হাটে-বাজারে সর্বত্রই প্রায় বেড়ার ঘর। পাটকাঠির বেড়া, হেঁচা বেড়া, অথবা খলপার বেড়াই বেশি। ওপরে টিনের চাল। কোথাও-বা বেড়ার গায়ে সুন্দর করে মাটি লেপা। পাকা দালানঘরও আছে অনেক।
ঠাকুর কাছারির সব কর্মচারীই একটি এলাকায় বাস করেন–ম্যানেজার সাহেব থেকে দপ্তরি পেয়াদা অবধি সকলেই। কাছারির তরফ থেকে বাসা দেওয়া হয় সবাইকে।
অপর্যাপ্ত দুধ আর মাছের বাজার সেখানে। ইলিশমাছ আর দুধ যে অত সস্তা হতে পারে তা ভাবাও যায় না। লোকে বাজারে দুধ আনতে গেলে বালতি নিয়ে যেত সঙ্গে করে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দেও এরকম সচ্ছল অবস্থা ছিল সেখানে।
বর্ষাকালে (দুর্গাপুজোর আগে অবধি) নৌকো ছাড়া যাতায়াতের উপায় থাকত না। চরিদিকে থইথই জল। গভীর রাতে বাঁশ আর বেতবনের ভেতর দিয়ে ছপ ছপ শব্দে বৈঠা ঠেলে ঠেলে ছোটো-বড়ো নৌকোগুলো যেত-আসত। হাটের দিনে সেই যাতায়াত প্রায় সারারাতই লেগে থাকত। নৌকোর ওপরই রান্না করছে মাঝিরা, সেইখান থেকেই হাঁড়ি-বাসন ধুয়ে নিচ্ছে, সেইখানেই আহার সারছে। জলেই যেন ওদের ঘরকন্না। একবার একটানা পাঁচ দিন রইলাম এই নৌকার ঘরে। পাবনা জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। কত বিচিত্র পথে আনাগোনা–তার শেষ নেই। হ্যারিকেন লণ্ঠন নৌকোর মাথায় তুলে দিয়ে ছইয়ের ওপর উঠে বসে রাত্রের অন্ধকারে মাইলের পর মাইল যাও–চারিদিকে জলরাশি–কোথাও-বা উঁচু–কোথাও নীচু। যেসব হাঁটাপথে একবার হেঁটে গেছি তারই বুকের ওপর দিয়ে জলরাশি ভেদ করে নৌকোয় যেতে সে কী আনন্দ! নিশুতি রাত। তবু বহুদূরের নৌকোর ডাক স্পষ্ট শোনা যায়। আর বহুক্ষণ ধরে তার মাথায় টিমটিম আলো দেখা যায়। সহযাত্রী জোটে। দুই নৌকো পাশাপাশি চলে। তীরের ওপর দিয়ে দুজন হয়তো বা গুণ ধরে চলে। জলের ভেতর পা দুটো ডুবিয়ে বসে শুনি ওদের গলাছাড়া গান,
ও কালা শশী রে
আর বাজায়ো না বাঁশি–
বাঁশি শুনিতে আসি নাই আমি,
জল নিতে আসি…।
গলার অত জোর, অথচ মিষ্টত্ব নষ্ট হয় না–প্রাণঢালা দরদ মেশানো গান।
বড়ো বড়ো গয়নার নৌকো জোড়া জোড়া ঢাক পিটিয়ে চলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। আট, দশ, পনেরো কুড়ি মাইল–একটানা পথ। ঢাকের গগনভেদী শব্দে জানা যায়-গয়নার নৌকো চলেছে। ভেতরে শুয়ে বসে বহুযাত্রী একসঙ্গে যেতে পারে। কী শক্ত গড়ন–যেন লোহার তৈরি এই নাও।
দুর্গাপুজোর মতোই সরস্বতীপুজো এইদিকে মহাসমারহে হত। সেই সময় বসত গানের আসর-দূর-দূরান্তর থেকে আসতেন নানা গুণীজন। সাহিত্যসভায় বাংলাদেশের স্বনামধন্য অনেকেই আসতেন। যেবার অনুরূপা দেবী সভানেত্রী সেবার আমি ছিলাম উপস্থিত। নাচ, গান, কবিতা প্রতিযোগিতা লেগে থাকত তখন প্রায় প্রত্যেকটি সন্ধ্যায়।
