গ্রেট তাহিতির পূর্ব-উপকূলে তখন আত্তাই-এর বাস। একদিন সন্ধ্যাবেলা ঘোড়ায় চেপে একজন বিদেশী তার কুটিরে এসে উপস্থিত। দৈত্যের মত প্রকাণ্ড চেহারা, একমাথা লম্বা লম্বা চুল, একমুখ দাড়ি, সর্বাঙ্গ ধূলায় ভরা। ঘোড়ার মুখে সাদা ফেনা। অনেকটা দৌড়ে এসেছে বোধহয়। দাড়িওয়ালা লোকটা বললে, সুন্দরী, আজ রাতটা তোমার বাসায় থাকতে দেবে?
আত্তাই-এর বয়স তখন চল্লিশের উপর। সুন্দরী সম্বোধনে সে গলে গেল। বললে, একটা রাত বই তো নয়। তা বেশ, থাক। তা তুমি কে? কোথা থেকে আসছ?
লোকটা বললে, আমি বিদেশী। জাহাজের খালাসী ছিলাম। তোমাদের দেশটা ভাল লেগে গেল। তাই এখানেই রয়ে গেছি।
-কি কর তুমি?
ছবি আঁকি আর বাঁশী বাজাই।
আত্তাই অবাক হয়ে যায়। লোকটা তার ঘোড়ার পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে রাখে।
–তা এখন ঘোড়ায় চেপে কোথায় চলেছ?
লোকটা হাসতে হাসতে বলে, রাজপুত্রেরা ঘোড়ায় চেপে কোথায় যায়? রাজকন্যার সন্ধানে। অনেক বয়স হয়ে গেছে তো। তাই আমি বউ খুঁজতে বেরিয়েছি।
আত্তাই বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে। লোকটা নিঃসন্দেহে বিদেশী। চেহারাটাই তার প্রমাণ। তাছাড়া কথা বলছে ভাঙা ভাঙা তাহিতিতে। আহা বেচারি। এত বয়সেও বউ যোগাড় করতে পারেনি। বললে, –তা বউ খুঁজতে এত ঘুরে মরছ কেন? আমার একটা মেয়ে আছে। তাকেই বিয়ে কর না।
লোকটা হা-হা করে হেসে উঠল। খড়ের বিছানায় সে তার কম্বলটা বিছিয়ে শোবার উপক্রম করছিল। বললে, –তোমার মেয়ে? আমার বয়স কত জান? তুমি বিয়ে করতে রাজী হলে না হয় ভেবে দেখা যেত। তুমি সুন্দর দেখতে
আত্তাই লজ্জা পেল না। বললে, না গো, আমার মরদ আছে। তা আমার মেয়েও বেশ সুন্দরী।
বটে বটে! কই, ডাক দেখি তোমার মেয়েকে!
আত্তাই তার মেয়েকে নিয়ে এল। বছর চোদ্দ বয়স। ডাগর দুটি চোখ মেলে সে অদ্ভুতদর্শন আগন্তুককে দেখতে থাকে। চোদ্দ বছর বয়স হলে কি হবে, মেয়েটি বাড়ন্ত গড়নের। বিষুব অঞ্চলের প্রখর রৌদ্রে চৌদ্দটি বসন্তেই কিশোরী মেয়েকে এনে দেয়। নারীত্বের মহিমা। লোকটা আপনমনে নিজের ভাষায় কি যেন বললে। ভাষাটা অজানা। আত্তাই বলে, কি বলছ?
বলছি তোমার মেয়েটি খাসা। তোমার নাম কি গো মেয়ে?
–য়ামায়া।
লোকটা য়ামায়াকে আপাদমস্তক ভাল করে দেখল। তাহিতি দ্বীপের যাবতীয় পলিনেশিয়ান মেয়ের মতই নাকটি চ্যাপ্টা, ঠোঁট পুরু, গভীর কালো দুটি ব্যঞ্জনাময় চোখে অবাক চাহনি। কটিদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত পিঙ্গল চুল, মসৃণ কোমল গাত্রচর্ম, সুশ্রোণী। ঊর্ধ্বাঙ্গ নিরাবরণ, যৌবনের যুগ্ম পূর্ণকুম্ভ প্রমাণ দেয় মেয়েটি কিশোরী নয়। বন্যমার্জারির মত এস্তা।
লোকটা বললে, আমাকে ভয় করছে?
মাথা নেড়ে মেয়েটি বলে, না!
আমাকে বিয়ে করবে?
য়ামায়া মাথা নেড়ে সায় দেয়।
-আমাকে ফেলে পালাবে না তো?
না।
লোকটা আত্তাইকে বললে, কনে আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু ও কি এই বুড়ো বরকে বরাবর বরদাস্ত করতে পারবে? জোয়ান তাহিতির ছেলে ইশারায় ওকে ডাক দিলেই আমাকে ছেড়ে পালাবে।
আত্তাই বলে, –আমার মেয়ে তেমন নয় গো। আর তোমাকে ও সহ্য করতে পারবে কিনা সেটা আজ রাতেই পরখ করে দেখতে পার। যদি তোমার ওকে পছন্দ না হয়, অথবা ও তোমাকে সইতে না পারে তবে বিয়ে কর না।
লোকটা বোধহয় তাহিতিতে নতুন এসেছে। এমন সহজ হিসাবটা বুঝতে তার বেশ সময় লাগল। শেষমেষ সে রাজী হয়ে যায়। আত্তাই বলে, –তোমার নাম কি গো? কি বলে ডাকব?
