.
হ্যাঁ, জগত্তারিণী দাসী শেষ পর্যন্ত রায়বাহাদু বনবিহারী দত্তের পাঁচ ছেলের নামে মামলা করে বিষয়-সম্পত্তি ব্যবসা বাণিজ্যের আট আনা অংশ গবি করেছিল। ডগগরিণীর উকিল বিচারককে বলেন, ইওর অনার, আমার মক্কেল শ্ৰীমতী জগত্তারিণী দাসী রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্তর বৈধ এবং বিবাহিতা স্ত্রী।
আপনি ঠিক জানেন মিঃ রায়?
ইয়েস ইওর অনার।
আপনি কি এই বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলেন?
বিচারকের প্রশ্ন শুনেই কোর্টরুমের অনেকেই হাসি চাপতে পারেন না।
মিঃ রায় জবাব দেন, না ইওর অনার, আমি নিজে বিয়ের সময় উপস্থিত না থাকলেও অন্যেরা তো ছিলেন।
তাদের আপনি সাক্ষী হিসাবে হাজির করবেন তো?
নিশ্চয়ই।
ভেরি গুড মিঃ রায়।
.
জগত্তারিণীর উকিল প্রথম যে সাক্ষী উপস্থিত করেন তিনি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ জ্ঞান ভটচাজ। পৌরোহিত্য করাই তার পেশা হলেও দুচারজন ছাত্রকে স্মৃতিশাস্ত্র পড়ান। ঈশ্বরের নামে শপথ করে ভটচাজমশাই হাকিমকে বলেন, হ্যাঁ, বনবিহারী দত্তের সঙ্গে জগত্তারিণীর বিবাহে উনিই পৌরহিত্য করেন এবং সবিস্তারে সেই বিবাহ উৎসবের বর্ণনা দেন।
জ্ঞান ভট্টাচার্জের সাক্ষ্য শুনে কোর্টরুমের কতজনের কত হাসাহাসি! চাপা গলায় কতজনের কত কটু মন্তব্য। কোর্টরুম থেকে বেরুতে না বেরুতেই কৃবিনের চৌধুরী বড়বাবুকে ইশারায় কাছে ডেকে বললেন, দুর্গাপদ, তুমি জানো আমি তোমার পিতৃবন্ধু। ভাল-মন্দ অনেক কিছুই দুজনে মিলে করেছি। সত্যি কথা বলতে কি এই বিয়ের আসরে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
বড়বাবু কোনো ভাবাবেগ প্রকাশ না করে ওঁর কথা শোনেন।
…তাই বলছিলাম, তোমাদের যখন কম নেই, তখন ভাগ-যোগ করে নিলেই তো সব মিটে যায়। শুধু তোমার বাবা কেন, লক্ষ লক্ষ লোকের দুটো-তিনটে বিয়ে থাকে। সেটা তো দোষের কিছু নয় বাবা!
না, বড়বাবু এবারও কোনো কথা বলেন না।
চৌধুরীমশাই বলে যান, কোর্ট-কাছারি মামলা-মোকদ্দমা মানেই কেলেঙ্কারি আর টাকার ছাদ্য! হেমেন সেনের খাই তো আমি জানি। কোথায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে যাবে, তার তো ঠিক নেই!
উনি একবার মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, তোমাদের ভাইদের কথা আমি বাদই দিলাম কিন্তু বৌমাদের কথা একবার ভেবে দেখেছ কি? এইসব মামলা-মোকদ্দমা চললে ওরা সমাজে মুখ দেখাবে কী করে?
বড়বাবু একটি কথারও জবাব দিলেন না। সেদিন রাত্রে বাড়ি ফিরেই উনি বাড়ির বউদের ডেকে বললেন, বড়বউ, এবার থেকে তোমরা বউরাও আমাদের সঙ্গে কোর্টে যাবে।
বড়বাবুর কথা শুনে বউরা অবাক হন। এ-ওর মুখের দিকে তাকান। ভাইরাও চুপ।
একটু থেমে বড়বাবু বললেন, সবাইকে দেখিয়ে দেবার দরকার আমরা সবাই এক।
কেউ কোনো প্রশ্ন না করলেও সবাই বুঝলেন, কোনো বিশেষ কারণেই বড়বাবু বাড়ির বউদের কোর্টে যেতে বলছেন।
.
