সাত সাতটি হাট, দুটো দৈনিক বাজার, চারটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়, দুটো সংস্কৃত কলেজ, দশ-বারোটি টোল, এবং তার ওপর থানা, ডাকঘর, সাবরেজেস্টারি অফিসে সবসময় জমজমাট থাকত আমার সাধের কোটালিপাড়া। আর আজ? এখন নাকি সরকারি অফিস ছাড়া একটি বাজার, দুটি হাট ও একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় কোনোরকমে অতীত গৌরবের সাক্ষ্য বহন করছে বিদির্ণ কঙ্কালের মতো। সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ছিল যার আসল পরিচয় সেখানে আজ একটিও টোল নেই, একজনও অধ্যাপক নেই–কোটালিপাড়ার মানুষ আমরা ভাবতেও যে পারি না সে-কথা!
আজ কত স্মৃতি জাগে মনে। বড়ো বড়ো পুজোপার্বণের কথা নাই বা বললাম! আমার গাঁয়ের মেয়েরা-মায়েরা মিলে বছরের পর বছর মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করেছে সারাবৈশাখ মাস ধরে –প্রতিমঙ্গলবারে। তাঁদের সমস্ত মঙ্গলকামনার প্রতিদানে ঘোর অমঙ্গলের অন্ধকারে কেন আমাদের ঠেলে দিলেন মা মঙ্গলচন্ডী? তবে এই চরম অঙ্গলকে অতিক্রম করেই পরমমঙ্গলের সন্ধান পাব আমরা? ছোটোবেলায় আমার দু-বোনকে দেখেছি তারাব্রত করতে। তাদের মতো তাদের সমবয়সি মেয়েরাও করত এ ব্রত পালন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। কত আকাঙ্ক্ষা কত আকুতিই না প্রকাশ পেত ব্রতচারিণীদের উচ্চারিত ছড়া-মন্ত্রের কলিতে কলিতে। পৌষ সংক্রান্তি থেকে মাঘ মাসের সংক্রান্তির দিন পর্যন্তও চলত এই ব্রতচার। পরিষ্কার উঠোনে আঁকা হত কত সুন্দর আলপনা। সে অলপনার ঘরে দাঁড়িয়ে তারা-বন্দনার গান গাইত আমার দু-বোন ছড়া কেটে কেটে। কী মিষ্টিই না লাগত তা শুনতে আর কী অপূর্ব পরিবেশই না সৃষ্টি হত শীতের সন্ধ্যায়! আজও মনে পড়ে গভীর মনোযোগ দিয়েই আমি শুনতাম তারাব্রতের মাহাত্ম-কথা আমার বোনেদের মুখে। তারা সুর করে বলত,
তারা পূজলে কী বর পায়?
ভীম অর্জুন ভাই পায়,
শিবের মতো স্বামী পায়,
কার্তিক গণেশ পুত্র পায়,
লক্ষ্মী সরস্বতী কন্যা পায়,
নন্দী ভৃঙ্গী নফর পায়,
জয়া বিজয়া দাসী পায়।
তারা পূজি সাঁজ রাতে,
সোনার শাঁখা পরি হাতে।
হায়, এত বর লাভের প্রত্যাশা সত্ত্বেও আমার পুববাংলার মা বোনেদের আজ কী হাল? তাদের ব্রত, তাদের সমস্ত শুভকামনা কবে সার্থক হবে? কবে আমরা আবার সগৌরবে গিয়ে ঘর বাঁধব আমাদের পুববাংলায়?
.
রামভদ্রপুর
যে দেশের জন্যে আমি হা-হুঁতাশ করছি সে দেশ আজ আর আমার নয়! স্বভূমি, স্বদেশ আজ আমার পরভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে দেশে জন্মেছি, যে দেশের ধূলিকণা আমার শরীর গড়েছে, যে দেশের নদীর জল, গাছের ফল আমাকে এত বড়োটি করেছে সে দেশের ওপর আমার আজ কোনো দাবিই নেই ভেবে মনটা হু হু করে উঠছে। ফুল না ফুটতেই ফুল ঝরাবার খ্যাপামি এল কী করে বুঝতে পারি না হাজার চেষ্টা করেও। হয়তো এই অবস্থাটিকেই রূপ দেওয়ার জন্যেই কবিগুরু লিখেছেন,
‘কোন সে ঝড়ের ভুল,
ঝরিয়ে দিল ফুল
প্রথম যেদিন তরুণ মাধুরী মেলেছিল এ মুকুল।। হায় রে!
