বাংলার সত্যিকারের সৌন্দর্য তার প্রকৃতির লীলা বিকাশের পরিচয় পাওয়া যায় উত্তর ও পূর্ববাংলায়। পল্লবঘন বৃক্ষরাজির ছায়ায় শান্তির নীড় এক-একটি গ্রাম। সেই লক্ষ গ্রামেরই একটি গ্রাম এই ঘাটাবাড়ি। গ্রীষ্মের শীর্ণ নদী সংকুচিত তীরভূমিতে ক্ষীণধারায় দিয়ে যায় তার স্নিগ্ধ শীতল পরশ। বর্ষায় ফিরে পায় তার হারানো যৌবন। নদীটির সঙ্গেও অনেক লোকপ্রসিদ্ধি জড়িয়ে আছে। ঠাকুরমার মুখে শুনেছি, ওই নদীর মাঝখানে আঠেরোটি বড়ো বড়ো গর্ত আছে। অনেক কাল আগে নদীতে নাকি সিন্দুক ভেসে উঠত। কেউ বলত ওর মধ্যে মোহর আছে আবার কেউ বলত বাসনপত্র।
আমাদের অঞ্চলটা পাটের এলাকা। এককালে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে নদীর ধারে ধারে সাহেবদের বড়ো বড়ো কুঠি ছিল। আজ সেইসবই যমুনার কুক্ষিগত। নদী কল্লোলে তার কোনো ইঙ্গিত আজ আর পাওয়া যায় না। আমাদের গ্রামাঞ্চলে নীলের চাষও হত। অনেক জায়গায় বিশেষ করে ওই কুঠিপাড়ায় নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়।
ছুটিতে গ্রামে যেতাম বাইরে থেকে। পুরো একদিন হেঁটে পরের দিন প্রায় বারোটা একটার সময় গ্রামের স্টিমার ঘাট সোয়াকপুরে পৌঁছোতাম। ঘাটে আসবার আগেই স্টিমারের আর্তনাদ আমাদের সচকিত করে তুলত। পাড়ে ভেড়বার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে ছুটে আসত কুলিরা। কিনারায় দন্ডায়মান নর-নারীর উৎসুক মুখের মাঝখানে দেখতাম আমাদের চিরপুরাতন কর্মচারীর হাসিমুখ। শেষের পথটুকু যেতে হত গোরুর গাড়িতে। সারি সারি মাল, যাত্রী বোঝাই ছোটো ছোটো গোরুর গাড়ি। যেন মহাপ্রস্থানের যাত্রী সব। এমানী ভাইয়ের গাড়ি তৈরি থাকত আমাদের জন্যে। ছইয়ের ভেতর না বসে সব সময়েই আমি এমানী ভাইয়ের পেছনে বসতাম। জীর্ণ গাড়ির চাকার একটানা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ কেমন জানি মোহ সৃষ্টি করত মনে। রৌদ্ররুক্ষ ধূলিময় পথ। শীর্ণকায় গোরুগুলোর মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। চালকের উদ্যত লাঠি দেখে অনেক কষ্টে যেন এগগাবার চেষ্টা করছে। এমানী ভাই মাঝে মাঝে হাঁক দেয়- ‘ডানি-ই ক্যারে, গোরু নৌড় পারে না ক্যা?’ গ্রামের ভেতর আঁকা-বাঁকা যাত্রাপথ। এপাশে ওপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে ঢেঁকির ঢপ ঢপ শব্দ। শোলার বেড়ার ওপর দিয়ে কিষাণ বউদের উৎসুক কৌতূহলী দৃষ্টি। খেতে কর্মরত চাষিদের প্রশ্ন–গাড়ি যাবে কোনে? হায়, এ সবই অতীতের রোমন্থন মাত্র। কাপড়ের আড্ডা ইনাদপুর এলেই আমাদের গ্রামের কাছে আসা হল। সোজা সড়ক দূর থেকে আমার গ্রামকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। গোরুর গাড়ি থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে আসতেন জসীম কাকা। আগেই বলেছি, গ্রামটি ছোটো হলেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাজার-হাট, ডাকঘর, স্কুল, খেলার