ন’বাবু বললেন, বড়দা, আপনি যা বলবেন, আমরা সবাই তাই করব–এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
সেজবাবু বললেন, তবে বড়দা, আমি বলে দিচ্ছি, আমরা পথের ভিখারি হতে রাজি কিন্তু ঐ বদমাইশ মহিলার কাছে হেরে যেতে রাজী নই।
ছোটবাবু বললেন, ঠিক বলেছেন সেজদা। ঐ অতখানি জমি আর চার লাখ টাকা পেয়েও যে জাল দলিলের কথা বলে, তার কাছে দত্তবাড়ির ছেলেরা কিছুতেই হেরে যায় না।
বড়বাবু একটু হেসে বললেন, তোমাদের মনের কথা আমি বেশ বুঝতে পারছি, কিন্তু আমরা সবাই যদি একটু বেশি পরিশ্রম করি, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্যও ঠিক চলবে আবার দরকার হলে কোর্ট-কাছারিও করা যাবে।
উনি একটু থেমে বলেন, যাই হোক, আমি কালই হেমেনকাকার কাছে যাব। যদি দরকার হয়, তাহলে হেমেনকাকাকে নিয়ে সোজা সি. আর. দাশকে গিয়ে ধরব আমাদের এই মামলার জন্য।
মেঝবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ঠিক বলেছেন।
হাজার হোক উনিও তো আমাদের এই ভবানীপুরেরই লোক। হেমেনকাকা আর আমি গিয়ে বললে উনি নিশ্চয়ই না বলতে পারবেন না।
.
বড়বাবুর কাছে সব শোনার পর ও সব কাগজপত্র দেখে হেমেনকাকা দুচারটে লাল মলাটের আইনের বই ঘাঁটাঘাঁটি করে বললেন, শোন দুর্গাপদ, আমার মনে হয় না জগত্তারিণী দাসী মামলা করে কিছু করতে পারবেন। তাছাড়া ইম্পিরিয়্যাল ব্যাঙ্ক তো উইল ও চিঠিপত্র দেখেশুনেই এই টাকার কথা তোমাদের বলেছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তাছাড়া কালীপদ, শ্যামাপদ, শিবপদ বা গুরুপদও তো উইল মেনে নিয়েছে।
তারা তো মেনে নিয়েছেই।
বৃদ্ধ উকিল হেমেন সেন এবার ওঁর দিকে তাকিয়ে কললেন, তবে কিছু চিন্তা নেই। ভাল করে ব্যবসা-বাণিজ্য করো। জগত্তারিণী যদি কিছু করে, তখন এসো। যা করার তা আমিই করব।
.
সংসারে অক্ষম, ছোট, দরিদ্র হবার সমস্যা অনেক। বিপদ অনেক। কিন্তু দশজনের একজন হলে, ধনী হলে বা কোনোকিছু বড় করলেও কম সমস্যা ও ঝামেলা সহ্য করতে হয় না। অতি সাধারণ মানুষের কজন শত্রু থাকে? বড় জোর দুচারজন, কিন্তু ধনী, রাষ্ট্রনায়ক বা রাজা-উজিরের অসংখ্য সমালোচক ও শত্রু থাকবেই। শত্রুর সংখ্যা থেকেই জানা যায়, বোঝা যায় মানুষটি সাধারণ না অসাধারণ।
যে যাই বলুক, রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্ত নিশ্চয়ই একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। ধন-মান-ঐশ্বর্যের অধিকারী হবার সঙ্গে সঙ্গে তার শত্রুও নেহাত কম ছিল না। স্বয়ং লেফটেন্যান্ট গভর্নর রায়বাহাদুরকে বাংলাদেশের নানা জেলায় ব্রিজ তৈরির ভার দিতেই কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী আর সহ্য করতে পারলেন না।
আচ্ছা জগত্তারিণী, তুই আমাকে সত্যি ভালবাসিস?
কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরীর কথা শুনে জগত্তারিণী না হেসে পারে না। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলে, সেই সোল বছর বয়সে যে তুমি আমার প্রথম সব্বনাশ করলে, তারপর কি আমি আর কোনো পুরুষের দিকে ফিরে তাকিয়েছি?
চৌধুরীমশাই ওর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে হাসতে বলেন, তুই না তাকালে কী হয়, তোর দিকে তো অনেকেরই নজর।
জগত্তারিণী ঠোঁট উল্টে বলে, আমি কি সেই কচি মেয়েটা আছি? তারপর একটু তির্যক দৃষ্টিতে চৌধুরীমশায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, এখন এই বয়সেও যদি পুরুষরা আমার দিকে নজর না দেয়, তাহলে আর কবে দেবে?
চৌধুরীমশাই একটু চুপ করে থাকার পর জিজ্ঞেস করেন, হারে জগত্তারিণী, বনবিহারী দত্তকে তোর কেমন লেগেছে রে?
কোন দত্ত?
বনবিহারী দত্ত।
সে আবার কে?
ঐ যে গতবার পুজোর পর আমি যখন তোকে নিয়ে ঘোষালদের বাগানবাড়ি গিয়েছিলাম, সেখানে যে লোকটা তোকে আর ঘোষালবাবুর মাগীকে একশ টাকা করে…
জগত্তারিণী এবার মানুষটাকে চিনতে পেরেই বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
লোকটাকে তোর কেমন লেগেছিল?
তোমার আর ঘোষাল মশাইয়ের মতো বদমাইশ না, বেশ ভদ্দর…
ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই চৌধুরীমশাই এক গাল হাসি হেসে বলেন, তুই আমাদের বদমাইশ বললি?
জগত্তারিণী মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলে, ভুলে গেলে সে রাত্তিরের কথা? দুজনে কি নষ্টামি-দুষ্টুমিই করেছিলে!
যাই হোক, এই কৃষ্ণবিনোদ চৌধুরী পাকে-চক্রে জগত্তারিণীকে বনবিহারী দত্তর ঘাড়ে চাপিয়ে দেন কিন্তু নেপথ্যে ওদের দুজনের সম্পর্ক ঠিকই থাকল। একটু বেশি বয়সে বনবিহারী দত্তর নারীপ্রীতি বেড়েছিল ঠিকই কিন্তু তার জন্য তিনি কোনোদিনই নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবার বা ব্যবসা-বাণিজ্য উপেক্ষা করেননি। কাঁচা বয়সের জগত্তারিণীর কাছে নিয়মিতই যাতায়াত করতেন কিন্তু কোনদিনই দুএক ঘণ্টার বেশি থাকতেন না। সব কাজই উনি ঘড়ি ধরে হিসেব-নিকেশ করে করতেন।
মাঝে মাঝে জগত্তারিণী কত ন্যাকামিই করতো! বনবিহারী দত্ত মাসোহারার টাকা দিলেই বলতো, থাক, থাক, আমাকে টাকা দিতে হবে না। মথুরাপুরের ঘোষবাড়ির মেয়ে আমি। আমাকে নিজের সংসারে নিয়ে শাঁখা-সিঁদুর দিলেই…
বনবিহারী দত্ত একটু চাপা হাসি হেসে বললেন, এটা কি তোমার সংসার না? তুমি যেখানে থাকবে, সেখানেই তোমার সংসার।
না, না, এটা আমার সংসার হবে কেন? তুমি যেখানে থাকো, সেখানেই আমার সংসার। জগত্তারিণী একটু থেমে বলেছিল, তোমার টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি ব্যবসা বাণিজ্য থেকে ঘর-সংসার স্বামী-ছেলেমেয়ের সব রসই বড়বউ ভোগ করবে? এইসব কিছুর উপরই কি আমার কোনো দাবি নেই?
বনবিহারী দত্ত সাফ দবাব দিয়েছিলেন, দেখো জগত্তারিণী, তোমাকে সবকিছু দেবার দায়িত্ব আমার না, এ কথা কেন ভুলে যাও?