–আমার নাম পল গগ্যা।
রাত্রে ওরা তিনজনে একসঙ্গে খেল। আত্তাই-এর মরদ কোথায় যেন গেছে। সে বেচারি পাশের ঘরে একাই শুতে গেল। য়ামায়া কাজকর্ম সেরে যখন শুতে এল লোকটা তখন বিছানা পেতে বসে বাঁশী বাজাচ্ছে। য়ামায়া অবাক হয়ে গেল সে বাঁশী শুনে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকটা বললে, বউ তার পছন্দ হয়েছে। য়ামায়াও বললে, বর তার মনমতো হয়েছে। ব্যস! পরদিনই বউ নিয়ে লোকটা মারকুয়েশা দ্বীপের দিকে চলে গেছে। তারপর আত্তাই আর জানে না।
মারকুয়েশাস্ একটি দ্বীপ নয়, দ্বীপাবলী; কিন্তু প্রফেসর ম্যাকগ্রেগরী অত সহজে হতাশ হবার পাত্র নন। একটি জেলে-ডিঙি ভাড়া করে তিনি চলে এলেন ঐ দ্বীপে। প্রফেসর প্রথমেই এসেছিলেন ডমেনিক দ্বীপে। এবার আর খোঁজ পেতে অত দেরী হল না। শুনলেন, ঐ দ্বীপের বৃহত্তম গ্রাম আটুয়ানাতে গগ্যা একটা পাতায় ছাওয়া কুটির তৈরী করে তার বউ নিয়ে বাস করত, কিন্তু বছর ছয়েকের মধ্যেই একবার প্রবল সাইক্লোনে ওর বাড়িটি ভেঙে যায়। ঐ সময় তার উপর পুলিসের অত্যাচার হয়। তিন মাসের জন্য জেল খাটতে হয় তাকে। অপরাধ–তাহিতির Le Sourire নামে একটি স্থানীয় পত্রিকায় সে একটি প্রবন্ধ লিখেছিল ঔপনিবেশিক শাসকের দল স্থানীয় তাহিতি দ্বীপবাসীর উপর যে অত্যাচার করে তার প্রতিবাদ করে। জেল থেকে বেরিয়ে গগ্যা দেখে প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ুতে তার বাড়ি ভেঙে গেছে, অথচ গাছতলায় অপেক্ষা করে বসে আছে তার বিয়ে না করা বউ য়ামায়া। গগ্যা নাকি ঐ অরণ্যচারিণীর হাত ধরে আরও গভীর অরণ্যে চলে যায়। কোথায়, তা কেউ জানে না।
চারিদিকে বিষুব-অঞ্চলের ঘন জঙ্গল। সমুদ্র-খাড়ি, পাহাড় আর অরণ্যদূরে দূরে গ্রাম্য জনপদ। সেখানে যারা বাস করে তারা কেউ ইংরাজি জানে না। অধ্যাপক ম্যাকগ্রেগরী এমন বিজন অরণ্যে কেমন করে খুঁজে বার করবেন সেই বিদেশীকে–যার নামটুকু মাত্র জানা আছে! সে কোন্ দেশের মানুষ তা পর্যন্ত জানা নেই। তবু তীক্ষ্ণবুদ্ধি পণ্ডিত মানুষ। দু-দিক থেকে অনুসন্ধান চালালেন। গগ্যার একটা দৈহিক বর্ণনা পাওয়া গেছে তার শাশুড়ীর কাছ থেকে দৈত্যের মত প্রকাণ্ড শরীর, একমাথা কাঁচাপাকা চুল, একবুক দাড়ি। প্রফেসর প্রথমেই বাজারে গিয়ে রঙ-তুলি ক্যানভাসের খোঁজ করলেন। তাহিতিতে বসে কারও ছবি আঁকবার বাসনা হলে সে কোথায় তা সংগ্রহ করতে পারে? নিজেই বের হলেন তার খোঁজে। মাতালকে যদি খুঁজে বার করতে চাওসব কটা শুড়িখানায় তালাস কর। এদিক থেকে সহজেই সন্ধান পাওয়া গেল। শহরে একটি মাত্র দোকান আছে যেখানে রঙ-তুলি পাওয়া যেতে পারে। দোকানদার স্বীকার করলা, পল গগ্যা নামে একজন বিদেশী লোক তার কাছ থেকে আঁকার সরঞ্জাম এককালে কিনত বটে। সাত-আট বছদ্র আগে। লোকটার সঙ্গে তার আলাপও হয়েছিল। কী একটা প্রবন্ধ লেখার অপরাধে তার জেল হয়ে যায়। জেল থেকে বেরিয়ে সে কোথায় যেন চলে যায়। এর বেশি সে কিছু জানে না।
