একটু ইতস্ততঃ করে বলে, কিছু মনে করবেন না শান্তি দেবী; কিন্তু আপনার কি মনে হয় এর ভিতর আর একটি মেয়ে আছে?
-মনে করার কি আছে? বন্ধুভাবেই তো আপনার সাহায্য চাইছি। হ্যাঁ, তাও হতে পারে।
আপনি কিছুই টের পাননি?
–না। এ কি টের পাওয়া যায়?
আবার কিছুটা চুপচাপ। শেষে উনি আবার বলেন, –ও যা একরোখা, ওর সিদ্ধান্ত বদলাবে বলে মনে হয় না। আমি…মানে, আমি ব্যাপারটা ঠিকমত বুঝে নিতে চাই। আসলে কী ঘটেছে? কেন এমনভাবে সে চলে গেল? যদি অন্য কোন মেয়ের মোহেই। চলে গিয়ে থাকে, তাহলে একদিন সে নাটকের শেষ হবে। ওকে তাহলে বলবেন…আমি ওর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করব না কোনোদিন। সে যদি ফিরে আসতে চায়, আজ না হোক দু-দশ বছর পরেও, তবু তার জন্য আমার দরজা খোলা থাকবে। আর অন্য কোন মেয়ে যদি এর ভিতর না থাকে, তাহলে তার সব ছেড়ে যাবার আর কি কারণ থাকতে পারে তাও তো বুঝি না–
–ওর সঙ্গে কোন ঝগড়াঝাটি হয়নি তো?
–তেমন কিছু নয়। অন্তত মাসখানেকের ভিতর নয়।
কিন্তু আপনার ফুলদার হিসাব মত সে মাসকতক গোপনে কিছু একটা করত। সেটা কী হতে পারে?
-ফুলদার ধারণা অন্য কোন মেয়ের সঙ্গে ওর ইয়ে ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে আজ চার পাঁচ দিনের মধ্যে কি আমরা খবর পেতাম না? ঢাকা শহর কলকাতা নয়, একটি মেয়ে খোয়া গেলে সে খবর কি চাপা থাকত? তারও বাপ-মা কি খোঁজ নিতে আসত না?
আবার ইতস্ততঃ করে বলি, –ওর সঙ্গে দেখা হলে কি বলব?
কি আবার বলবেন আসল ব্যাপারটা শুধু জেনে আসবেন।
–সে যদি ফিরে আসতে শেষ পর্যন্ত না চায় তাহলে বাবলুকে কোন চিঠি লিখতে বলব কি?
জবাব দিতে দেরী হল শান্তি দেবীর। আবার দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা কামড়ে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। অতি কষ্টে চোখের জলকে ঠেকিয়ে রেখেছেন উনি। তারপর বললেন, –ছেলে-মেয়ে আমার একার নয়। কিন্তু আমার হয়ে সে অনুরোধও আপনি করবেন না। সত্য কথাটা শুধু আমি জানতে চাই। বাবলু আমার বুঝমান ছেলে সত্য কথাই বলব তাকে আমি, তা সে যতই রূঢ় হোক, যতই কদর্য হোক! মিটিকেও বলতে হবে হয়তো কিছুদিন পরে। যখন তার বোঝবার বয়স হবে।
আবার মনে পড়ল ফুলদার সেই অনবদ্য উক্তিটি–ছেলেমেয়ে বয়ে যায় মায়ের আশকারাতে।
আর কিছু বলার নেই তো? আমি তাহলে যাই?
একটু বসুন।
শান্তি দেবী হুক থেকে সেতারটা পেড়ে আনেন। আমার হাতে সেটা দিয়ে বলেন, — এটাও নিয়ে যান। ওর সখের জিনিস।
অদ্ভুত ক্ষমতা ভদ্রমহিলার। বয়সে ছোট আর সম্পর্কে বন্ধুপত্নী না হলে আমি সেদিন তাঁকে প্রণাম করতাম।
আবার নিজে থেকেই বলেন, –ও হো, আপনি তো সাইকেলে চেপে এসেছেন। আচ্ছা থাক, আমি পাঠিবে দেব। কবে যাচ্ছেন আপনি?
