মেয়েটি বিস্মিত হয়ে ওঁদের দিকে তাকাতেই জগত্তারিণী আবার বলেন, হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কিরে? ওরে, তোদের তিনজনের শরীরেই একই রক্ত আছে রে! উনি প্রায় নিঃশ্বাস না ফেলেই বলেন, দুর্গা হতচ্ছাড়ি আবার কোথায় গেল?
শিবানী কোনোমতে একজনকে প্রণাম করতে যেতেই ওঁরা দুভাই এক সঙ্গে বলে ওঠেন, থাক, থাক, প্রণাম করতে হবে না।
কেন বাধা দিচ্ছ বাবা? সৎ ভাইবোন আর সহোদর ভাইবোনদের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? জগত্তারিণী একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, সবই তো এক গাছের ফল।
ওর কথাবার্তা শুনে দুভায়ের গা জ্বলে যায় কিন্তু মুখে কিছু বলে না। শিবানীও একমুহর্ত না দাঁড়িয়ে প্রায় দৌড়ে ভিতরে চলে যায়।
ওরে হারামজাদী, চলে গেলি কোথায়? বিষ্ণুর মাকে বল, একটু চায়ের জল চাপাতে আর…
ওর কথাটা শেষ হবার আগেই বড়বাবু বলেন, আমরা সকালে চা খেয়েছি। এখন আর চা-টা খাব না।
তাই কি হয় বাবা? জগত্তারিণী ওদের দিকে তাকিয়ে একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, তোমরা কি আমার পর বাবা? নিজে পেটে ধরিনি বলে কি আমি তোমাদের মা না?
জগত্তারিণী দাসী শুধু বড়বাবু-মেজবাবু না, প্রায় ছোটবাবুর বয়সী। বড় জোর তার চাইতে সমান্য বড়। কামনার জ্বালা মেটাবার জন্যই যে মানুষ রক্ষিতা রাখে, তা ওঁরা খুব ভালভাবেই জানেন। শুধু তাই না, কোনো বুদ্ধিমান মানুষই বয়স্কা রক্ষিতা রাখে না, তাও ওঁরা জানেন। তাই পিতৃদেবের এই রক্ষিতার মুখে মাতৃস্নেহের বুলি শুনে ওঁরা দুজনেই মনে মনে বিরক্ত বোধ করে।
.
শুধু বিরক্ত কেন, ঘৃণাও যোধ হয়। কলকাতা শহরটা এখন আর অন্ধকার যুগে পড়ে নেই। সেই কোম্পানির যুগে সাহেবসুবোরা যেমন নিছক ফুর্তির জন্য একাধিক হিন্দুস্থানী রক্ষিতা পুষতেন, তেমনি তাদের স্নেহধন্য কিছু মানুষও রক্ষিতা রাখা মর্যাদার লক্ষণ বলে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সেই কলকাতা তো কোথায় হারিয়ে গেছে। কলকাতার রাস্তায় পালকি তো দূরের কথা, ঘোড়ায় টানা ট্রামগাড়িও এখন আর দেখা যায় না। আরো কত কি বদলে গেছে! বাঙালিরা যে সাহেবসুবোদের জুজুর মতো ভয় করতো, সেই বাঙালিরাই কবছর আগে স্বয়ং লর্ড কার্জনের বিরুদ্ধে লড়াই করল। এককালে সাহেবদের কিছু মুষ্টিমেয় প্রিয়পাত্র ও মোসাহেবরাই কলকাতার বাঙালি সমাজে গণ্যমান্য বিবেচিত হতেন কিন্তু এখন তাঁরা ঘৃণার পাত্র না হলেও নিশ্চয়ই সম্মানিত বা শ্রদ্ধেয় না। শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত বাঙালিরা এখন উমেশ বাঁড়ুজ্যে-সুরেন বাঁড়ুজ্যে রবিবাবুর মতো মানুষের মুখ চেয়ে থাকে। তাছাড়া সিমলে পাড়ার নরেন দত্ত দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণের পাল্লায় পড়ে কী কাণ্ডটাই করল! আরো, আরো, কত কি ঘটে গেল এই কলকাতার বুকে। আগে নাটক দেখা মানেই গোল্লায় যাওয়া মনে করতেন সবাই। আর এখন? গিরিশ ঘোষের নাটকে দানীবাবুর অভিনয় না দেখা মানেই জীবন ব্যর্থ!
