-হ্যাঁ, একেই বলে লিভার! এই তো চাই।
তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লুম তিনজনে। ওদের দুটো লাঠি তো ছিলই। আমার সেই ভাঙা ডালটা কোথায় পড়ে গিয়েছিল, অগত্যা একটা কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে সঙ্গে চললুম।
এবার আর জায়গাটা চিনতে ভুল হল না। এই তো সেই কামরাঙা গাছ। এই তো সেই পাষণ্ড গোবরটা, যেটা আমাকে পিছলে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু গর্তটা? গর্তটা গেল কোথায়?
গর্তের কোনও চিহ্নই নেই। খালি একরাশ ঝোপঝাড়।
ক্যাবলা বললে, কই রে-তোর সে গহুর গেল কোথায়?
-তাই তো!–
টেনিদা বললে, আমি তক্ষুনি বলেছিলুম-প্যালা, জ্বরের ঘোরে তুই খোয়াব দেখেছিস! স্বামী ঘুটঘুটানন্দ হল কিনা দস্যু ঘচাং ফু! পাগল না প্যাঁজফুলুরি।
আমার মাথা ঘুরতে লাগল। সত্যিই কি জ্বরের ঘোরে আমি খোয়াব দেখেছি। তাহলে এখনও গায়ে টনটনে ব্যথা কেন? ওই তো গোবরে আমার পা পেছোনোর দাগ। তাহলে?
ভুতুড়ে কাণ্ড নাকি? পাখি ওড়ে, রসগোল্লা উড়ে যায়, চপ কাটলেট হাওয়া হয়—মানে পেটের মধ্যে; কিন্তু অত বড় গর্তটা যে কখনও উড়ে যেতে পারে—সে তো কখনও শুনিনি।
টেনিদা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললে, তোর গর্ত আমাদের দেখে ভয়ে পালিয়ে গেছে বুঝলি? এই বলেই বীরদর্পে ঝোপের ওপর এক পদাঘাত।
আর সঙ্গে সঙ্গেই ঝোপটায় যেন ভূমিকম্প জাগল। তার চাইতেও বেশি ভূমিকম্প জাগল টেনিদার গায়ে।—আরে আরে বলে চেঁচিয়ে উঠেই ঝোপঝাড় সুদ্ধ টেনিদা মাটির তলায় অদৃশ্য হল। একেবারে সীতার পাতাল প্রবেশের মতো। তলা থেকে শব্দ উঠল—খচ্ খচ্, ধপাস!
ওগুলো তবে ঝোপ নয়? গাছের ডাল কেটে গর্তের মুখটা ঢেকে রেখেছিল?
আমি আর ক্যাবলা কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কী বলব–কী যে করব–কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
সেই মুহূর্তেই গর্তের ভেতর থেকে টেনিদার চিঙ্কার শোনা গেল-ক্যাবলা—প্যালা—
আমরা চেঁচিয়ে জবাব দিলুম, খবর কী টেনিদা?
—একটু লেগেছে, কিন্তু বিশেষ ক্ষতি হয়নি। তোরা শিগগির গর্তের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে ভেতরে নেমে আয়! ভীষণ ব্যাপার এখানে—লোমহর্ষণ কাণ্ড!
শুনে আমাদের লোম খাড়া হয়ে গেল। আমার মনে পড়ল করেঙ্গা ইয়া মরেঙ্গা! আমি তক্ষণাৎ গর্তের মুখে পা দিয়ে নামতে আরম্ভ করলুম ক্যাবলাও আমার পেছনে।
১৪. হাবুল সেনের মৃতদেহ
আমি আর ক্যাবলা টপাটপ নীচে নেমে পড়লুম। নেমেই দেখি, কোথাও কিছু নেই। টেনিদা নয়—গজেশ্বর নয়—স্বামী ঘুটঘুটানন্দর হেঁড়া দাড়ির টুকরোটুকুও নয়।
ব্যাপার কী! ঘচাং ফুঃর দল টেনিদাকেও ভ্যানিশ করে দিয়েছে নাকি?
ক্যাবলা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, টেনিদা তো এখানেই এক্ষুনি পড়ল রে। গেল কোথায়?