নবপ্রভাতের তারাসন্ধ্যাবেলা হয়েছে পথহারা।…
…হায় গো দরদি কেহ থাক যদি শিরে দাও পরশন।
এ কি স্রোতে যাবে ভেসে দূর দয়াহীন দেশে
কোনখানে পাবে কূল। হায় রে!’
সত্যি, প্রথম যেদিন এই মকুলমাধুরী মেলেছিল সেইদিনই উঠল জীবনসমুদ্রে ঝড়! সারাবেলা বীণার সুর বাঁধতে গিয়ে কঠিন টানে কেঁদে উঠে ছিন্ন তার যেন রাগিনী দিল থামিয়ে। জীবনের ছন্দে প্রস্তুত হতে গিয়ে ভাগ্যে ঘটল নির্বাসন। আজ মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের এই নির্বাসন দন্ড হল কোন দোষে? নবপ্রভাতের তারা সন্ধেবেলায় পথহারা হল কেন? বিধাতার নিষ্ঠুর বিদ্রুপে আজ আমরা সর্বহারা’ নামে পরিচতি। সর্বত্র নাসিকাকুঞ্চন ছাড়া অন্য পুরস্কার তো কপালে জুটল না! অবাঞ্ছিত হয়ে আর কতকাল আত্মার অবমাননা করব? স্রোতে কি বৃথাই যাব ভেসে, কূলে তরি কি কোনোদিনই লাগবে না? এই পথের ধার থেকে তুলে কোন দরদি মানুষ গৃহে দেবে স্থান তা জানি না!
নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার গ্রাম রামভদ্রপুরের কথা। মরুভূমির মাঝখানে নামটি যেন মরুদ্যানের শান্তির প্রলেপ এনে দেয় মনে। মাদারিপুর মহকুমার অধীনে, মেঘনার এক অখ্যাত শাখানদীর পশ্চিমে নতমুখে সহস্র লাঞ্ছনা মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে আমার জন্মভূমি রামভদ্রপুর। আজ মাঝে মাঝে স্বপ্নের মধ্যে আমার গ্রামের ডাক শুনি; আমাদের ফিরে যাওয়ার জন্যে যেন আকুল মিনতি করছে সে। শুনেছি ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে হয় না, আমার দেশজননী আমাদের কোলে টেনে নেবেন ভেবে মন নেচে উঠছে পেখম তুলে। যাব, নিশ্চয়ই যাব আমরা ফিরে মায়ের কোলে। আমরাও তত দিন গুনছি আশাপথ চেয়ে। আবার আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে গলা জড়িয়ে সুখ-দুঃখের গল্প করব আগের দিনের মতো।
মনে পড়ছে আমাদের গ্রামের বাজারের কথা। নদীর ধারে বসত বাজার। এই বাজারে হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে কেনাকাটা করত জিনিসপত্র। দোকানপাটগুলো ছিল মানুষের যেন মিলনতীর্থ, সবাইকে বেঁধে রেখেছিল বন্ধুত্বের সুতোয় একত্রে। কেরামতের মশলার দোকানের খরিদ্দার ছিলাম আমরা, আবার বিখ্যাত হরলালবাবুর দোকানে রিয়াজদ্দি, দিনালি, মোবারক মুনশি আড্ডা দিত দিনরাত। সম্প্রদায় হিসেবে দোকান নির্বাচনের জঘন্য মনোভাব কোনোকালেই আমাদের ছিল না। মনে পড়ছে মাছ কেনার সময় ঠোঙার প্রয়োজন হলে অকুতোভয়ে চলে যেতাম কেরামতের দোকানে। একদিনের জন্যেও তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে দেখিনি। আবার অন্য দিকে, রিয়াজদ্দির কোনোদিন তরকারি বিক্রি না হলে সোজা সে নিতাই কুড়ির দোকানে বা হরলালবাবুর মুদিখানায় গিয়ে ডালাভরতি তরকারি রেখে দিত পরের দিন বিক্রি করার আশায়। বেতের ডালাখানি চৌকির নীচে রাখবার সময় সে হয়তো মুচকি হেসে কোনো কোনো দিন বলত—’কর্তা, থুয়ে গেলাম ডালাটা। আপনার তরকারির দরকার নাই? লাগে তো কন থুইয়ে আসি বাড়িতে। পয়সা হেইটা কাইল দিবেন কর্তা।’ গ্রামবাসীর ওপর গ্রামবাসীর এই যে সহজ বিশ্বাস, সে বিশ্বাসের গলা টিপল কে?