বনবিহারী দত্তর ছেলেরা হিন্দু কলেজে লেখাপড়া করেনি, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনেও যোগ দেয়নি। তা হোক। তারা তো কলকাতাতেই জন্মেছে, বড় হয়েছে। এখানেই তাদের কাজ-কারবার। তাই আর কিছু না হোক, তারা কোনো মানুষেরই রক্ষিতাকে শ্রদ্ধা করতে পারে না–এমনকি এই জগত্তারিণী দাসীকেও তারা মনে মনে ঘৃণাই করে, কিন্তু সেই ঘৃণার ভাব প্রকাশ না করেই বড়বাবু বলেন, আজ আমরা একটা জরুরি কাজে এসেছি। তাছাড়া আমাদের এখুনি দোকানে যেতে হবে।
কাজ তো সবারই আছে। তাই বলে কি…..।
বড়বাবু ওঁর কথার জবাব না দিয়ে জমি আর ব্যাঙ্কের কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলেন, বাবা আপনাকে কিছু সম্পত্তি আর কয়েক লাখ টাকা দিয়ে গেছেন। কোন টাকা দিয়ে কি কাজ করতে পারবেন, তা বাবা ব্যাঙ্ককে জানিয়ে গেছেন।
জগত্তারিণী কাগজগুলো হাতে নিয়েই বলেন, মোটে চার লাখ রেখে গেছে?
মেজবাবুর ইচ্ছা করে মহিলার গালে একটা চড় মেরে বলতে, তোমার চোদ্দ পুরুষ কোনোদিন চার লাখ টাকা চোখে দেখেছে? কিন্তু জিভের গোড়ায় এসেও কথাটা বলতে পারলেন না। তবে বললেন, বাবা যা রেখে গেছেন, তাই আপনি পেলেন। আপনার ভাগ, থেকে আমরা একটা পয়সাও নিইনি।
কর্তা যে আমায় কথা দিয়েছিল, আমার জামাইরা ব্যবসার শেয়ার পাবে।
তেমন কোনো কথা তাঁর উইলে নেই।
উইলে নেই বললেই তো হবে না বাবা! তোমাদের ভাইবোনের মতো এই মেয়ে দুটোও তো তারই সন্তান। জগত্তারিণী একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, সব ব্যবসা-বাণিজ্যই তোমরা ভোগ করবে, তাই কি হয়?
এবার বড়বাবু অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, বাবার উইলের কপি আপনাকে পাঠিয়ে দেব। তাছাড়া ব্যাঙ্কের কাগজপত্র তো দিয়েই গেলাম। একজন ভাল উকিলকে দেখিয়ে নিলেই…..
শুনেছি, উইল তো জালও হয়।
সন্দেহ হলে মামলা করবেন।
ব্যস! আর একটি শব্দ উচ্চারণ না করে ওঁরা দুভাই সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসেন।
.
সেইদিন রাত্রেই বড়বাবু সব ভাইদের কাছে সকালের ঘটনা জানাবার পর বললেন, ঐ কথাবার্তা শুনেই মনে হলো উনি কিছু গণ্ডগোল করবেনই।
মেজবাবু বললেন, ওর ন্যাকামি দেখে য়ে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল।
বড়বাবু অত্যন্ত চিন্তিত ও গম্ভীর হয়ে বললেন, মনে আমাদের যত রাগ-দুঃখই থাক, এখন আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
প্রায় সবাই এক সঙ্গে বললেন, সে তো একশবার।
আমরা যদি সবাই এক থাকি, তাহলে কেউই আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। বড়বাবু মুহূর্তের জন্য না থেমেই বলেন, একদিকে আমাদের যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ষোল আনা নজর দিতে হবে, সেই সঙ্গে সঙ্গে বিপদ আসার আগেই আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।