পাবনা জেলার সাহজাদপুর, জামিরতা, পরজনা, বাঘাবাড়ি–এদের আর-এক রূপ দেখেছি পঞ্চাশের মহামন্বন্তরে। কোথায় ছিল এত লোক? এই নরকঙ্কালের দল? একটু ফ্যানের জন্যে ঘুরে বেড়াত ওরা বেড়ার গায়ে গায়ে। যে বাড়িতে ছিলাম, সেই বাড়িতে রাত্রে রান্নাঘরে ধরা পড়ল একটি চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছেলে। অনেক লোকজন চোর মনে করে লাঠি-সোঁটা নিয়ে ছুটে এল–ভাতের হাঁড়ি থেকে দুই হাতে ভাত তুলে মুখে দিচ্ছে ছেলেটা–এতটুকু ভয় বা উদবেগ যেন তার নেই।
যেসব মাঠে সোনার ফসল ফলেছে একদিন সেই ধানখেতেই বহু নরকঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেছি এখানে-ওখানে। চোখের সামনে খিদের জ্বালায় মানুষকে মরতে দেখেও মানুষ নিজের অন্নের ভাগটুকু সামলে রেখেছে। আগে যাকে দেখেছি ঘরের বউ, সন্তানের মা, পচা ময়লা ঘেঁটে খাদ্যের সন্ধানে তাদেরও ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। পরিচয় থাকা সত্ত্বেও কথা বলেনি তারা–শুধু জ্বলন্ত চোখ তুলে একদৃষ্টে চেয়ে থেকেছে। বেশিক্ষণ সে-দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে সাক্ষাৎ ভগবানও বুঝি ভয় পাবেন!
কাছারি বাড়ির ওপারেই কামারের ঘর। দিনভর ভারী হাতুড়ির ঠোকাঠুকি লেগেই আছে। কখনো গোরুর গাড়ির চাকায় লোহার বেড় লাগানো, কখনো কোদাল-কুড়ল-দা-খোন্তা তৈরি হচ্ছে। কামার বলে ঠাউর, আইচেন কন থিয়্যা?
শুনি ওদের কাজকর্মের কথা।
বিখ্যাত ছিল সূর্য রায়ের হোটেল। পাবনা জেলার গেজেট বলা হত ওকে। গ্রাম-গ্রামান্তরের খবর পাওয়া যেত সেখানে গেলে। কত জায়াগার লোক এসে জোটে। সন্ধের পর প্রত্যহ জমে মজলিশ–গল্পের, তাসের আর দাবার। হাটবাজার বন্ধ হয়ে গেলে সূর্য রায়ের হোটেল জমে ওঠে।…
আজও হয়তো সেই আড্ডা জমে, গয়না নৌকোর ভিড় জমে নদীতে, গাড়োয়ান সেইরকম উদাত্ত গলায় গান গেয়ে যায়, শুধু আমরা আর সে আড্ডায় যোগ দিতে পারি না, সেই গান শুনতে পাই না। র্যাডক্লিফের কুড়লের ঘায়ে সাহজাদপুর যে আজ আলাদা হয়ে গেছে! মায়ের সঙ্গে ছিঁড়ে গেছে আমার যোগ।
ফরিদপুর জেলা – কোটালিপাড়া রামভদ্রপুর কাইচাল খালিয়া চৌদ্দরশি খাসকান্দি কুলপদ্দি
বিশাল বনস্পতিও ধরাশায়ী হয় প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়ায়, বুনো হাতির পায়ের চাপে সাজানো ফুলের বাগান যায় বিপর্যস্ত হয়ে। ঠিক তেমনি তো হয়েছে আমার পুববাংলার হাজার হাজার সোনার পল্লি-প্রতিমার অবস্থা–জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম ভুল রাজনীতির আকস্মিক অশনিপাতে। বহুপুরুষের যত্নে গড়া কত বাড়িঘর আজ পড়ে আছে শ্রীহীন হয়ে, খাঁ খাঁ করছে কত বিদ্যায়তন, কত দেউল। শিবশূন্য শিবালয়গুলোতে হয়তো চলেছে অশিবের হানাহানি, হয়তো বা অনেক মঠ-মন্দির লুপ্তও হয়ে গেছে এত দিনে। আর ভারতবর্ষের ইতিহাসে এ তো নতুন কিছু নয়–দেবালয় ধ্বংসের অভিযান অনেকবারই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে ভারতবাসীকে।
