সাক্ষীদের সাক্ষ্যদান শেষ হবার পর আপনার সব নিবেদন শুনব। এখন পরবর্তী সাক্ষীকে হাজির করুন।
হাকিমের মনোভাব আন্দাজ করে মিঃ রায় কোনো তর্ক-বিতর্ক না করে দ্বিতীয় সাক্ষী হাজির করলেন।
আপনার নাম?
শ্রীকৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী।
আপনি জগত্তারণী দাসীকে চেনেন?
খুব ভাল করে চিনি।
আপনার সঙ্গে ওর সম্পর্ক কী?
উনি আমার বন্ধু রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্তর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী এবং এই বিয়ের অনেক দায়িত্বই আমাকে পালন করতে হয়।
তাহলে বন্ধুপত্নী হিসাবেই জগত্তারিণী দাসীকে আপনি চেনেন?
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন।
বিয়ের দিনের ঘটনা মনে আছে? দি
নের আলোর মতো সবকিছু মনে আছে।
কী মনে আছে বলুন তো!
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী গড় গড় করে বিবাহ উৎসবের বিশদ বর্ণনা শোনাবার পরই মিঃ রায় হাকিমকে বললেন, ইওর অনার, এবার বিরোধী পক্ষের উকিল জেরা করতে পারেন।
হেমেনবাবু প্রথমেই ওঁকে প্রশ্ন করেন, মিঃ চৌধুরী, আপনি কি রায়বাহাদুরের সহপাঠী ছিলেন?
না, আমার সঙ্গে ওঁর বন্ধুত্ব…
মিঃ চৌধুরী, এটা কোর্ট। বাচালতা করার জায়গা না যে প্রশ্নের যেটুকু জবাব, শুধু সেইটুকুই বলবেন। তার বেশি বকবক করবেন না। আপনি সহপাঠী ছিলেন না, সেইটুকু যথেষ্ট।
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী মনে মনে অত্যন্ত অপমানিতবোধ করলেও নীরবে তা হজম করেন।
এবার হেমেনবাবু প্রশ্ন করেন, আপনিই কি এই বিয়ের ঘটকালি করেন?
হ্যাঁ।
অর্থাৎ জগত্তারিণী দাসী পরবর্তীকালে বন্ধুপত্নী হলেও তার সঙ্গে আগে থেকেই আপনার সবিশেষ পরিচয় ছিল।
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, হ্যাঁ ছিল।
আপনার দেশ কোথায়?
মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে।
সেখানেই লেখাপড়া করেছেন?
হ্যাঁ।
ম্যাট্রিক পাশ করেছেন?
না।
আপনি বিবাহিত?
আপনার কটি ছেলেমেয়ে?
চার মেয়ে।
বড় মেয়ের বয়স কত?
তা তিরিশ-বত্রিশ হবে।
বিয়ে হয়েছে?
হ্যাঁ।
বড় জামাইকে কত নগদ দিতে হয়েছিল?
পাঁচ হাজার।
সব মেয়ের বিয়ে হয়েছে?
তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে।
আপনি স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে কোথায় বেশি সময় থেকেছেন?
ওরা সবাই বহরমপুরে থেকেছে। আমি কলকাতা থেকে নিয়মিত যাতায়াত করেছি এবং এখনও করি।
বহরমপুরে কে ওদের দেখাশুনা করেন?
কাকারা আছেন, তিন ভাই আছে।
আপনি কলকাতায় থাকেন কেন?
ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এখানে থাকি।
আপনার দোকান বা অফিস আছে?
না।
তাহলে কীসের ব্যবসা করেন?
সাপ্লাইয়ের।
কী সাপ্লাই করেন? ঘটকালি করে জগত্তারিণী দাসীর মতো দ্বিতীয় পক্ষের বউ সাপ্লাই করেন?
