আনন্দবাবু বললেন–ছিঃ, মাস্টারকে বলতে নেই ওসব।
–মাস্টার না হাতি!
–পিলটু!
পিসিমা এসে ঢুকলেন। আনন্দবাবু তক্ষুনি কাগজটা তুলে নিলেন–পড়তে লাগলেন এক মনে। আর পিলটু দাঁড়িয়ে রইল কাঠ হয়ে।
চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে কড়া চোখে পিসিমা কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন পিলটুর দিকে।
–সকাল থেকেই বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছ? পড়াশুনো তোমার কিছু হবে?
–হবে পিসিমা। রাত্তির হলে।
–সে তো দেখতেই পাচ্ছি কদিন ধরে। চলো এখন।
–কোথায়?
–তোমার মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে আলাপ করবে।
করুণ চোখে পিলটু একবার পিসেমশাইয়ের দিকে তাকাল। পিসেমশাই একবার তাকালেন মাত্র। তারপর কাঁচপোকা যেমন করে তেলাপোকাকে টেনে নিয়ে যায়–তেমনি করে পিসিমার পিছন পিছন প্রস্থান করল পিলটু।
আনন্দবাবু কেবল বলতে পারলেন–বেচারা!
কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটল ঘন্টা দেড়েক পরেই।
পিলটু তখন খগেনের পাল্লায় পড়েছে। আর খগেন তাকে জ্ঞান দান করছে প্রাণপণে।
–বিদ্যেটা পরে, আগে আত্মার উন্নতি। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, তোমার আত্মা অত্যন্ত ছটফটে। তা হলে তো চলবে না। অশান্ত আত্মা হচ্ছে জলের মতো তরল, তাকে আইসক্রিমের মতো জমিয়ে ফেলা দরকার। আর আইসক্রিম…ও কী? কী দেখছ ওদিকে?
–একটা হলদে পাখি।
–না, হলদে পাখি নয়। আত্মা হচ্ছে তা হলে আইসক্রিম। আর—
–আমি আইসক্রিম খাব।
–শার্ট আপ–খগেন চটে গিয়ে পিলটুর কান ধরে মোচড় দিল একটা–খাওয়ার কথা পরে। এখন শোনো। আইসক্রিম করে কী দিয়ে? বরফ। আত্মাকে জমাতেও বরফ চাই। সে বরফ কী? আধ্যাত্মিক ব্যায়াম। বুঝেছ?
রাগে পিলটুর সর্বাঙ্গ জ্বলছিল। পিসেমশাইয়ের কাছে আসবার পর থেকে কেউ তার গায়ে কখনও হাত দেয়নি। খগেনের কানমলা খেয়ে চোখ ফেটে জল আসছিল তার।
খগেন বলল–বোঝোনি? আচ্ছা, বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই যে কাঁকড়া বিছের মতো হাত-পা ছড়িয়ে দিলুম একে বলে বৃশ্চিকাসন।বলতে বলতে নিচু হয়ে পিছনের একটা পা লেজের মতো উপরে তুলে খ্যাঁক করে লাফ দিল খগেন–এর নাম মর্কটাসন–
কিন্তু পিলটু চক্রবর্তী আর অপেক্ষা করল না। এয়ার গান তুলে খগেনের পিঠের দিকে তাকালে।
খ্যাঁক খ্যাঁক করে আর একবার মর্কটের মতো লাফাল খগেন। বলতে লাগল–এই আসন যদি ঠিকমতো করা যায়–
–খটাস—
এয়ার গানের গুলি এসে লাগল খগেনের পিঠে।
–বাপরে—
এবার আর মর্কট লাফ নয়–একেবারে সমুদ্রলঙ্ঘন লক্ষ দিল খগেন। আর সেই সুযোগে তীরবেগে বন্দুক কাঁধে করে বনের মধ্যে উধাও হয়ে গেল পিলটু।
.
চার – ঝড়ের কালো মেঘ
আনন্দবাবুর একটু ঝিমুনি এসেছিল।
স্বপ্ন দেখছিলেন, খগেন রক্তবস্ত্র পরে একটা খাঁড়া হাতে করে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বলছে—হুঁ—হুঁ–মুরগিতে কুলোবে না, নরমাংস খাব!
