বড়বাবু এবার মেজবউয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, যে মানুষটা লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করেছেন, দিবারাত্র ব্যবসা বাণিজ্য আর নিজের পরিবারের কথা ভেবেছে, তিনি কি নিজের ইচ্ছা মতন কিছুই করতে পারেন না?
না, বড়বাবু এইটুকু বলেন থামলেন না। বললেন, বাবা যদি আমাদের পথে বসিয়ে তাঁর সর্বস্ব ঐ জগত্তারিণী দাসীকে দিয়ে যেতেন, তাহলে আমরা তাকে দোষারোপ করতে পারতাম, আমরা চোখের জল ফেলতে পারতাম কিন্তু তার বেশি কিছু করতে পারতাম না।
বড়বাবু রুচিবান মানুষ। তাই প্রত্যক্ষভাবে বললেন না, মেজবৌমার আপন বড় জ্যেঠাঁই তার সমস্ত টাকাকড়ি রক্ষিতাকে দিয়ে নিজের স্ত্রী-পুত্রকন্যাকে নিঃস্ব করে রেখে যান এবং ঐ ভদ্রমহিলাকে আর পাঁচজনের দয়ায় জীবন কাটাতে হচ্ছে। তবে বড়বাবুর কথার যুক্তি ও মর্ম সবাই বুঝলেন।
সব শেষ বড়বাবু বললেন, সব সংসারেই কিছু ভাল-মন্দ থাকে। আমাদের সংসারেও আছে। সেই ভাল-মন্দকৈ মেনে নিয়ে সংসারকে ভাল না বাসলে সংসার করাই নিরর্থক হয়ে যায়।…
মেজবাবু বললেন, ঠিক বলেছেন।
…আমি আগেই ভাইদের বলেছি, এখন সব বৌমাদেরও আমি খোলাখুলি বলছি, সংসারে সবাই ক্ষমতা চায়; মানুষের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্বও থাকতে পারে কিন্তু যৌথ
পরিবার, যৌথ ব্যবসা চালাতে হলে সবাইকেই কিছু না কিছু ত্যাগ করতে হয়।
সবাই এক দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন।
উনি বলে যান, আমি তোমাদের কোনো কিছু ত্যাগ করতেও বলতে পারি না, দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে সংসারে থাকতেও বলি না। তাই বলছিলাম, আমাদের যৌথ ব্যবসা বা যৌথ পরিবারের বদলে ভাগ-যোগ করে নেওয়াই বোধহয় সবার পক্ষে মঙ্গল হবে…অন্তত তাতে অশান্তি এড়ানো যাবে।
একমুহূর্তে সবার মুখের চেহারা বদলে গেল কিন্তু অন্য কেউ কিছু বলার আগেই মেজবউ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপনি আর বড়দিই তো আমাকে এ বাড়িতে এনেছিলেন। আজ আপনিই বলছেন চলে যেতে?
না, না, বৌমা, আমি…।
বড়ভাসুরের কথা যেন মেজবউয়ের কানেই যায় না। উনি কাঁদতে কাঁদতেই বলে যান, আমি অন্যায় করেছি বলে আমাকে শাসন করুন কিন্তু তাই বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন? ছোট ভাইবোন-ছেলেমেয়েরা অন্যায় করলে কি…
ওঁর কান্নাকাটি দেখে প্রায় সবার চোখেই জল এসে যায়। বড়বউ তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে ওঁর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, নারে মেজ, তোরা কেউ কোথাও যাবি না। আমি কাউকে কোথাও যেতে দেব না। আমি না মরলে তোরা কেউ কোথাও যেতে পারবি না।
ছোটবাবু একটু হেসে বলেন, বাঁচালে বড়বৌদি, বাঁচালে। দাদাদের রোজগারে না খেতে পারলে গানবাজনার চর্চা করব কী করে?