মাঠ সব কিছুই সেখানে গ্রামের ধনী-দরিদ্রের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল ডাকঘর। দুপুরবেলায় দেখতাম গ্রামের পথ দিয়ে দেশ-বিদেশের সুখ-দুঃখের চিঠি ভরতি থলি ঝুলিয়ে এবং ঘণ্টাবাঁধা বল্লম কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেছে রানার। তার ঠুন ঠুন শব্দ শুনে ছুটে আসত গ্রামের ছেলে-মেয়েরা। গ্রামের হাটটাও ছিল বাড়ির খুব কাছেই। ডাকঘরের সামনের ছোটো রাস্তাটি ধরে এগোলেই হাট। তার কিছু দূরে এম. ই. স্কুল। আমার পিতামহের প্রতিষ্ঠিত। আমার কাকা ছিলেন এর প্রধানশিক্ষক, সামনেই খেলার মাঠ। গ্রীষ্মের অপরাহ্নে গাঁয়ের তরুণদল সেখানে ফুটবল খেলায় মেতে উঠত। পাশ দিয়ে চলে গেছে ইউনিয়ন বোর্ডের অপ্রশস্ত সড়ক। বর্ষায় মাঠ, সড়ক সব ডুবে যেত। বর্ষাকালে গ্রামের চেহারা হয় অপূর্ব। শুধু জল, থইথই করা জল। নৌকো ছাড়া কোথাও যাওয়ার উপায় নেই।
ফুটবল খেলা নিয়ে গ্রামে খুব হইচই হত। নিজেদের শিল্ড খেলা ছাড়াও অন্যান্য গ্রামের প্রতিযোগিতার খেলায় খেলতে যাওয়া হত। বেশ মনে পড়ে মালিপাড়ার ফাইনাল খেলার কথা। আমাদের গ্রাম যখন তিন গোলে বেতিল গ্রামকে হারাল তখন হিন্দু-মুসলমান গ্রামবাসীর সে কী বিজয় উল্লাস!
বারোমাসে তেরো পার্বণের দেশ আমাদের। অন্যান্য পুজো-পার্বণ ছাড়াও চড়ক পুজো আমাদের গাঁয়ের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। চৈত্র মাসে পাট-ঠাকুরের পুজো আরম্ভ হয়। পাট ঠাকুরের আসল ইতিহাস জানি না। তবে শুনেছি শিবপুজোরই এ এক ভিন্ন প্রথা। চৈত্র সন্ন্যাসীরা পাড়ায় পাড়ায় প্রত্যেক বাড়িতে পাট-ঠাকুর সামনে রেখে নাচ-গান করে। সংক্রান্তির দিন তাঁরা মিলিত হয়, খোলার কালীবাড়িতে। এখানে এ উপলক্ষ্যে বসে বড়ো মেলা। গ্রামের ছেলেবুড়োরা যোগ দেয় এই আনন্দ উৎসবে। সন্ধ্যায় দুজন হর-পার্বতী সেজে নাচে। তারপর আরম্ভ হয় চড়ক ঘোরানো। হিন্দুর অনুষ্ঠানে মুসলমানরা সানন্দে অংশগ্রহণ করত; আবার তাদের অনুষ্ঠানে হিন্দুরাও তেমনভাবেই যোগ দিত।
আমাদের বাড়ির পুবদিকে ঠাকুরবাড়ি। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষ্যে ওখানে হত কীর্তনগান। ঠাকুরমশাইরা একে একে সবাই গত হয়েছেন। তাঁদের ছেলে মেয়েরা অসহায় অবস্থায় পূর্ব বাংলার পরিস্থিতিতে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। আজকের সন্ধ্যায় ঠাকুরবাড়িতে হয়তো আর খঞ্জনির ঝনঝনি শব্দ শোনা যায় না। শোনা যায় না সুমধুর শঙ্খধ্বনি বা কাঁসর ঘণ্টার বাজনা। গৃহিণীরা আজ আর কেউ হয়তো সেখানে গলায় আঁচল দিয়ে তুলসীতলায় সন্ধ্যাদীপ জ্বালে না। আমার গাঁয়ের এক-একটি তল্লাট জুড়ে আজ হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে আমার মনের মতোই এক-একটি ফাঁকা মাঠ। কিন্তু হাসির ঝরনাধারায় আবার কি আমার গ্রাম সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে না?
