পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখব ভাবছি, সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা নুড়িতে হোঁচট খেয়ে জলের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়লুম। আবার সেই অট্টহাসি—আর কে যেন বললে উঠে আয় প্যালা, খুব হয়েছে! এর পরে নির্ঘাত ডবল-নিউমোনিয়া হয়ে মারা যাবি।
এ তো বাঘের গলা নয়!
আর কে? নির্ঘাত ক্যাবলা! পাশে টেনিদাও দাঁড়িয়ে। দুজনে মিলে দন্তবিকাশ করে পরমানন্দে হাসছে—যেন পাশাপাশি একজোড়া শাঁকালুর দোকান খুলে বসেছে।
টেনিদা তার লম্বা নাকটাকে কুঁচকে বললে, পেছন থেকে একটা বাঘের ডাক ডাকলুম আর তাতেই অমন লাফিয়ে জলে পড়ে গেলি! ছছাঃ-ছছাঃ—তুই একটা কাপুরুষ।
অ! দুজনে মিলে বাঘের আওয়াজ করে আমার সঙ্গে বিটকেল রসিকতা হচ্ছিল! কী ছোটলোক দেখছ! মিছিমিছি ভিজিয়ে আমার ভূত করে দিলে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলে সারা গায়ে!
রেগে আগুন হয়ে আমি নদী থেকে উঠে এলুম। বললুম, খামকা এরকম ইয়ার্কির মানে কী?
ক্যাবলা বললে, তোরই বা এসব ইয়ার্কির মানে কী? দিব্যি আমাদের পেছনে শামুকের মতো গুড়ি মেরে আসছিলি—তারপরই একেবারে নো-পাত্তা! যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলি। ওদিকে আমরা সারাদিন খুঁজে-খুঁজে হয়রান। শেষে দেখি—এখানে বসে মনের আনন্দে পাগলের মতো হাসা হচ্ছে! তাই তোর খরচায় আমরাও একটু হেসে নিলুম।
আমি বললুম, ইচ্ছে করে আমি হাওয়ায় মিলিয়েছিলুম নাকি? আমি তো পড়ে গিয়েছিলুম দস্যু ঘচাং ফুঃর গর্তে।
–দস্যু ঘচাং ফুঃর গর্তে। সে আবার কী?ওরা দুজনেই হাঁ করে চেয়ে রইল।
—কিংবা ঘুটঘুটানন্দেরগর্তেও বলতে পার।।
—স্বামী ঘুটঘুটানন্দ! ক্যাবলা বারতিনেক খাবি খেল। টেনিদা তেমনি হাঁ করেই রইল—ঠিক একটা দাঁড়কাকের মতো।
—সেই সঙ্গে আছে গজেশ্বর গাড়ই। সেই হাতির মতো লোকটা।
—অ্যাঁ!
—আর আছে শেঠ ঢুণ্ডুরামের নীল মোটরগাড়ি।
—অ্যাাঁ!
ওরা একদম বোকা হয়ে গেছে দেখে আমার ভারি মজা লাগছিল! ভাবলুম চ্যার্যা-র্যার্যা করে গানটা আবার আরম্ভ করে দিই কিন্তু পেটের মধ্যে থেকে গুরগুরিয়ে ঠাণ্ডা উঠছে—এখন গাইতে গেলে গলা দিয়ে কেবল গিটকিরি বেরুবে। বললুম, বাংলোয় আগে ফিরে চলতারপরে সব বলছি।
সব শুনে ওরা তো বিশ্বাসই করতে চায় না। স্বামী ঘুটঘুটানন্দই হচ্ছে ঘচাং ফুঃ! সঙ্গে সেই গজের গাড়ই! তারা আবার পাহাড়ের গর্তের মধ্যে থাকে! যা-যাঃ! বাজে গল্প করবার আর জায়গা পাসনি!
টেনিদা বললে, নিশ্চয় জঙ্গলের মধ্যে ঘুরতে-ঘুরতে প্যালার পালাজ্বর এসেছিল। আর জ্বরের ঘোরে ওই সমস্ত উমধুষ্টম খেয়াল দেখেছিল।
আমি বললুম, বেশ, খেয়ালই সই! কাঁকড়াবিছের কামড়ের জেরটা মিটে যাক না আগে, তারপরে আসবে ওই গজেশ্বর গাড়ই। তুমি আমাদের লিডার—তোমাকে ধরে ফাউল কাটলেট বানাবে!