আমি এতক্ষণে কিন্তু আবছা আবছা আলোয় সাবধানে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই কাঁকড়াবিছেটাকে খুঁজছিলুম। সেটা আশেপাশে কোথাও ল্যাজ উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কি না কে জানে! তার মোক্ষম ছোবল খেয়ে ওই গুণ্ডা গজেশ্বর কোনওমতে সামলেছে কিন্তু আমাকে কামড়ালে আর দেখতে হচ্ছে না—পটলডাঙার পালাজ্বর-মাকা প্যালারামের সঙ্গে সঙ্গেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি।
ক্যাবলা আমার মাথায় একটা থাবড়া মেরে বললে, এই টেনিদা গেল কোথায়?
—আমি কেমন করে জানব!
ক্যাবলা নাক চুলকে বললে, বড়ী তাজ্জব কী বাত! হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি?
কিন্তু পটলডাঙার টেনিদা—আমাদের জাঁদরেল লিডার—এত সহজেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার পাত্র? তৎক্ষণাৎ কোথেকে আবার টেনিদার অশরীরী চিৎকার : ক্যাবলা—প্যালা—চলে আয় শিগগির! ভীষণ ব্যাপার।
যাব কোথায়! কোন্খান থেকে ডাকছ? এ যে সত্যিই ভুতুড়ে ব্যাপার দেখতে পাচ্ছি। আমার মাথার চুলগুলো সঙ্গে সঙ্গে কড়াং করে দাঁড়িয়ে উঠল।
ক্যাবলা চেঁচিয়ে বললে, টেনিদা, তুমি কোথায়? তোমার টিকির ডগাও যে দেখা যাচ্ছে না!
আবার কোথা থেকে টেনিদার অশরীরী স্বর : আমি একতলায়।
–একতলায় মানে?
টেনিদা এবার দাঁত খিচিয়ে বললে, কানা নাকি? সামনের দেওয়ালে গর্ত দেখতে পাচ্ছিসনে?
আরে—তাই তো! এদিকের পাথরের দেওয়ালে একটা গর্তই তো বটে! কাছে এগিয়ে দেখি, তার সঙ্গে একটা মই লাগানো ভেতর থেকে। যাকে বলে, রহস্যের খাসমহল।
টেনিদা বললে, বেয়ে নেমে আয়। এখানে ভয়াবহ কাণ্ড—লোমহর্ষণ ব্যাপার।
অ্যাঁ!
ক্যাবলাই আগে মই বেয়ে নেমে গেল—পেছনে আমি। সত্যিই তো—একতলাই বটে। যেখানে নামলুম, সেটা একটা লম্বা হলঘরের মতো—কোথেকে আলো আসছে জানি
কিন্তু বেশ পরিষ্কার। তার একদিকে একটা ইটের উনুন—গোটা-দুতিন ভাঙা হাঁড়িকুঁড়ি—এক কোনায় একটা ছাইগাদা আর তার মাঝখানে
টেনিদা হাঁ করে দাঁড়িয়ে। ওধারে হাবুল সেন পড়ে আছে—একেবারে ফ্ল্যাট।
টেনিদা হাবুলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললে, ওই দ্যাখ!
ক্যাবলা বললে, হাবুল!
আমি বললাম, অমন করে আছে কেন?
টেনিদার গলা কাঁপতে লাগল : নিশ্চয় ওকে খুন করে রেখে গেছে!
আমার যে কী হল জানি না। খালি মনে হতে লাগল, ভয়ে একটা কচ্ছপ হয়ে যাচ্ছি। আমার হাত-পা একটু-একটু করে পেটের মধ্যে ঢোকবার চেষ্টা করছে। আমার পিঠের ওপরে যেন শক্ত খোলা তৈরি হচ্ছে একটা। আর একটু পরে গুড়গুড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি একেবারে জলের মধ্যে গিয়ে নামব।
আমি কোনওমতে বলতে পারলাম : ওটা হাবুল সেনের মৃতদেহ!
কথা নেই বার্তা নেই—টেনিদা হঠাৎ ভেউ-ভেউ করে কেঁদে ফেললে : ওরে হাবলা রে! এ কী হল রে! তুই হঠাৎ খামকা এমন করে বেঘোরে মারা গেলি কেন রে! ওরে কলকাতায় গিয়ে তোর দিদিমাকে আমি কী বলে বোঝাব রে! ওরে—কে আর আমাদের এমন করে আলুকাবলি আর ভীমনাগের সন্দেশ খাওয়াবে রে!
