পুজোর সময় ধরদের বাড়িতে হত উৎসব। অভিজাত বাড়ির নোনা-ধরা দেয়ালের মতো তার সব কিছুতেই নোনা ধরলেও এই সেদিন পর্যন্তও পুজোর আনন্দটা ছিল অকৃত্রিম। ঢপ, রামায়ণ গান থেকে আরম্ভ করে যাত্রাগানের মধ্যে দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠত সমস্ত গ্রামখানি। রামায়ণ গানের দু-চার লাইন আজও মনে আছে আমার। সেদিনকার আসর-ভরতি লোকের সামনে যখন গায়েন রামের রাজ্যাভিষেকের চিরঅভিপ্রেত সংবাদটি ঘোষণা করতেন তখন দর্শকদের মুখে ফুটে উঠত স্বস্তির হাসি। সে হাসির উৎস ছিল বিশেষ করে এই কথাটি,
ওগো কৌশল্যে, শুনে কী আনন্দ হল অযোধ্যার
রাজা হবে রঘুমণি লক্ষ্মণ হবে ছত্রধারী–
বামে সীতা সীমন্তিনী সদা নিরখি।।
এই যে সুখীসচ্ছল ভবিষ্যৎ অযোধ্যার ছবি, এ ছবি তো চিরন্তন। জীবনের ওপর সার্থকতার ছাপ পড়লে এমন নির্বিঘ্ন ছবি ফুটবে কী করে?
যাত্রার মধ্যে দীনবন্ধুর নাচই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। পুজোর সময় তাকে পাওয়া ছিল দুর্লভ সৌভাগ্যের কথা। বড়ো বড়ো যাত্রার দলে থাকত তার চাহিদা। তার ‘পূজারিনি’ নৃত্যই ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর। মাথায় ও দু-হাতে তিনটি ধূপদানি নিয়ে পূজারিনি তার বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে দেবতাকে অর্ঘ্য নিবেদন করছে, অথচ প্রণাম করতে গিয়েও তার ধূপদানি স্থানচ্যুত হচ্ছে না। তার নৃত্যলালিত্য দেখলে বিশ্বাসই করা যেত না যে শরীরে তার হাড় আছে একটাও! আমাদের গ্রামে দীনবন্ধুই ছিল প্রাচীনকালের সুরুচিসম্পন্ন নৃত্যের ধারক ও বাহক।
আজ ফেলে-আসা দিনগুলির ধূসর স্মৃতিরোমন্থনই ভালো লাগছে। আজ আমাদের অবস্থা মহাভারত বর্ণিত অভিমন্যুর মতো। তবে অভিমন্যু প্রবেশের মন্ত্র জানতেন, বের হয়ে আসার মন্ত্র সম্বন্ধে ছিলেন অজ্ঞ। আমরা বেরিয়ে আসার মন্ত্র জানি, জানি না ছেড়ে-আসা গ্রামে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভের মন্ত্র, এই তফাত! মৈত্রী-সাধনার মধ্য দিয়েই পাওয়া যাবে সে-পথের সন্ধান।
.