–দোহাই বাপু, আমাকে খেয়ো না–চেঁচিয়ে আনন্দবাবু এই কথা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কে যেন ডাকল : বাবু! চোখ মেলে আনন্দবাবু দেখলেন, গোপাল।
–এগুলো সব আপনার ঘরে থাকবে। পিলটুবাবুর বন্দুক আর টোটা।
–এখানে থাকবে কেন?–আনন্দবাবু আশ্চর্য হলেন।
–গিন্নীমা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আনন্দবাবু বিরক্ত হয়ে উঠলেন–আহা-হা, ছেলেমানুষ! ওরটা অমন করে কেড়ে নেওয়া কেন! ভারি অন্যায়!
–সেসব গিন্নীমা জানেন।
বলতে বলতেই পিলটুর পিসিমা এসে ঢুকলেন। গোপাল এক পাশে সরে দাঁড়াল।
আনন্দবাবু বললেন–তুমি পিলটুর বন্দুক—
পিলটুর পিসিমা ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন–সেই কথাই বলতে এসেছি। আদর দিয়ে মাথাটা তুমি খেয়ে দিয়েছ একেবারে। একদম গোল্লায় পাঠিয়েছ।
–কাকে? খগেনকে?
–খগেন গোল্লায় যাবে কেন? খাসা ছেলে। তার মাথা খাবারই বা তুমি কে? আমি পিলটুর কথা বলছি।
–অঃ!
–জানো, পিলটু কী করেছে?
–কী?
–এয়ার গান দিয়ে খগেনের পিঠে গুলি করেছে।
–কী সর্বনাশ!–আনন্দবাবু আঁতকে উঠলেন।
ধিক্কার-ভরা গলায় পিলটুর পিসিমা বলে চললেন–খগেন ওকে আধ্যাত্মিক ব্যায়াম শেখাচ্ছিল, সেই ফাঁকে এই কাণ্ড। খগেনের সঙ্গে যখন ওর আলাপ করিয়ে দিই, তখনই ওর চোখমুখের চেহারা দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল। একেবারে বাঁদর হয়ে গেছে ছেলেটা। রমেনকে কী বলবে শুনি?
আনন্দবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন।
–যাই হোক, পিলটুর ব্যবস্থা আমি করছি। আপাতত এই টোটা আর বন্দুক জমা রইল তোমার কাছে। খবরদার, পিলটুর হাতে যেন না যায়। খেয়াল থাকবে?
–থাকবে।
গিন্নী ঘর কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বন্দুকটার দিকে কিছুক্ষণ করুণ চোখে চেয়ে রইলেন আনন্দবাবু। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর। বেচারি পিলটু।
গোপাল তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে আনন্দবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন–ছেলেবেলায় কখনও এয়ার গান ছুঁড়েছিস গোপাল?
–এজ্ঞে ছুঁড়িছি।
–পেলি কোথায়?
–এজ্ঞে, গাঁয়ের জমিদারের ছেলের একটা ছেলে। তা তিনি মোটে তাক করতে পারত না। আমি তেনার বন্দুক নিয়ে দনাদন শালিক পাখি, কাঠবেড়ালী এই সব মেরে দিতাম।
–আমারও বন্দুক ছিল। নিখুঁত তাক ছিল আমার। কুড়ি হাত দূর থেকে আরশোলা মারতে পারতুম। সবাই বলত, হ্যাঁ, হাত বটে খোকনের।
–আমারও খুব তাক ছিল এজ্ঞে। গোপাল জবাব দিল।
–আমার মতো নয়। গোপাল কী বলতে যাচ্ছিল, দূর থেকে গিন্নীর ডাক এল-গোপাল-গোপাল
–যাই এজ্ঞে, মা-ঠান ডাকছেন।
বন্দুকটা কোলে করে আনন্দবাবু বসে রইলেন কিছুক্ষণ। হঠাৎ চোখে পড়ল, দরজার বাইরে কাতরভাবে পিলটু দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে।
