.
তিন – খগেনের আগমন
কালী গো, কেন ন্যাংটা ফেরো,
শ্মশানে মশানে ফেরো–
সকাল বেলায় বাইরের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন আনন্দবাবু। সবে চা খেয়েছেন, মুখে গড়গড়ার নল–মেজাজটা বেশ খুশিই আছে আপাতত। এমন কি, একটু আগেই বাড়ির সামনে ঘটঘট আওয়াজ করে যে একটা মোটর সাইকেল এসে থেমেছে, সেটা। পর্যন্ত শুনতে পাননি। কিন্তু বিকট ওই গানের শব্দটা তাঁর কানের কাছে বোমার আওয়াজের মতো ফেটে পড়ল।
তাকিয়ে দেখলেন–খগেন!
একেবারে নির্ভুলভাবে খগেন–আদি এবং অকৃত্রিম! গায়ে ধুসো একটা গলাবন্ধ কোট, মুখভর্তি গোঁফদাড়ি, কপালে সিঁদুরের ফোঁটা, ষাঁড়ের মতো এক বিরাট জোয়ান। তারই গলা থেকে বেরুচ্ছে এই রাসভরাগিণী–কালী গো, কেন ন্যাংটা ফেরো–
যেন ভূত দেখেছেন, এমনি ভাবে চেয়ে রইলেন বেচারি আনন্দবাবু।
আমাকে চিনলেন না? ঝাঁটা গোঁফের ভেতর থেকে সারি সারি লাউয়ের বিচির মতো দাঁত বের করল খগেন–আমি খগেন। খগেন বটব্যাল।
–বিলক্ষণ! তোমাকে না চিনে উপায় আছে?
–আনন্দবাবুর মুখোনা হাঁড়ির মতো দেখাল।
–আমি আসাতে আপনি নিশ্চয় খুব খুশি হয়েছেন?–খুশি হওয়ার কারণ দেখছি না।
–দেখছেন না?–খগেন কিছুমাত্রও দমে গেল না–তা আপনি খুশি না হলেও কিছু আসে যায় না। কাকিমাই আমায় চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি খুশি হবেন।
–অঃ।
খগেন ঘড়ঘড় করে একটা চেয়ার টেনে এনে ধপাৎ করে বসে পড়লকাকিমার চিঠিতেই জানলুম, এখানে আমাকে নাকি দারুণ দরকার। আমি অবশ্য আজকাল কালী সাধনায় মন দিয়েছি, বিষয়-আশয়ের দিকে ফিরে তাকাইনে। তবু কাকিমা ডেকে পাঠিয়েছেন। ভাবলুম, মায়ের ইচ্ছে, তাই এলুম।
–তা বেশ!
খগেন এবার খবরের কাগজটার দিকে তাকাল।
–কী পড়ছেন ওটা? কাগজ? ছছঃ! কেন যে ওসব বাজে জিনিস পড়ে সময় নষ্ট করেন। বরং সকালে উঠে এক মনে মোহ-মুদগর পড়বেন, দেখবেন, চিত্ত পবিত্র হয়ে যাবে। শুনুন–নলিনী দলগত জলমতি তরলং, তদ্বৎ জীবন অতিশয় চপলং–অর্থাৎ বুঝলেন কিনা, পদ্মপাতায় যেমন জল, এই জীবনও তেমনি অত্যন্ত–কী বলে–
আনন্দবাবু বললেন–কিছুই বলে না।
–বলে না? মানে?–খগেন চটে উঠল–আলবাত বলে।
–তা হলে বলে!–আনন্দবাবু কাতর হয়ে উঠলেন–কিন্তু তুমি আর কিছু বোলো না। যেটুকু বলেছ, তাতেই আমার মাথা ঘুরছে।
–ঘুরছে নাকি? খগেন খুশি হল–তা হলে আপনার হবে।
–কী হবে?–আনন্দবাবু চমকে গেলেন।
–জ্ঞান। জ্ঞান যত বাড়তে থাকবে, ততই মাথা ঘুরবে, কান কটকট করবে, দাঁত কনকন করবে, গাঁটে গাঁটে বাত দেখা দেবে বলতে বলতে আনন্দে খগেনের গোফদাঁড়ি সব যেন নাচতে শুরু করে দিল।
উঠে ছুটে পালাবেন কিনা ভাবছিলেন আনন্দবাবু, এমন সময় পিলটুর পিসিমা এসে গেলেন।
–এই যে খগেন। কখন এলি?