বললাম, কালই।
.
০৮.
কলকাতায় পৌঁছে টাওয়ার হোটেলে দেখা করতে গেলাম গগ্যার সঙ্গে। হোটেলে কিন্তু তার দেখা পেলাম না। হোটেলের ম্যানেজার একটি ঠিকানা দিলেন আমার হাতে। বললেন, গগন পাল এই ঠিকানাতে আছে। তার নামে কোন চিঠি এলে এ ঠিকানাতে পাঠিয়ে দিতে বলেছে।
যেন নিতান্ত কথার ছলে কথা বলছি, বললাম, -ও তো প্রথমে এখানেই সস্ত্রীক এসে উঠেছিল, তাই নয়?
না। ও এখানে ওঠেনি। গগনকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। একদিন এসে এই ঠিকানা দিয়ে বলে গেল চিঠিপত্র এলে এই ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে। এখানে ওঠেনি।
অগত্যা ঠিকানা খুঁজে কলকাতার একেবারে উত্তর প্রান্তে এসে হাজির হলাম। বরাহনগরের একটি চটকলের বস্তীতে। একটি বেলা গেল ঘর খুঁজে বার । করতে। অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেল। খোলার চালের বস্তী। চতুর্দিকে নোংরা আর কাদা। অধিকাংশই হিন্দুস্থানী মজদূর। তারই একটা খোপে নাকি বাস করে গগন পাল। ঘরটা দেখিয়ে দিল একজন ভাজিওয়ালা। বলে, নয়া আদমি তো? ইয়া পাট্টা জোয়ান? বাঙ্গালিবাবু? হাঁ হাঁ, পালমোশা! যাইয়ে না সিধা। সতের নম্বর কামরা।
বলি, –শেঠজি, বাঙ্গালিবাবু কি একা আছে, না ওর বিবিও আছে?
শেঠজি সম্বোধনে ভাজিওয়ালা কিছু খুশি হল। বললে, রামজি জানে বাবুমোশা। অগর বিবি না লিয়ে এসে থাকে তবে এতোদিনে জুটে গেছে লিসচয়! ঐসান পাট্টা জোয়ান কি সাত রাত একা একা থাকবে?
–কেকরাকে বাত করতে হো ভিখ? প্রশ্ন করে পানওয়ালা।
–ঐ বাঙ্গালিবাবু রে! পালমোশা।
–নেহি নেহি, বিবি-উবি কুছ নেহি আছে যাইয়ে না সিধা।
এবার ভরসা করে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি খুপরি। খোলার চাল, বাঁশের খুঁটি, হেঁচা বাঁশের দেওয়াল আর মাটির মেঝে। বারোঘরের এক উঠান। সতের নম্বরের দরজা খোলাই ছিল। একটা ছোট চারপাইতে চিৎ হয়ে পড়ে ছিল গগন। খালি গা, পরনে একখানি লুঙ্গি। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে। আমাকে দেখে উঠে বসে। হঠাৎ দপ্ করে জ্বলে ওঠে তার চোখ দুটো। তারপর কি ভেবে হেসে ফেলে। গামছা দিয়ে বগলদুটো মুছে নিয়ে বলে, দূত অবধ্য! বল, শুনি।
আমি চুপচাপ বসে পড়ি ওর খাটিয়ার একপ্রান্তে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে একটা ধরাই। ওকে দিই না; কিন্তু প্যাকেটটা পকেটেও ভরি না। রাখি ওর নাগালের মধ্যে। গগ্যা নেয় না তা থেকে। পুনরায় বলে, –শুরু কর। আমি প্রস্তুত।
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে আমি বলি, আমি তো বলতে আসিনি গগন। আমি শুনতে এসেছি।
–এই কথা? কিন্তু আমার যা বক্তব্য তা তো চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছি। সে চিঠি কি পায়নি তোমার বন্ধুপত্নী?
