পরাধীনতার যুগে এই অরণ্যঘেরা এলাকায় মাত্র কয়েক ঘর মানুষের বসতির মধ্যে থেকে ‘হিলি ডাকাতি’র প্রেরণা কীভাবে লোকে পেয়েছিল তার কাহিনি চিত্তাকর্ষক। এই সব এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি–কিন্তু হিলি ডাকাতির মামলার কথা সাধারণত কেউ বলতে চাইত না। শুনতাম, হৃষি এবার জেল থেকে বার হবে। কত অল্প বয়সে পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে গেছে। যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। বালুবাড়ি, ক্ষেত্রিপাড়া, কালীতলা, বড়োবন্দর-এ সব জায়গার কে na জানে পরমধার্মিক রমেশ ভট্টাচার্যকে। তাঁরই ছেলে হৃষি। লেখাপড়ায় আর আদবকায়দায় তার মতো ছেলে মেলা ভার। রমেশবাবু বন্দরে নিজের বাড়ি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর শরিক দেবেশ ভট্টাচার্য ভাটপাড়াতেই থাকতেন। পৈতৃক সম্পত্তি অগাধ। দেবেশবাবু ছিলেন শৌখিন ও আমুদে প্রকৃতির লোক। হঠাৎ একদিন হৃষি ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে কয়েকজন কিশোর এল বড়োবন্দর বালুবাড়ি থেকে ভাটপাড়ায়। এমন তারা প্রায়ই আসে। সকলের গায়েই আলোয়ান। দেবেশবাবু বাড়ি নেই।
তখন বাড়িতে নতুন নতুন কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র এসেছে। হৃষির দলবলের আগ্রহে দেবেশবাবুর স্ত্রী একে একে ওদের সেগুলি সব দেখালেন। তারপর চামড়ার ‘কেসে’ বন্ধ করে তুলে রেখে দিলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে ছেলেরা হাসিমুখে প্রণম্যদের প্রণাম করে বেরিয়ে গেল।
তারপরই ওরা নিরুদ্দেশ। কিছুদিনের মধ্যে হিলি ডাকাতির মামলার বিশ্বরূপ প্রকাশ পেল। দেখা গেল হৃষিও অভিযুক্ত। একনম্বর আসামি ইংরেজের আদালতে। খবর শুনে ধর্মপ্রাণ রমেশবাবু মর্মাহত। কিন্তু হৃষির প্রাণভিক্ষার আপিলও তিনি নাকি করতে চাননি।
পরে দেখা গেল দেবেশ ভট্টাচার্যের বাড়িতে রিভলবারের চামড়ার কেসগুলো ঠিকই আছে, তবে তারমধ্যে থেকে আসল জিনিস উধাও হয়েছে।
আর ওই-উপজাতি পোলিয়ারা। ওদের প্রভাব বাসিন্দাদের ওপর প্রচুর। ওদের স্ত্রী-পুরুষ শটী জঙ্গলে কাজ করে। হলুদের মতো শেকড় তুলে চালনি-টিনে ঘষে ঘষে কাত বার করে। তারপর সে কাত ধুয়ে ধুয়ে, শুকিয়ে নিয়ে তৈরি করে শটী। ওদের সঙ্গে ওদের ভাষাতেই কথা কইতে হয়–’খাবা নাহে’, ‘এলাই বাহে’ ইত্যাদি। পিঠে নবজাত শিশুকে বেঁধে নিয়ে মাঠের কাজ করছে, মুড়ি বিক্রি করছে তাদের রমণীরা। এদের ভাষার প্রভাব অল্পবিস্তর পড়েছে সকলের ওপরই। অবশ্য মুখের ভাষাতেই এই প্রভাব সীমাবদ্ধ–লেখার ভাষায় নয়।
রাজারামপুর-ভাটপাড়া জঙ্গল আর পানাপুকুরে ভরা। তবু বন-জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে কত যে দেব-দেবীর মূর্তি আছে তার বোধ করি সীমা-সংখ্যা নেই। রাজারামপুরের ভদ্রকালী অতিজাগ্রত বলে খ্যাত। তেমনই আবার ভাটপাড়ার শ্মশানবাসিনীর মন্দির। শ্মশানবাসিনীর মন্দির দূর থেকে দেখলেই ভয় লাগে। বনজঙ্গল-ঘেরা এই জীর্ণ মন্দির। আরও কত জায়গায় ছড়িয়ে আছে শিবলিঙ্গ আর কালীমূর্তি।