হেমেনবাবুর প্রশ্ন শুনে কোর্টঘরে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন। এমনকি হাকিম পর্যন্ত একটু চাপা হাসি না হেসে পারেন না। হাসতে পারেন না জগত্তারিণী দাসীর উকিল আর সাক্ষী স্বয়ং।
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলেন, হ্যাঁ, ঘটকালি করেও রোজগার করি। তাছাড়া নানা অফিসে মালপত্র সাপ্লাই দিই।
রায়বাহাদুরের সঙ্গে জগত্তারিণী দাসীর বিয়েতে কে আপনাকে টাকা দেন?
রায়বাহাদুর।
কত টাকা দিয়েছিলেন?
আড়াই হাজার।
কোন ব্যাঙ্কের চেক দিয়েছিলেন?
নগদ দিয়েছিলেন।
রায়বাহাদুর আপনার বন্ধু ছিলেন এবং আপনিই তার বিয়ে দেন। আপনার স্ত্রী কন্যারা সে বিয়েতে নিশ্চয়ই উপস্থিত ছিলেন?
না।
এবার হেমেনবাবু কোটের পকেট থেকে একটা ছবি বের করে সাক্ষীর সামনে এগিয়ে ধরে প্রশ্ন করেন, ঘোষালবাবুদের বাগানবাড়িতে ভোলা এই ছবিতে আপনি যে মেয়েটিকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে অর্ধশায়িত আছেন, তিনিই কী জগত্তারিণী দাসী?
প্রশ্ন শুনে সবাই চমকে উঠলেন। কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী স্তম্ভিত। জগত্তারিণীর উকিলবাবুর মুখের রক্ত কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে।
হঠাৎ হেমেনবাবু সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন, জবাব দিন মিঃ চৌধুরী।
হ্যাঁ, উনিই জগত্তারিণী দাসী।
এবার হেমেনবাবু বলেন, মিঃ চৌধুরী, আপনার লেখা একটা চিঠি আপনাকে দিচ্ছি। অনুগ্রহ করে এই চিঠিটা মহামান্য হাকিমকে পড়ে শোনান।
চিঠিখানা হাতে নিয়ে কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরীর চক্ষুস্থির। মুখ দিয়ে একটি শব্দ বেরোয় না। দুচার মিনিট কেটে যাবার পর হেমেনবাবু ওঁর হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে পড়তে শুরু করেন–
মাই ডিয়ার ঘোষালমশাই, দোলযাত্রা তো আসিয়া গেল। জগত্তারিণী এখন হইতেই নাচিতে শুরু করিয়াছে। না করিবার কোনো হেতু নাই। গত দুই বৎসর দোলযাত্রার সময় আমি আর জগত্তারিণী আপনার বাগানবাড়িতে যে অফুরন্ত আনন্দ ও স্ফুর্তি করিবার সুযোগ পাইয়াছি, তাহা কি ইহজীবনে ভুলিয়া যাওয়া সম্ভব? আশা করি শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় এইবারও দোলযাত্রা উপলক্ষে জগত্তারিণী আকণ্ঠ সুরাপান করিয়া আমাকে ও আপনাকে সমান আনন্দদান করিবে।
হেমেনবাবু একটু থেমে বলেন, ইতি–কলির কৃষ্ণ কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী।
চিঠিখানা শুনে সবার মুখেই চাপা হাসি। হেমেনবাবু চিঠিখানা হাকিমের হাতে পেশ করে বললেন, ইওর অনার, সাক্ষীকে আমার আর কিছু প্রশ্ন করার নেই।
জগত্তারিণীর পক্ষে আরও কয়েকজন সাক্ষী হাজির করা হয় কিন্তু হেমেনবাবু তাদের কাউকেই কোনো প্রশ্ন করেন না। তবে মাননীয় হাকিমের কাছে নিবেদন করেন, ইওর অনার, আমি মাত্র দুজন সাক্ষী হাজির করব। আমার প্রথম সাক্ষী একজন বৃদ্ধা।
একজন বৃদ্ধা বিধবা সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবার পরই হেমেনবাবু প্রশ্ন করেন, আপনার নাম?
