মেমসাহেব বলেন, আমার উচিত ছিল তোমাদের সঙ্গে দেখা করা বাট মাই ডটার ওয়াজ হিয়ার উইথ হার কিডস্। সেজন্য আমি এত ব্যস্ত ছিলাম যে……
বড়বাবু বললেন, না, না, এর জন্য এত বলার দরকার নেই।
কিন্তু কর্তব্যচ্যুতি তত অন্যায়। এবং সে অন্যায় করেছি।
মেমসাহেবের কথা শুনে ওঁরা যেন একটু অবাক হন কিন্তু কেউই কোনা কথা বলেন।
মিসেস উইলিয়ামস একটু হেসে বলেন, তোমাদের বাবা আমার স্বামী ও আমার দুজনেরই খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং উনিই আমাদের স্বামী-স্ত্রী ঝগড়াঝাটি মিটিয়ে দিতেন।
মেমসাহেবের কথা শুনে ওঁরা তিনজনেই একটু হাসেন এবং বড়বাবু বলেন, তাই নাকি?
তবে আর বলছি কী? মেমসাহেব একবার নিঃশ্বাস নিয়েই বলেন, রায়বাহাদুর বহুভাবে আমাদের সাহায্য করেছেন এবং ওঁর সাহায্যের কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না। বিশেষ করে আমার স্বামী মারা যাবার পর উনি যে আমার জন্য কী করেছেন, তা মুখে বলে শেষ করা যাবে না।
মিসেস উইলিয়ামস এবার বড়বাবুর দিকে তাকিয়ে বলেন, বন্ধু হিসেবে আমরাও তোমার বাবাকে যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করছি।
এবার উনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন স্বগতোক্তি করেন, আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে, কেউ কেউ অত্যন্ত নোংরা কথাও বলেছে, কিন্তু আমি জানি, রায়বাহাদুর কত ভাল মানুষ ছিলেন।
রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্ত আর মিসেস উইলিয়ামসকে নিয়ে যে নানা মহলে সরস আলোচনা হতো, তা বড়বাবু খুব ভাল করেই জানেন, কিন্তু আজ মেমসাহেবের কথাবার্তা শুনে কেমন যেন একটু খটকা লাগে। যাই হোক, উনি মনের ভাব মনে রেখেই বলেন, আমরা একটু এসেছিলাম আপনার কাছে।
হা, হ্যাঁ, বলো কী কাজ।
বড়বাবু কোনো কথা না বলে ইম্পিরিয়্যাল ব্যাঙ্কের একটা চিঠি ওঁর হাতে দেন। মিসেস উইলিয়ামস চিঠিটা পড়েই প্রায় চিৎকার করে ওঠেন, নো, নো, আই কান্ট টেক দিস মানি।
বড়বাবু হেসে বলেন, আপনি এ টাকা না নিলে কে নেবে? বাবা তো এখন বেঁচে নেই যে….
লুক হিয়ার মাই বয়, মেমসাহেব ওঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমরা বন্ধু ছিলাম। আমরা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি কিন্তু তার সঙ্গে টাকাকড়ির কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু…
না, না, কোনো কিন্তু না। মিসেস উলিয়ামস একটু হেসে বলেন, রায়বাহাদুর বহুবার আমাকে টাকাকড়ি দিতে চেয়েছেন কিন্তু আমি নিইনি। বন্ধুর ব্যবসায় সাহায্য করে কি কমিশন নেওয়া যায়?
এবার মেজবাবুই প্রথম কথা বলেন, বান্ধবী হিসেবে আপনি আমার বাবাকে সাহায্য করেছেন ঠিকই কিন্তু বিজনেসম্যান হিসেবে তাঁরও তো কিছু কর্তব্য আছে।
মেমসাহেব মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, তোমরা যতই আমাকে বোঝাও, আমি একটি পয়সাও নিতে পারব না। উনি একটু গলা চড়িয়েই বলেন, তাছাড়া টাকা নিয়ে আমি কী করব? আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পাঁচ বছর-সাত বছর পর একবার এখানে আসবে। আর আমার নিজের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি আমার আছে।
ওঁরা তিন ভাই মিলে অনেক অনুরোধ-উপরোধ করার পর মেমসাহেব বললেন, ঠিক আছে, আমি এই টাকা নিয়ে তোমাদের স্ত্রীদের দিয়ে দিচ্ছি।
মেমসাহেব একটু থেমে একটু হেসে বলেন, এই টাকা থেকে তোমরা কেউ একটি পয়সা নিলে আমার কাছে বকুনি খাবে।
মেমসাহেবের কথা শুনে ওঁরা তিন ভাই হেসে ওঠেন।
হাসছ কী? আমি ঠিকই বলেছি। এই টাকা নিয়ে ওরা যা ইচ্ছে করুক কিন্তু তোমরা ওদের কিছু বলতেও পারবে না, একটি পয়সাও নিতে পারবে না।
মেমসাহেবের কাণ্ড-কারখানা দেখে ওঁরা অবাক হয়ে যান। তিনজনের মনেই সন্দেহ হয়, এই মহিলা কি পিতৃদেবের…
না, না, তা সম্ভব নয়। যার মধ্যে এই মনুষ্যত্ব, এই উদারতা আছে, তার কি চরিত্রে কোনো কলঙ্ক থাকতে পারে?
.
ও বাড়ি থেকে বেরুবার পরই সেজবাবু জিজ্ঞেস করলেন, বড়দা, মেমসাহেবকে আপনার কেমন লাগল?
বড়বাবু একটু হেসে বললেন, শুধু ভাল লাগেনি, মেমসাহেবকে আমার মায়ের মতোই…।
ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মেজবাবু বললেন, ঠিক বলেছে! সত্যি শ্রদ্ধা করার মতো মহিলা।
সেজবাবু বললেন, আমার তো মনে হয়, এই মহিলার সঙ্গে বাবার কোনো অন্যায় সম্পর্ক কখনই ছিল না।
বড়বাবু বললেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
.
এরপর মাসখানেক ওঁরা সবাই নানা কাজে এমনই ব্যস্ত রইলেন যে জগত্তারিণী দাসীর কাছে যাওয়া সম্ভব হলো না। বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর আর সিলেটের তিনটে বড় বড় ব্রিজ তৈরির ব্যাপারে কিছু ঝামেলা সামলাতে দুভাইকে বেশ কিছুদিন কলকাতার বাইরে থাকতে হলো। যাই হোক মাস দেড়েক পর বড়বাবু আর মেজবাবু একদিন জগত্তারিণী দাসীর ওখানে গিয়ে হাজির।
. জগত্তারিণী দাসী মহাসমাদরে ওঁদের অভ্যর্থনা করে বললেন, এসো, বাবা, এসো। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেই বলেন, এমন কপাল করেই জন্মেছি যে এতকালপর তোমরা ছেলে হয়েও মাকে দেখছ এই প্রথম।
ওর কথা শুনেই দুভাই একবার পরস্পর পরস্পরের দিকে না তাকিয়ে পারেন না।
জগত্তারিণী ওদের দিকে না তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে চড়া গলায় ডাকেন, ওরে দুর্গা, ওরে শিবানী, কোথায় গেলি তোরা? এদিকে আয়। তোদের দাদারা এসেছে।
মহিলার কথা শুনে দুভাই একটু অবাক না হয়ে পারেন না।
পনের-ষোল বছরের একটি মেয়ে কোথা থেকে ছুটে আসতেই জগত্তারিণী বললেন, ওরে পেন্নাম কর। এরা তোর দাদা!