সেজবাবুও হাসতে হাসতে বললেন, তুইও তো আমাদেরই মতো একজন পার্টনার।
আমি পার্টনার? ছোটবাবু হো হো করে হেসে উঠেই বলেন, আমাকে গদিতে বসিয়ে দেখুন না কী কেলেঙ্কারী করি! উনি এবার হাসি থামিয়ে বলেন, বড়বৌদির হোটেলে বেশ আছি। আর আপনারা আমাকে গানবাজনার জন্য টাকাকড়ি দিচ্ছেন। আমার তো আর কিছুর দরকার নেই।
এইসব টুকটাক কথাবার্তার পর বড়বাবু একটু হেসে বললেন, মেজবৌমা, তুমি যে এই সংসারের কী উপকার করলে, তা আর কী বলব! যে সামান্য পাপটুকু আমাদের মনের মধ্যে জমেছিল, তা তোমার চোখের জলে সব ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হলো।
মেজবৌমা মুখ নিচু করে বলেন, একি কথা বলছেন আপনি? আমি তো বরং এই সংসারটা ভাঙতেই গিয়েছিলাম।
বড়বাবু পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, মেজবৌমা, এ দুনিয়ায় কেউ রাগে বা হিংসায় চোখের জল ফেলে না। শোকে-দুঃখে, আনন্দে-অভিমানেই মানুষ চোখের জল ফেলে। চোখের জলের চাইতে পবিত্র কিছু হতে পারে না।
বড়বাবু একটু থেমে ওর দিকে তাকিয়ে আবার একটু হেসে বলেন, হোটেল বা ধর্মশালা ছাড়তে কি কেউ চোখের জল ফেলে? নিজের ঘরবাড়ি-সংসার ছেড়ে যাবার সময়ই মানুষ চোখের জল ফেলে। তুমি এই সংসারটাকে নিজের না ভাবলেই কি…
ওঁর কথাটা শেষ হবার আগেই বড়বউ বলেন, ঠিক বলেছ।
সেই রাত্রে মেজবউ তার স্বামীকে বললেন, তোমরা জন্ম জন্ম তপস্যা করে এমন বড়দা আর বড়বৌদি পেয়েছ। সত্যি, ওঁদের মতো মানুষ আমি এ জীবনে দেখিনি, দেখবও না।
মেজবাবু মুখ টিপে হেসে বললেন, এ বাড়ির মেজবাবুও সাক্ষাৎ দেবতা।
চুপ করো! তোমার মতো পেটুক আর কামুক এ বিশ্ব-সংসারে দ্বিতীয় নেই।
পেটুক হয়েছি বড়বৌদির জন্য আর কামুক হয়েছি তোমার জন্য।
তা তো বটেই!
.
যাই হোক নিজেদের বিষয়-সম্পত্তি ব্যবসা-বাণিজ্য একটু সামলে নেবার পর বড়বাবু একদিন ভাইদের ডেকে বললেন, আমার মনে হয় এবার একদিন জগত্তারিণী দাসী আর মিসেস উইলিয়ামসকে গিয়ে ওঁদের প্রাপ্য টাকাকড়ি বুঝিয়ে দেওয়াই ভাল। কারণ টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে কবে কোথায় কি গণ্ডগোল দেখা দেবে, তা কিছু বলা যায় না।
ওঁর কথা সবাই সমর্থন করলেন এবং তখনই ঠিক হলো আগামী রবিবার সকালে বড় তিন ভাই গিয়ে ওঁদের সবকিছু বুঝিয়ে দেবেন।
রায়বাহাদুর বনবিহারী দত্তর ছেলেরা এসেছে শুনেই মিসেস উইলিয়ামস প্রায় ছুটে এসে ওদের অভ্যর্থনা করলেন, প্লিজ কাম ইন, মাই সনস্।
তারপর ড্রইংমে ওদের বসিয়েই বললেন, ইওর ফাদার ওয়াজ এ গ্রেট ম্যান! এ গুড ফ্রেন্ড অ্যান্ড এ ভেরি অনেস্ট ম্যান!
ওঁরা চুপ করে মেমসাহেবের কথা শোনেন।
