আহারের অবকাশে বলি, একটা কথা আমাকে বুঝিয়ে দিন তো। ঐ ছবিখানা আপনি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিনলেন; কিন্তু ওতে আছেটা কি? আমি যে ওটা দশ টাকায় নিলামে কিনেছিলাম!
প্রফেসর অনভ্যস্ত হাতে ফুলকো লুচি ভাঙতে ভাঙতে বলেন, –এ একটি অনবদ্য ছবি! একেবারে নতুন স্টাইল। মৃত বেড়ালছানাটা হচ্ছে ঐ বস্তী-জীবনের অতীত। এভাবেই ঐ বস্তীর মানুষ যুগে যুগে মরেছে; আর ওদের মৃতদেহ মিল-মালিকের দল অবজ্ঞায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে আঁস্তাকুড়ে। উপরের ঐ নিঃসঙ্গ চিলটা হচ্ছে বর্তমান শিল্পী স্বয়ং। বার্ডস্ আই ভিয়ুতে তিনি ঐ অবক্ষয়ী বস্তী-জীবনকে দেখছেন। তিনি ঐ জীবনের ভাগীদার নন, আছেন অনেক অনেক উঁচুতে; কিন্তু এ জীবনের সামগ্রিক অবক্ষয়ীরূপে গরুড়াবলোকনে প্রত্যক্ষ করছেন তিনি। শিল্পী হতাশ হননি। রক্তের মত জমাট কাদার দটাই এ বীর শেষ কথা নয় তিনি দেখেছেন ঐ নগ্ন শিশু ভোলানাথকেও! আবহমান কালের লজ্জা-ঘৃণা-ভয়ের নির্মোকও টান মেরে খুলে ফেলেছে–তাই ও উলঙ্গ। ওর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দুর্বল, ও শিশু, কিন্তু ওর মধ্যেই আছে বটগাছের বীজ! ওর প্রাণে তারুণ্যের সবুজাভা–ও নগ্ন বিদ্রোহী। ঐ শিশু ভোলানাথই কালে হবে রুদ্র ভৈরব! ইটস্ এ মাস্টার পীস্! ভরে রাখার উপযুক্ত।
কী আশ্চর্য! কী অপরিসীম আশ্চর্য! কালোহয়ং নিরবধি, বিপুলা পৃথ্বী। উপেক্ষিত নগণ্য গেয়ো যোগী মদের ঝেকে যে কথা বলেছিল বটুককে–যে কথা আমরা পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম তারই অনুরণন আজ ত্রিশ বছর পরে শুনলাম সাগরপারের এক আর্ট কনৌসারের মুখে।
অধ্যাপক প্রশ্ন করেন, এ ছবিটি কোথায় বসে শিল্পী এঁকেছিলেন ধারণা করতে পারেন?
ধারণা কেন? জায়গাটা আমি চিনি। বরানগরের একটা কুলিবস্তী।
অধ্যাপক ম্যাকগ্রেগরী তৎক্ষণাৎ উঠে পড়েন। বলেন, তাহলে আর দেরী নয়। চলুন, এখনই সেখান থেকে ঘুরে আসি।
–সে কি? আপনার গল্পটা যে শোনা হয়নি।
-সেটা ফিরে এসে বলব। সকালের আলোতে ঐ বস্তীর কয়েকটা ফটো নিতে চাই। বেলা বেড়ে গেলে এফেক্টটা থাকবে না।
অগত্যা পাগল অধ্যাপককে নিয়ে এলাম সেই বরানগরের বস্তীতে। বিশ-ত্রিশ বছর পরে এলাম সেখানে। আশপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। নতুন নতুন বাড়ি উঠেছে। রাস্তা পাকা হয়েছে। উদ্বাস্তু কলোনি জেগে উঠছে এখানে-ওখানে। কিন্তু কী আশ্চর্যভারতবর্ষের সেই ট্রাডিশান তবু সমানতালে চলেছে। বস্তীর জীবন আছে অপরিবর্তিত। রাস্তার উপর জমে আছে তেমনি ঘোলা জল, আঁস্তাকুড়ে উপচীয়মান আবর্জনার স্তূপ, পথের উপর বেওয়ারিশ উলঙ্গ শিশুর দল গাড়ির চাকার তলায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ভাজিওয়ালার সেই চিনেবাদামগুলো এই ত্রিশ বছরেও ভাজা শেষ হয়নি । রাস্তার কলে সেদিন যে যুবতী মেয়েটিকে স্নান করতে দেখেছিলাম এ পঁচিশ ত্রিশ বছরেও তার স্নান শেষ হয়নি, তার পীনোদ্ধত যৌবন একটুও টলেনি।
গগন পালের সেই তের নম্বর ছাপরাটা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। এখন সেটা নাকি একটা তীর্থ।