ক্যাবলা বললে, ফাউল মানে হল মুরগি। টেনিদা মুরগি নয় কারণ টেনিদার পাখা নেই; তবে পাঁঠা বলা যায় কি না জানিনে। মুশকিল হল, পাঁঠার আবার চারটে পা। আচ্ছা টেনিদা, তোমার হাত দুটোকে কি পা বলা যেতে পারে?
টেনিদা ক্যাবলাকে চাঁটি মারতে গেল। চাঁটিটা ক্যাবলার মাথায় লাগল না লাগল চেয়ারের পিঠে। বাপ রে গেছি—বলে টেনিদা নাচতে লাগল খানিকক্ষণ।
নাচ-টাচ থামলে বললে, তোদের মতো গোটাকয়েক গাড়লকে সঙ্গে আনাই ভুল হয়েছে! ওদিকে হতচ্ছাড়া হাবলাটা যে কোথায় বসে আছে তার পাত্তা নেই। আমি একা কতদূর আর সামলাব!
-আহা-হা কত সামলাচ্ছ! ক্যাবলা বললে, তুম কেইসা লিডারউ মালুম হো গিয়া! তোমাকে যে কে সামলায় তার ঠিক নেই!
টেনিদা আবার চাঁটি তুলছিল-চেয়ার থেকে চট করে সটকে গেল ক্যাবলা।
আমি রেগে বললুম, তোমরা এই কয়রা বসেবসে। ওদিকে গজের ততক্ষণে হাবলাকে চপ করে ফেলুক।
ক্যাবলা বললে, মাটন চপ। হাবলাটা একনম্বরের ভেড়া। কিন্তু আপাতত ওঠা যাক টেনিদা। প্যালা সত্যি বলছে কি না একবার যাচাই করে দেখা যাক। চল প্যালা—কোথায় তোর ঘুটঘুটানন্দের গর্ত একবার দেখি। ওঠো টেনিদা–কুইক।
টেনিদা নাক চুলকে বললে, দাঁড়া, একবার ভেবে দিকি।
ক্যাবলা বললে, ভাব্বার আর কী আছে? রেডি কুইক মার্চ। ওয়ান-টু-থ্রি-
টেনিদা কুইনিন-চিবানোর মতো মুখ করে বললে, মানে, আমি ভাবছিলুম-ঠিক এভাবে পাহাড়ের গুহায় ঢোকাটা কি ঠিক হবে? আমাদের তো দু-এক গাছা লাঠি ছাড়া আর কিছু নেই—ওদের সঙ্গে হয়তো পিস্তল বন্দুক আছে। তা ছাড়া ওদের দলে হয়তো অনেকগুলো গুণ্ডা—আমরা মোটে তিনজন—ঝাঁটুটাও বাজার করতে গেছে—
ক্যাবলা বুক চিতিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কী আর হবে টেনিদা? বড়জোর মেরে ফেলবে—এই তো? কিন্তু কাপুরুষের মতো বেঁচে থাকার চাইতে বীরের মতো মরে যাওয়া অনেক ভালল! নিজের বন্ধুকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে কতকগুলো গুণ্ডার ভয়ে আমরা পালিয়ে যাব টেনিদা? পটলডাঙার ছেলে হয়ে?
বললে বিশ্বাস করবে না ক্যাবলার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে আমারও যেন কেমন তেজ এসে গেল! ঠিক কথা-করেঙ্গা ইয়া মরেঙ্গা! পালাজ্বরে ভুগে-ভুগে এমনভাবে নেংটি ইদুরের মতো বেঁচে থাকার কোনও মানেই হয় না! ছ্যাছা! আরে—একবার বই তো দুবার মরব না!
তাকিয়ে দেখি, আমাদের সদার টেনিদাও খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ভিতু মানুষটা নয়—গড়ের মাঠের গোরা পিটিয়ে যে চ্যাম্পিয়ন—এ সেই লোক। বাঘের মতো গলায় বললে, ঠিক বলেছিস ক্যাবলা—তুই আজকে আমার আক্কেল দাঁত গজিয়ে দিয়েছিস। একটা নয়—একজোড়া! হয় হাবুল সেনকে উদ্ধার করে কলকাতায় ফিরে যাব, নইলে এ পোড়া প্রাণ রাখব না!