পরের দিন হাকিম এজলাসে এসে বসেই বললেন, ইয়েস মিঃ রায়, আপনি জগত্তারিণী দেবীর পক্ষে সাক্ষীদের হাজির করতে পারেন।
হাকিমকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মিঃ রায় সবার আগে একজন বৃদ্ধকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করলেন। প্রায় নব্বই বছরের বৃদ্ধ শুধু সত্য কথা বলার শপথ নেবার পরই মিঃ রায় তাকে প্রশ্ন করেন, আপনার নাম?
অভিলাষচন্দ্র ঘোষ।
আপনি জগত্তারিণী দাসীকে চেনেন?
চিনব না? ও আমার একমাত্র সন্তান।
মেয়ের বিয়ের কথা মনে আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ; তবে বয়স হয়েছে বলে সব কথা মনে নেই।
জামাই-এর নাম মনে আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্ত।
এবার মিঃ রায় হাকিমকে বললেন, ইওর অনার, আমার এই সাক্ষীর অনেক বয়স হয়েছে। তাই আমি ওঁকে আর প্রশ্ন করতে চাই না। বিরোধী পক্ষের উকিল ইচ্ছা করলে জেরা করতে পারেন কিন্তু আমি সবিনয়ে নিবেদন করব, বৃদ্ধকে বেশি প্রশ্ন না করাই বোধহয় সমীচীন হবে।
এবার প্রবীণ আইনজ্ঞ হেমেনবাবু অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বৃদ্ধকে প্রশ্ন করলেন, আপনার নাম কী অবিনাশচন্দ্র ঘোষ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কোর্টসুদ্ধ সবাই সজোরে হেসে উঠতেন মিঃ রায় উঠে দাঁড়িয়ে কী যেন বলতেই হেমেনবাবু হাকিমকে বললেন, ইওর অনার, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি ডিসটার্বড বাই এনি ওয়ান।
হাকিম সঙ্গে সঙ্গে বলেন, মিঃ রায়, আপনি বসুন।
মিঃ রায় তবু কী যেন বলতে চেষ্টা করতেই হাকিম একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, মিঃ রায়, আদালতের কাজে বাধা দেবেন না। বসে পড়ুন।
মিঃ রায় বসতেই হেমেনবাবু সাক্ষীকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা অবিনাশবাবু, আপনার বাড়ি কোথায়?
আজ্ঞে মথুরাপুর।
সেখানেই থাকেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আপনি আর আপনার স্ত্রী ছাড়া সেখানে আর কে থাকে?
আজ্ঞে আমার স্ত্রী বহুদিন হলো গত হয়েছেন।
মেয়ের বিয়ের আগেই আপনার স্ত্রী মারা যান?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আচ্ছা অবিনাশবাবু, মথুরাপুরে হাই স্কুলে-পোস্ট অফিস তো আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আচ্ছা অবিনাশবাবু, মথুরাপুর কোন জেলায়?
কী বললেন উকিলবাবু?
অবিনাশবাবু, আমি জিজ্ঞেস করেছি, আপনাদের মথুরাপুর কোন জেলায়?
আজ্ঞে হুগলি জেলায়।
অবিনাশবাবু, এবার বলুন, মথুরাপুর থেকে কোর্টে এলেন কীভাবে?
আজ্ঞে রেলগাড়িতে।
এবার হেমেনবাবু হাকিমকে বললেন, ইওর অনার, সাক্ষী অবিনাশচন্দ্র ঘোষকে আমি আর কোনো প্রশ্ন করতে চাই না।
মিঃ রায় উঠে দাঁড়াতেই হাকিম বললেন, আপনার পরবর্তী সাক্ষীকে হাজির করুন।
ইওর অনার, আমার প্রথম সাক্ষীর ব্যাপারে কিছু নিবেদন ছিল।