সন্দীপ
দক্ষিণে সুন্দরবন, উত্তরে তরাই। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানা এই। তবু আরও এক মৃত্যুদীপ্ত ইতিহাস ছিল এই সীমানির্ধারিত ভূখন্ডের। সে-ইতিহাস একদিনে গড়ে ওঠেনি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুকে পলিমাটির স্তরের মতো যুগে যুগে সাত কোটি মানুষের বুকের ভালোবাসায়, অশ্রুতে, প্রতিজ্ঞায় এ ইতিহাস লিখিত হয়েছিল। আজ নিজের হতে সে ইতিহাসকে দ্বিখন্ডিত করে দিলাম। এক সীমান্তের মানুষ আর এক সীমান্তে উপনীত হল শরণার্থীর বেশে, আশ্রয়ের প্রার্থনায়। হায় আমার দেশ! যেখানেই থাকি, যত দূরেই থাকি, এ দেশের মাটিকে, এ দেশের আকাশকে তো ভুলতে পারি না। এ দেশে যে আমি জন্মেছি, এ দেশ যে আমার জননী।
দূর থেকে একটা কালো বিন্দুর মতো মনে হয় প্রথম। সমুদ্রের বুকে বুঝি বা কোনো ভাসমান কাষ্ঠখন্ড। ঢেউয়ের ভেতর ডুবে যাচ্ছে কখনো–আবার মাথা তুলছে হঠাৎ। কর্ণফুলি নদীকে অনেক পেছনে ফেলে সমুদ্রের মোহনায় এসে পড়েছে মোটরলঞ্চ। এবার সোজা কোনাকুনি পাড়ি জমাতে হবে। ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে চলেছে লঞ্চ। যান্ত্রিক আর্তনাদ তলিয়ে যাচ্ছে সামুদ্রিক ঢেউয়ের উত্তাল বিক্ষোভে। নির্মেঘ আকাশে মধ্যাহ্নের সূর্য। রোদের স্পর্শে সফেন ঢেউগুলি হিরন্ময় দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইগলের মতো অনুসন্ধানী চোখে তাকালেও উপকূল চোখে পড়বে না আর। শুধু অন্তহীন জল চারদিকে–ঢেউয়ের অবিশ্রান্ত গর্জন। পালতোলা নৌকার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। দেখা যায় দু-একখানা যাত্রীবাহী নৌকা। সমুদ্রের উপযোগী বিশেষ ধরনের নৌকা এইসব। দিকচিহ্নহীন সমুদ্রে নৌকারোহীদের একমাত্র সহায় মাঝির অদ্ভুত দক্ষতা আর যাত্রীর দুর্নিবার সাহস। প্রায়ই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয় এদের। তবু পরাভূত হয় না এরা, অনেক প্রাণের বিনিময়ে কঠিন অভিজ্ঞতায় শক্তিমান সবাই। তাই রুদ্রের অভিসারে অভ্যস্ত এরা প্রত্যেকে।
দুপুরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে এক সময়। সেই কালো বিন্দুটা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে দেখা দেয় এইবার। সুপারি, নারকেল গাছে ঘেরা একটুকরো ভূখন্ড। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভূখন্ডের গায়ে। যে-কোনো মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলে কিনারে গিয়ে ভিড়ল লঞ্চ। ঢেউয়ের দোলায় লঞ্চ তখন কাঁপছে। কোনো অবলম্বন ছাড়া লঞ্চের ওপর দাঁড়ানো যায় না। আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় খালাসিরা কিন্তু সিঁড়ি ফেলে দিলে। তাদের হাত ধরে ধরে সিঁড়ি পার হয়ে উঠে এল যাত্রীদল। এখান থেকে গন্তব্যস্থল মাইল দুয়েকের পথ। কিন্তু সেখানে যাওয়া যায় কী করে? মোটর, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা কিছুই নেই। একটা কাঁচা রাস্তা এঁকেবেঁকে ভেতর দিয়ে চলে গেছে। ছোটো ছোটো মোট কাঁধে নিয়ে যাত্রীরা কেউ কেউ সেই পথে রওনা হয়। বাকি যারা রইল তারা আশ্রয় নিল গোরুর গাড়ির। যাতায়াতের একমাত্র উপায় এই দ্বিচক্রযান।
নতুন কোনো আগন্তুক তখন হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন–সামনে অনন্ত সমুদ্র, দিগন্ত চোখে পড়ে না। একটা ঝলসানো তাম্র পাত্রের মতো পশ্চিমের সূর্য সমুদ্রের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। নিজের অস্তিত্ব লুপ্ত করে দেবার কামনায় উদবেল বিকেলের সূর্য। আশপাশের গাছগুলোতে পাখিদের ক্লান্ত কলরব। একটা স্তব্ধ বিষণ্ণ পরিবেশ। মুহূর্তের জন্যে অবাক হয়ে যান আগন্তুক। বাংলাদেশের অংশ নাকি এটা? কিন্তু বাংলার কোনো অঞ্চল এমন দুরধিগম্য, বহির্জগৎ-বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে ভাবতে পারেননি ভদ্রলোক। একটা বিস্মিত চেতনায় কয়েক মুহূর্ত কেটে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ান যে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছে। সেদিকে খেয়ালই নেই তাঁর।