–এইমাত্র। কাকাবাবুর সঙ্গে শাস্ত্র আলোচনা করছিলুম।
–আচ্ছা, সে পরে হবে। এখন হাতমুখ ধুয়ে জলখাবার খাবি আয়।
–জলখাবার? দি হোলি মাদার-এর উপাসনা–মানে কালীকীর্তন না করে তো জলস্পর্শ করিনে কাকিমা!
–তবে কালীকীর্তন সেরে নে। আমি তোের খাবারের ব্যবস্থা করি।
–চলো তবে।–খগেন উঠে পড়ল–তবে আমি সামান্যই জলখাবার খেয়ে থাকি। মানে, সকালে ছটা মুরগির ডিম, বারো খানা টোস্ট, চারটে আপেল আর ছটা সন্দেশ হলেই আমার চলবে, কাকিমা।
আনন্দবাবু একটা বিষম খেলেন।
–তুমি কালীভক্ত হয়ে মুরগি খাও?
ঝাঁকড়া দাড়িগোঁফের আড়ালে আবার লাউয়ের বিচি বেরিয়ে এল। মানে, খগেন হাসল।
–আপনি দেখছি শাস্ত্র কিছুই জানেন না, কাকা! সংসারের কোনও জীবকেই ঘৃণা করতে নেই। সব সমান।
–অঃ!
গিন্নী একবার কটমট করে তার দিকে তাকালেন।
–খগেনের সঙ্গে শান্তর নিয়ে তুমি আর তক্কো করে না বাপু। সারাটা জীবন তো চাকরি করলে আর ইংরেজি বই পড়লে। শান্তরের তুমি কী জানো?
–কিছু না! কিছু না!–বলে আনন্দবাবুকে নস্যাৎ করে দিয়ে খগেন তার কাকিমার সঙ্গে কালীকীর্তন গাইতে চলে গেল।
আনন্দবাবু সেই ভাবেই বসে রইলেন। খগেন এসেই তাঁকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। ছটা ডিম, বারোটা টোস্ট, চারটে আপেল আর ছটা সন্দেশ দিয়ে যার প্রাতরাশ শুরু হয়, রাতের বেলা সে মানুষ ধরে খেতে চাইবে এমনি একটা গভীর আশঙ্কা দেখা দিল তাঁর মনে।
কিছুক্ষণ পরেই বন্দুক হাতে পিলটুর প্রবেশ।
–পিসেমশাই?
–কী খবর পিলটু?
–ও লোকটা কে পিসেমশাই? ওই যে মুখভরা দাড়িগোঁফ আর বিকট গলায় গান গাইছে?
আনন্দবাবু চিচি করে বললেন–খগেন।
–কে খগেন?
–ও তোমার পিসিমার মামার শালার মাসতুতো ভাইয়ের কীসের যেন কী হয়। কিন্তু আসলে ও হল খগেন। ভয়ঙ্কর খগেন।
–খগেন কী করে পিসেমশাই?
–তিনবার ব্যারিস্টারি ফেল করে। ক্যাশিয়ার হয়ে দুটো ব্যাঙ্ক ফেল করায়। কালীকীর্তনের নামে বেসুরো গলায় গাঁক গাঁক করে চেঁচায়। গঙ্গাজল দিয়ে মুরগি রাঁধে। আর পিলটুকে পড়ায় আর ব্যায়াম করায়।
শুনে পিলটু দারুণ চমকে উঠল।
–কী বললে? আমাকে পড়াবে আর ব্যায়াম করাবে? এই পুজোর ছুটিতে?
–সেই জন্যেই এসেছেন।
–কক্ষনো না!–পিলটুর গলায় জ্বালাময় প্রতিবাদ–কী অন্যায়। ছুটির মধ্যে পড়তে আমার বয়ে গেছে!
–পড়তেই হবে। তুমি না পড়লেও দেখবে ও তোমায় পড়িয়ে ছাড়বে।
–দেখি, কেমন করে পড়ায়। ভারি বিচ্ছিরি কিন্তু ওই খগেন।
–খুব সম্ভব।
–আর কী বাজে ওর গোঁফ। এমন গোঁফ তো রাখত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা–