আষাঢ় থেকে শীতের আগে অবধি গ্রামে ম্যালেরিয়ার তান্ডব। তবু পুজোর সময় দেখা যায় একাধিক দুর্গাপ্রতিমা। ঢাকের আওয়াজে মুখরিত চারিদিক। যুবকরা মাঠে মাঠে বাঁধে থিয়েটারের স্টেজ। সারারাত ধরে কোথাও হয় আলমগির, কোথাও বঙ্গে বর্গি। দেশলাইয়ের বাক্সে কুইনাইনের পিল নিয়েও থিয়েটারে মাততে দেখেছি অনেককে।
আর আছে কান্তজিউয়ের মন্দির। সে মন্দিরের কারুকার্য দেখে মনে হয় কোথায় লাগে গয়ার মন্দির! দিনাজপুর রাজপ্রাসাদে যখন কান্তজিউকে মিছিল করে নিয়ে আসা হয়–সমগ্র শহর ও গ্রামগুলো যেন জেগে ওঠে উৎসবের আনন্দে। রাজবাড়িতে দেবতার অন্নভোগ হয় না–কিন্তু এই সময় অতিথির সেবা আর অন্নদান হয়। বছরের বাকি-কয়েক মাস কান্তজিউ থাকেন কান্তনগরে। বিখ্যাত গোষ্ঠমেলা আর রাসমেলার সময় কত দূর-দূরান্তর থেকে কত ব্যাপারী আসে। মেলা চলে একমাস। কান্তজিউয়ের ভোগের পর প্রধান সেবায়েত তাঁকে চাঁদির গড়গড়ায় তামাক সেজে দেন।
এ সম্বন্ধে একটি গল্প শোনা যায়। একবার এক অতিথি দর্শনলাভের আশায় কান্তজিউয়ের মন্দিরে আসে। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় বাইরের বারান্দায় শুয়ে সে বিশ্রাম করতে থাকে। রাতে গড়গড়া টানার শব্দে সে তামাক খেতে ইচ্ছে করে এবং তাকে ‘একজন’ সেই চাঁদির কলকে এনে-দিয়ে যায়। পরের দিন কান্তজিউর কলকে বাইরে পড়ে থাকতে দেখে মন্দিরে গোলমাল বেধে যায়। সেই আগন্তুককে নিগ্রহ ভোগ করতে হয়। সেই থেকে নাকি কান্তজির তামাক খাওয়ার শব্দ আর শোনা যায় না।
পৌষ-সংক্রান্তি খুব ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত। আঙিনায় আলপনা দিয়ে ঘরের দরজার মাথায় পিঠেলুর চিত্র এঁকে শোলার ফুলগুচ্ছ ধান-দূর্বার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। সব বাড়িতেই নানারকম পিঠে তৈরি হত এবং কারুর বাড়ির পিঠে ইচ্ছে হলে বিনা নিমন্ত্রণেই সে বাড়িতে গিয়ে খাওয়া যেত।
এ এলাকার লোকসংগীতের উল্লেখ না করলে বিবরণ অবশ্যই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উত্তর-বাংলার ভাওয়াইয়া, ‘চটকা’ প্রভৃতি গান এই গ্রামেও শোনা যায়। একটি চটকা গানেরই দৃষ্টান্ত দিচ্ছি,
ডাল পাক কররে কাঁচা মরিচ দিয়া,
গুরুর কাছে নেওগা মন্তর নিরালে বসিয়া,–
ডাল পাক কর রো।
ছোটোবউ চড়ায় ডাল মাঝলা বউ ঝাড়ে,
(হারে) বড়োবউ আসিয়া কাঠি দিয়া নাড়ে।
ডাল পাক কর বরা।
(আমার) শ্বশুর করে ঘুসুর-ঘুসুর
ভাসুর করে গোসা,
(আজি) নিদয়া এল স্বামী এসে ধরল
চুলের ঘোসা,
ডাল পাক কর রো।
(আমার) শাশুড়ি আছে, ননদ আছে,
আছে ভাগনা-বউ,
এমন করে মার মারিল আইগ্যালো না কেউ,
ভাল পাক কর রো।