সাহেব দেখে ওরা থতমত খেয়ে যায়। মেয়েরা গায়ের কাপড় সামলায়। বাচ্চাগুলো মায়ের পিছনে আড়াল খোঁজে। সাহেব অনেকগুলি ফটো নিলেন। আমার খুব খারাপ লাগছিল। স্বদেশের এই নিরতিশয় দারিদ্র্যের ছবি মার্কিন দেশের আইভরি ফিনিশ আর্ট পেপারে ছাপা হবে। কিন্তু বাধাও দিতে পারলাম না।
অধ্যাপক ম্যাকগ্রেগরীর কাছে শুনেছিলাম গগন পালের শেষ জীবনের ইতিকথা :
বছর তিনেক আগের কথা। একজন চিত্র ব্যবসায়ী ওঁকে খানকতক ছবি এনে দেখায়। বলে, এগুলি সে নামমাত্র মূল্যে কিনেছে একজন স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ান নাবিকের কাছে। ছবিগুলো দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন ম্যাকগ্রেগরী। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন নাবিক সেগুলি সংগ্রহ করেছিল প্রশান্ত মহাসাগরের তাহিতি দ্বীপে। চিত্রকরের নাম পল গগ্যা। সে তাহিতির লোক নয়, বিদেশী। ছবি আঁকত ঐ একান্ত দ্বীপে। অধ্যাপক ম্যাকগ্রেগরী চিত্রকর সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছিলেন তার ভাষ্য দিয়ে ঐ ছবি কখানি ছাপালেন আমেরিকার একটি বিখ্যাত আর্ট-ম্যাগাজিনে। হৈ-হৈ পড়ে গেল তাতে। পত্র পত্রিকায় চিঠিপত্র লেখালেখি শুরু হয়ে গেল। কে এই আর্টিস্ট? তার আর কি ছবি আছে? যে কখানি ছবি সংগৃহীত হয়েছিল সেগুলি আশাতীত মূল্যে বিক্রয় হয়ে গেল। ম্যাকগ্রেগরী সেবার দূর প্রাচ্যে আসবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ইউরোপ ঘুরে না এসে উনি প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এলেন। উদ্দেশ্য ঐ তাহিতি দ্বীপের রাজধানী পাপীত্তিতে নেমে অজ্ঞাত চিত্রকরের সম্বন্ধে সন্ধান করা।
প্রথম দু-চারদিন কোন সংবাদ পান না। পল গগ্যা নামে কোন বিদেশীর খবর কেউ দিতে পারে না। শেষে একটি হোটেলের একজন বার-মেড বললে, –গগ্যা? সেই দৈত্যের মত লোকটা? একমুখ দাড়ি আর একমাথা চুল?
অধ্যাপক বলেন, –তা জানি না, কিন্তু লোকটা ছবি আঁকে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, ছবি আঁকে আর বাঁশী বাজায়। তবে সে-ই হবে। সে তো এখানে থাকে । বিয়ে করার পর সে মারকুয়েশাস দ্বীপে চলে গেছে।
বিয়ে করেছে? এখানে? কাকে?
–য়ামায়াকে। সে ছিল আত্তাই-এর মেয়ে। আত্তাই এখনও বেঁছে আছে! সে জানে।
মায়ের সন্ধান পেলেন অধ্যাপক। হ্যাঁ, সে পল গগ্যাকে চেনে। বিদেশী। কোন্ দেশের মানুষ জানে না। একদিন জাহাজে চেপে এসেছিল। খালাসীর পোশাকে। জাহাজে সে নাকি ইঞ্জিন-ঘরে কয়লা ঢালত। জাহাজটা এ বন্দরে দিন তিনেক ছিল। লোকটা পালায়। সে নাকি প্রথম দর্শনেই এই দ্বীপের প্রেমে পড়ে যায়। জাহাজ বন্দর ছেড়ে যাবার দিনে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দৈত্যের মত প্রকাণ্ড জোয়ান। বছর পঞ্চাশ বয়স, কিন্তু খাটতে পারত ভূতের মত। লোকটা ছবি আঁকত আর বাঁশী বাজাত। দিনের বেলা ডকে কুলি-মজদুরের কাজ করত। গগ্যার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা দিল আত্তাই?
