়েছে?
তখন বোধহয় আমার বয়স সতেরো-আঠারো হবে।
আপনার স্বামীর নাম মনে আছে?
তা থাকবে না?
কী নাম ছিল তাঁর?
অ ভ-ইকার, র-আকার আর ম।
অভিরাম?
ঠিক বলেছ বাবা।
আপনার কোনো ছেলেমেয়ে হয়েছিল?
দুঃখের কথা কী বলব বাবা, একটা মেয়ে হয়েছিল কিন্তু একটা বদমাইশের পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
আপনার মেয়ের নাম কী?
জগত্তারিণী।
হেমেনবাবুর প্রশ্নের উত্তরে বৃদ্ধা মোক্ষদা দাসী হাকিমকে বলেন, বিধবা হবার পর ভাইদের কাছেই আশ্রয় পাই। স্বামী হারাবার দুঃখের কথা বাদ দিলে ভাইদের কাছে ভালই ছিলাম। মেয়েটাও লেখাপড়া শিখছিল। আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠল। বয়সের তুলনায় জগত্তারিণীকে একটু বেশি ডাগর-ডোগর দেখাতো।
তারপর?
আমার মেজ ভাইয়ের এক মেয়ের বিয়ের সময় বরযাত্রীদের সঙ্গে একটা ছোকরা এসে বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে এমন মেতে উঠল যে সে আর বরযাত্রীদের সঙ্গে ফিরে গেল না। দিন দশেক পর ঐ হতচ্ছাড়া আমার মেয়েটাকে নিয়ে উধাও হয়ে গেল।
ঐ হতচ্ছাড়ার নাম কী?
কেষ্ট! কেষ্ট চৌধুরী।
আচ্ছা এটা কত বছর আগেকার কথা?
তখন ওর বয়স ঠিক ষোল।
আপনার মেয়ে খারাপ হয়ে গেছে, এ ধারণা হলো কী করে?
বাবা, মা হয়ে মেয়ের বিষয়ে সব কথা কি বলা যায়? তবে এইটুকু শুনে রাখো, কেষ্ট আমার মেয়েকে বিয়ে করে কিন্তু তা সত্ত্বেও ও নিজের বউকে বড়লোকদের বাগানবাড়িতে পাঠিয়ে বেশ মোটা টাকা রোজগার করেছে।
আপনি প্রমাণ দিতে পারেন?
একবার তো মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছিল। তাছাড়া কেষ্টর দাদা বিনোদকে জিজ্ঞেস করলেই সব জানতে পারবে।
জগত্তারিণীর উকিল একে জেরা না করেই ছেড়ে দিলেন।
এবার হেমেনবাবুর দ্বিতীয় সাক্ষী রায়বাহাদুর অনাদি ঘোষাল হাজির হয়ে বললেন, জমিদারির কাজকর্ম দেখাশুনা করার পর আমি যেটুকু সময় পাই, তা আমি সঙ্গীতচর্চায় ব্যয় করি। গানবাজনা শোনার জন্যই মাঝে মাঝে বড় বড় ওস্তাদ আর বাঈজীদের নিয়ে বাগানবাড়িতে আসর বসাই। কলকাতার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিই সেসব আসরে হাজির থেকেছেন।
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?
ও আমার মোসাহেবী করে কিছু টাকাকড়ি পায়।
জগত্তারিণীকে চেনেন?
হ্যাঁ, ও কেষ্টর রক্ষিতা কিন্তু…
কিন্তু কী?
রোজগার করার মতো কোনো মুরোদ কেষ্টর নেই। তাই ও মাঝে মাঝেই এক একজন বড়লোককে ধরে এনে জগত্তারিণীকে ভিড়িয়ে দিয়ে কিছু টাকা আয় করতে।
এ ধরনের দুচারজন বড়লোকের নাম বলতে পারেন?
তার মধ্যে একজন তো আমি নিজে!
রায়বাহাদুরের উত্তর শুনে সবাই হেসে ওঠেন।
বৃদ্ধ হেমেনবাবু একটু চাপা হাসি হেসে প্রশ্ন করেন আপনি, ছাড়া আর কারুর নাম বলতে পারেন?
রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্ত।
মিঃ রায় এই সাক্ষীকে জেরা করেছিলেন অনেকক্ষণ ধরে কিন্তু যেসব উত্তর আদায় করেছিলেন, তার দ্বারা ওঁর মক্কেলের কেচ্ছা-কাহিনী আরো নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ল।
জগত্তারিণী দাসী মামলা করেছিলেন দুটি কারণে। প্রথমত, রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্তর যে উইলটি তার ছেলেরা ওকে দেখিয়েছেন, তা জাল এবং ওকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই এই জাল উইলটি তৈরি করা হয়েছে। উনি এই উইলটি মানতে রাজি নন। দ্বিতীয়ত, উনি রায়বাহাদুরের বিবাহিতা স্ত্রী এবং সেজন্য রায়বাহাদুরের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক তাঁর প্রাপ্য।
মাননীয় হাকিম যে এই দুটি বিষয়েই মামলা বাতিল করেছিলেন, তা নয়। উপরন্তু তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ইহা দিনের আলোর মতো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে যে জগত্তারিণী দাসী একজন বারবণিতা ছাড়া আর কিছুই নহে এবং কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরীর মন্ত্রণাতেই তিনি কলিকাতা মহানগরীর একটি বিশিষ্ট পরিবারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জঘন্য। ষড়যন্ত্র করিয়া এই মামলা দায়ের করেন। রায়বাহাদুরের পুত্ররা এই দুইজনের বিরুদ্ধে অবশ্যই মানহানির মামলা দায়ের করিতে পারেন।
.
দুর্গাপদ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। দেখে মনে হয়, সব সময় চিন্তিত। একমাত্র ছোট ভাইদের কটি ছেলেমেয়ে ছাড়া কেউ ওঁকে হাসতে দেখেন না। তবে সেদিন কোর্ট থেকে বেরুবার সময় ভাই আর বউদের বলেছিলেন, আজ আমাদের সত্যি আনন্দের দিন। তোমরা আজ যে যা চাইবে, আমি তাই দেব।
বড়বাবুর কথা শুনে সবার মুখেই হাসি।
দুর্গাপদ এবার বললেন, হেমেনকাকা কোর্টরুমের বাইরে বেরুলেই আমরা সবাই ওঁকে প্রণাম করব।
দুতিন ভাই প্রায় এক সঙ্গেই বলেন, হ্যাঁ, সে তো একশ বার! বড়বউ বললেন, সবার আগে আমরা চারজনে প্রণাম করব। তারপর তোমরা পাঁচ ভাই ওঁকে প্রণাম করবে।
একে একে ওঁরা সবাই প্রণাম করতেই হেমেনবাবু খুশির হাসি হেসে বলেন, আরে, আরে, তোমরা কী করছো?
দুর্গাপদ একটু হেসে বললেন,কাকাবাবু, শুধু আপনার দয়াতেই তো আমরা বেঁচে গেলাম।
হেমেনবাবু একটু হেসে বলেন, না, না, আমি কোনো দয়া করিনি। তোমার বাবাকে আমি দাদা বলে ডাকতাম; তিনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তোমার বাবার মোটরগাড়ি চড়েই আমি প্রথম দিন কোর্টে এসেছি। তোমাদের প্রতি এটুকু কর্তব্য না করে কি থাকতে পারি?
মেজবাবু কালীপদ জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা কাকাবাবু, ওরা যদি হাইকোর্টে যায়?
তাতে কোন লাভ হবে না। উনি একটু থেমে বললেন, আমার মনে হয় না ওরা হাইকোর্টে যাবে।
