আজকে হই হই করার আরো কারণ আছে। গোপালের শশুরমশাই শুধু দিল্লিবাসীই না, হোম ডিপার্টমেন্টের আপার ডিভিসন ক্লার্কও। সুতরাং ওঁর রাজভক্তি সম্পর্কে স্বয়ং ভাইসরয় পর্যন্ত ওয়াকিবহাল এবং খুশি। বছরের অর্ধক সময় দিমি, অর্ধেক সময় সিমলায় কাটান। ভাইসরয় গরমকালে সিমলা গেলে হোম ডিপার্টমেন্টের এই চির অনুগত জীবটিকেও তার অনুগমন করতে হয়। একি কম সম্মান ও সৌভাগ্যের কথা? এ হেন প্রাতঃস্মরণীয় শ্বশুরের বাড়িতে মাস খানেক কাটিয়ে গোপালবাবু আজই প্রথম এই আড্ডায় আসরে হাজির।
নরেন ঘোষাল চিৎকার করে বলেন, এই পঞ্চা! গোলদার নামে সবাইকে একটা করে ফাউল কাটলেট দে!
৫-৬. দুঃসংবাদ হাওয়ার উড়ে
০৫.
কথায় আছে, দুঃসংবাদ হাওয়ার উড়ে আসে। ঠিক তেমনি গোপন কথাটি বোধহয় সবচাইতে বেশি প্রচারিত হয়। দত্তবড়ির বড়বাবু থেকে ছোটবাবু পর্যন্ত পিতৃদেবের রক্ষিতাদের খবর কাউকে না বললেও কী করে যে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল,তা ভগবানই জানেন।
শুধু তাই না। এইসব খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেক সময়ই আসল গল্পটি চাপা পড়ে যায়, হারিয়ে যায়। যাঁরা এসব খবর জেনে ও শুনে রসবোধ করেন, তারা কী একটু রং না চড়িয়ে থাকতে পারেন?
সেদিন মেজবাবু ঘরে ঢুকেই অবাক। স্ত্রীকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, কি গো,তুমি যে আগেই শুয়ে পড়েছে?
মেজবউ কোনো জবাব না দিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকেন।
কিগো, জবাব দিচ্ছ না যে! শরীর-টরীর খারাপ হয়নি তো?
না, তবুও মেজবউ কোনো জবাব দেন না।
হাত জোড় করে ঠাকুর-দেবতার ছবিতে প্রণাম করতে করতেই মেজবাবুর কানে আসে–রক্ষিতার ছেলের আবার ভক্তি! ঢং দেখে আর বাঁচি না।
কোনো মতে ঠাকুর-দেবতার ছবিতে প্রণাম করেই মেজবাবু স্ত্রীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কী বললে?
কী বললাম, শুনতে পাওনি?
আবার একটু শুনি।
অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়েই মেজবউ জবাব দেন, বলছিলাম, রক্ষিতার ছেলের আবার ভক্তি!
মেজবাবু একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কে আবার রক্ষিতার ছেলে?
ন্যাকামি করো না। সব জেনে গেছি। এখন আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করে লাভ নেই। মেজবউ এক নিঃশ্বাসে বলে যায়।
মেজবাবু তখনো ঠিক বুঝতে পারেন না। বলেন, তোমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
এবার মেজবউ উঠে বসে স্বামীর মুখের সামনে মুখ নিয়ে বলেন, কেন আমার এই সর্বনাশ করলে সেই কথার জবাব দাও। কী ভেবেছ তোমরা? আমিও কি তোমাদের মতো রক্ষিতার পেটে জন্মেছি?
কথাটা শুনেই মেজবাবুর মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। উনি ঠাস করে স্ত্রীর গালে একটা চড় মেরে বলেন, হারামজাদী, আমি রক্ষিতার ছেলে! দূর হয়ে যাও এ বাড়ি থেকে।
.
ব্যস! দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। চিৎকার-চেঁচামেচি-কান্নাকাটি শুনে প্রথমে বাড়ির বউরা, পরে সেজবাবু থেকে শুরু করে ছোটবাবু পর্যন্ত ছুটে আসেন। কে কার কথা শোনে? মেজবউ তারস্বরে চিৎকার করে শ্বশুর-শাশুড়ির নামে যা তা বলে যান। বাড়ির বউরা অবাক হয়ে এক-ওর মুখের দিকে তাকায়। বড়বউ তো হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মেজ, তুই একি দুঃসংবাদ শোনালি রে?
ঠিক এমন সময় বড়বাবু হাজির হতেই সবাই চুপ। বনবিহারী দত্ত জীবিত থাকার সময়ও এ বাড়িতে বড়বাবুর মর্যাদা ছিল অনেক বেশি। বনবিহারী দত্তকে সবাই সমীহ করতেন, ভয় করতেন, কিন্তু বড়বাবুকে সবাই ভালবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। শুধু এ বাড়ির ছেলেমেয়েবউ-ঝিরাই না, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীরাও জানেন, বড়বাবু। মিথ্যা কথা বলেন না, আজেবাজে কথাও বলেন না। তাছাড়া ওঁর মতো ব্যক্তিত্ব কজনের হয়? কোনো আলতু-ফালতু আজেবাজে ব্যপারেও উনি কখনই নাক গলান না। তাইতো ওঁকে দেখেই একমুহূর্তে সব চিৎকার-চেঁচামিচি-কান্নাকাটি থেমে গেল। বড়বাবু কোন ভূমিকা না করেই বলেন, মেজবৌমা, আমাদের মা, বাবার রক্ষিতা ছিলেন না, তিনি তাঁর বিবাহিত স্ত্রীই ছিলেন। বাবার রক্ষিতা ছিল ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে এ সংসারের কোনো সম্পর্ক কোনো কালেই ছিল না, এখনও নেই।
উনি না থেমেই বলে যান, যদি বাবার ঐ রক্ষিতা সম্পর্কে কিছু জানতে চাও, তাহলে কাল সকালে তোমরা সবাই আমার ঘরে এসো।
এবার উনি একবার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, আমি জীবিত থাকতে তোমাদের কারুর কোনো অমর্যাদা হতে আমি দেব না। এখন শুতে যাও। অনেক রাত হয়েছে।
হ্যাঁ, পরের দিন সকালেই বড়বাবু বাড়ির সব বউ আর ভাইদের নিয়ে বসেছিলেন। বলেছিলেন, এ সংসারে অনেক কিছু জেনেও জানতে নেই; বিশেষ করে যাঁরা গুরুজন আর স্নেহভাজন। তাই মানিকতলার জগত্তারিণী দাসী বাবার রক্ষিতা ছিলেন জেনেও আমি ঐ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাইনি।
বড়বাবু একটু থেমে বলেন, তাছাড়া আমার কোনো প্রয়োজনও হয়নি। প্রয়োজন হতো, যদি বাবা আমার মা ও আমাদের প্রতি কর্তব্য পালন না করে শুধু তাঁর রক্ষিতার জন্যই সবকিছু..
সেজবাবু হঠাৎ বললেন, বাবা কর্তব্যপালন করেননি, এ অপবাদ কেউ দিতে পারবে না।
বড়বউ বললেন, সে কথা একশবার সত্যি।
বড় বাবু এবার বললেন, বাবা আমাদের জন্য যে বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য, বিষয় সম্পত্তি ও নগদ টাকা রেখে গেছেন, তার খবর তোমরা সবাই জানো। তবে হ্যাঁ, বাবা ঐ জগত্তারিণী দাসীর জন্যও বেশ কিছু টাকা রেখে গেছেন এবং সে টাকাও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি করে দেননি।
